ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

প্রতিবন্ধকতায় পিছিয়ে রাজশাহী জেলা সুইমিংপুল

ফয়সাল আহমেদ, রাজশাহী
প্রকাশিত: ২০:৩১, ২৮ জুন ২০২২
প্রতিবন্ধকতায় পিছিয়ে রাজশাহী জেলা সুইমিংপুল
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

রাজশাহী মহানগরীতে হাতেগোনা কিছু পুকুর থাকলেও পঁচা ও দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা পানির জন্য তা আজ গোসলের অযোগ্য। ফলে গোসল কিংবা সাঁতার শেখার জন্য নেই তেমন ভালো পুকুর।

এ কারণে দিন দিন অনেকটায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে রাজশাহী জেলা সুইমিংপুল। তবে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতায় এখনো পিছিয়ে রয়েছে এ সুইমিংপুলটি। প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে আধুনিকীকরণের আশায় দিন গুণছে রাজশাহী জেলা সুইমিংপুল সংশ্লিষ্ট সবাই।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী জেলা সুইমিংপুলটি অন্যান্য পুলের চেয়ে জনপ্রিয় হওয়ার পর বেশ কিছু সমস্যায় অগ্রগতি অনেকটা মন্থর হয়েছে। যেমন- ৫ বিঘার ওপর এ সুইমিংপুলের রয়েছে অপর্যাপ্ত জনবল, নিরাপত্তার ঘাটতি, ঘোলা পানি, গ্যালালির সঙ্কট, ছাউনি বা সেডের প্রয়োজনীয়তা, উন্নত সুইমিং কস্টিউম, সরঞ্জামাদি, প্রশিক্ষণার্থীদের উন্নত খাবার ও অনুশীলন এবং সীমানা প্রাচীরের সমস্যা।

Advertisement

রাজশাহী মহানগরীর কয়েকটি স্থানে সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী জেলাজুড়ে মোট পাঁচটি সুইমিংপুল রয়েছে। এরমধ্যে ৪টি সরকারি ও ১টি বেসরকারি।

সুইমিংপুলগুলো হলো- রাজশাহী জেলা সুইমিংপুল, রাজশাহী মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স সুইমিংপুল, রাজশাহী সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজ সুইমিংপুল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) সুইমিংপুল ও বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিত কাউসার চৌধুরী সুইমিংপুল। এগুলোর মধ্যে মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স ও বেসরকারি কাউসার চৌধুরী সুইমিংপুলে রয়েছে ফিল্টার মেশিনের ব্যবস্থা, বাকিগুলোতে নেই। তবে এই পাঁচটির মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও কার্যকর অবস্থায় রয়েছে রাজশাহী জেলা সুইমিংপুল।

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশএ পুলটিতে সরকারিভাবে ২০১০ সাল থেকে সাঁতারুদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন প্রশিক্ষক মো. আব্দুর রউফ রিপন। তিনি বলেন, ১৮ ইঞ্চি পাইপের মাধ্যমে সুইমিংপুলের পূর্ব দিকে ড্রেনের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন করা হয়। তবে পানি পরিবর্তনের প্রথম দুদিন পানি ঘোলা থাকে। তৃতীয় থেকে পঞ্চম দিন পর্যন্ত পানি কালচে বর্ণ ধারণ করে এবং সপ্তম থেকে অষ্টম দিনের মাথায় পানি একেবারে পরিষ্কার হয়ে যায়। তবে মুশকিলের বিষয় হলো পানিতে প্রচুর আইরন বিদ্যমান থাকায় নিচের টাইলসে শাওলা জমে যায়। তবে মাসে ১৫ থেকে ২০ দিন পরপর পুলটি পরিষ্কার করা হয়। মূলত পাম্পটির বোরিং ঠিকভাবে করা নেই অথবা পানির লেয়ার নিচে নেমে যাওয়ায় এমনটা হচ্ছে বলে জানান এ প্রশিক্ষক।

প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণার্থীদের বিষয়ে তিনি জানান, এখানে দুই ধরনের সাঁতারু রয়েছে। একটা সাধারণ সাঁতারু, যারা প্রাথমিকভাবে সাঁতার শেখেন। তাদের কাছে মাসে তিন হাজার টাকা করে ফি গ্রহণ করা হয়। আরেকটি হলো প্রশিক্ষিত সাঁতারু, যারা এখানে ফ্রিতে সাঁতার শেখেন। এছাড়া মোট পাঁচটি গ্রুপে জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতা হয়।

এগুলো হলো- ৮-১০ বছর, ১১-১২ বছর, ১৩-১৪ বছর, ১৫-১৭ বছর ও ১৮-২০ বছরের বয়সভেদে প্রতিযোগিতার ক্যাম্পেইন হয়। গত ১৪ মে থেকে ২০ দিনের একটি নতুন ক্যাম্প শুরু হয়েছে। প্রায় ৪২ জন প্রশিক্ষণার্থী এতে অংশগ্রহণ করছে। তাদের রাজশাহী জেলা ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকে নাস্তা, সাঁতারের পোশাক ও যাতায়াতের সামান্য ভাতা প্রদান করা হয়। তবে যারা বহিরাগত এবং শুধুমাত্র এখানে বিনোদনের জন্য গোসলে আসেন তাদের কাছে থেকে ৭০ টাকা করে ফি গ্রহণ করা হয়। এসব সুইমিংপুলের ফান্ডে জমা হয়। 

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশরাজশাহী জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাঁতারু মুন্নী খাতুন রোকেয়া। জাতীয়পর্যায়ে সাঁতারে পদক অর্জন করেছেন। বর্তমানে রাজশাহী জেলা সুইমিংপুলে অস্থায়ীভাবে সহকারি মহিলা প্রশিক্ষকের দায়িত্বে রয়েছেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ সুইমিংপুলে বেশিরভাগই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে-মেয়েরাই আসেন সাঁতার শিখতে। তাদের যদি জেলা ক্রীড়া সংস্থা কিংবা সরকারের তরফ থেকে ভালো সুইমিং কস্টিউম, প্রোটিন ও ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার এবং উন্নত প্রশিক্ষণ উপকরণের সরবরাহ করা হতো তবে তারা আরো ভালো করতে পারতো। 

এছাড়াও এখানে সমস্যা রয়েছে পানির। ঘোলা শাওলাযুক্ত পানির কারণে প্রশিক্ষণার্থীরা প্রশিক্ষণে কষ্ট পায়। আবার ছাউনি না থাকার কারণে গরম পানিতে সাঁতার কাটতেও তাদের অস্বস্তি হয়। এসব সমস্যা দূর করতে পারলে হয়তোবা রাজশাহী থেকেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সাঁতারু গড়ে তোলা সম্ভব হতো বলে মনে করেন এ নারী প্রশিক্ষক। 

রাজশাহী জেলা সাতার সমিতির সদস্য সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম সিরাজ বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে (১২ বছর) স্কুল, জেলা, বিভাগ ও জাতীয়সহ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে স্বর্ণ, রৌপ্য ও তাম্রসহ প্রায় শতাধিক পদক কুড়িয়েছে এ প্রতিষ্ঠানটি। প্রতি বছরই এ সুইমিংপুল থেকে জাতীয়পর্যায়ে পদক অর্জন করে এখনকার সাঁতারু। গত বছরই সাবা ও সারা নামের দুই শিশু সাঁতারু এ সুইমিংপুলের অধীনে খেলে জাতীয় পদক পেয়েছে। আবার কেউ যদি ভালো সাঁতারু হয়ে ওঠে, তবে সে খুব সহজেই নৌ, সেনা, বিডিআর কিংবা ফায়ার ব্রিগেড বাহিনীতে চাকরির সুযোগ পায়। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের অনেক কিশোর-কিশোরীই ঝুঁকছে সাঁতার প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতায়। 

প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে এ প্রতিবেদককে তিনি আরো জানান, ২০১৮ সালে বিদ্যুতের তার পুড়ে যাওয়ার কারণে প্রায় ১৯ মাস বিদ্যুৎ ছিল না। এরমধ্যে করোনার কারণে আরো দু’বছর সাঁতার প্রশিক্ষণ বন্ধ ছিল। এতে আমরা অনেক প্লেয়ার হারিয়ে ফেলি। অনেক তরুণ কাজ-কর্মে যোগ দেয়। আবার কিছু ভালো সাঁতারুদের (তরুণী) বিয়ে হয়ে যায়। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার বলেও এসব সমস্যার সমাধান না পেয়ে আমাদের রাজশাহী সাঁতার সতিমির আহ্বায়ক মো. আব্দুল হান্নান নিজ অর্থায়নে ও ডিসি অফিসের সহায়তায় বিদ্যুতের লাইন মেরামত করান। এরপর গত ১৫ মার্চ থেকে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে পুনরায় গতি ফিরিয়ে আনা হয়। তিনি এ উদ্যোগ গ্রহণ না করলে এখনো হয়তো প্রশিক্ষণসহ পুলটি অকেজো হয়ে থাকতো।

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশজানতে চাইলে রাজশাহী জেলা সাঁতার সমিতির আহ্বায়ক মো. আব্দুল হান্নান বলেন, রাজশাহী জেলা সুইমিংপুলটি আজ বেশ কিছু সমস্যায় জর্জরিত। বাউন্ডারি প্রাচীর অনেকটায় ভেঙে পড়ার অবস্থায়। বহিরাগতের উৎপাত, সুইমিংপুলের তলদেশের প্রায় ৮০ ভাগ টাইলস নষ্ট, বাইরের উড়ে আসা ময়লা ও পাম্পের ঘোলা ও আয়রণযুক্ত পানির কারণে শাওলা দ্রুত জমে যায়। তাছাড়া এখানে প্রশিক্ষক ও জনবল সঙ্কটও রয়েছে পর্যাপ্ত। বর্তমানে গরমের সময় রোদের তাপে গরম পানিতে ছেলে-মেয়েরা সকাল কিংবা দুপুরে সাঁতার শিখতে পারে না। বাধ্য হয়ে বিকেলে শেখাতে হয়।

রাজশাহী জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ওয়াহেদ উন নবী অনু বলছেন, আগামী রোববার ঢাকায় একটি মিটিং আছে। জেলা ক্রীড়া সংস্থায় যেসব সমস্যা রয়েছে সেখানে এসব তুলে ধরা হবে। বিশেষ করে সাঁতারের বিষয়টা। কারণ এটি সম্ভবনাময় একটি ক্রীড়া।

রাজশাহী জেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি ও রাজশাহী জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল বলেন, কিছু সমস্যার কথা আমার কানে আসার পরপরই আমি এ নিয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। বাকি যে সমস্যাগুলি রয়েছে তা ধীরে ধীরে সমাধান করা হবে।

তবে ভবিষ্যতে জেলা সুইমিংপুল ও পাশের ইনডোর স্টেডিয়ামটি ভেঙে একটি আধুনিকমানের বড় ক্রীড়া কমপ্লেক্স করার চিন্তা করছে সরকার। রাজশাহীর ক্রীড়া নিয়ে সমস্ত সুবিধা ও সম্ভাবনার বিষয়গুলো আমলে নিয়ে সেগুলোর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে বলে জানান ডিসি আব্দুল জলিল।

ডেইলি-বাংলাদেশ/আরএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!