`টিকিট দেন, বাড়ি আখাউড়া'
দেশের পূর্বাঞ্চল রেলপথে নিয়মিত চলাচল করে অসংখ্য আন্তঃনগর, মেইল ও লোকাল ট্রেন। ঐসব ট্রেন দিয়ে হাজারো যাত্রী যাতায়াত করছেন। ট্রেন ভ্রমণ নিরাপদ হওয়ায় দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে যাত্রীর সংখ্যাও। কিন্তু আসনবিহীন, বিনা টিকিট আর প্রভাব খাটিয়ে ভ্রমণকারীরাও থেমে নেই।
অনেক যাত্রী নানা কৌশলে আসনবিহীন টিকিট বা বিনা টিকিটে আন্তঃনগর ও মেইল ট্রেন দিয়ে বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করছেন। ট্রেনের কিছু অসাধু গার্ড, অ্যাটেনডেন্ট, দায়িত্বরত রেলওয়ে পুলিশসহ সংশ্লিষ্টরা অবৈধভাবে বিনা টিকিটে যাত্রী ভ্রমণে জড়িত রয়েছেন বলে যাত্রীরা বিভিন্ন সময় অভিযোগ করেন।
তাছাড়া আন্তঃনগর ও মেইল ট্রেনগুলোতে স্থানীয় প্রভাব দেখিয়ে অনেক যাত্রীকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করতে দেখা যায়। ঐসব যাত্রীর মধ্যে কিছু ছাত্রনেতা, ছাত্র, যুবক, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণির যাত্রী রয়েছেন। তারা সঙ্গবদ্ধ হয়ে অথবা ব্যক্তিগতভাবে প্রভাব দেখিয়ে টিকিট ছাড়াই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করেন। তবে তাদের গন্ত্যব্য বেশি দূর নয়, এক স্টেশনের যাত্রা বিরতি থেকে অন্য স্টেশনের যাত্রা বিরতি পযর্ন্ত। তারা নিজেদের ‘আখাউড়া বাড়ি’ বলে দাবি করেন।
.png)

ঢাকা থেকে আসার পথে ট্রেনের মধ্যে স্থানীয় প্রভাবের ঘটনা বেশি ঘটছে। এর মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, সিলেট রেলপথে চলাচলকারী আন্তঃনগর উপকূল, মহানগর, জয়েন্তীকা, কালনী, মেইল ট্রেন চট্টলা, তিতাস কমিউটার, ও কর্ণফুলী ট্রেন রয়েছে। ঐসব ট্রেন নরসিংদী, পূবাইল, আড়িখলা, ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া, আজমপুর, কুমিল্লার পথে এই প্রভাব খাটানোর ঘটনা অহরহ ঘটছে। ট্রেনের যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
তাছাড়া ট্রেনের কিছু অসাধু গার্ড, অ্যাটেনডেন্টসহ দায়িত্বরতরা আসনবিহীন যাত্রীদের খাবার গাড়ি, বগির ইবাদতখানায় বসিয়ে এবং দরজার পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেন। বিনিময়ে তারা অবৈধভাবে যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। যাত্রীরাও সহজ পন্থায় গন্তব্যস্থলে যেতে তাদেরকে ম্যানেজ করে ট্রেনে ভ্রমণ করছেন।
রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, টিকিটবিহীন কোনো যাত্রীকে ট্রেনে ভ্রমণ করার সুযোগ নেই। বিনা টিকিটে কোনো যাত্রী যেন ট্রেনে ভ্রমণ না করতে পারেন সেক্ষেত্রে দায়িত্বরতরা খুবই তৎপর। তারা টিকিটবিহীন যাত্রীদের কাছ থেকে গন্তব্যের ভাড়া আদায় করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পূর্বাঞ্চল রেলপথের আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রা বিরতি দিয়ে প্রতিদিন আন্তঃনগর মহানগর গোধূলী, প্রভাতি, তৃর্ণা নিশিতা, পাহাড়িকা, উদয়ন, উপকূল এক্সপ্রেস, বিজয় এক্সপ্রেস চলাচল করছে।
তাছাড়া আখাউড়ার আজমপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে পারাবত, জয়েন্তিকা, উপবন, কালনী এক্সপ্রেস ট্রেন চলাচল করছে। ঐসব ট্রেন দিয়ে প্রতিদিন চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, কলেজ শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার লোকজন নানা প্রয়োজনে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করছেন।
এর মধ্যে কেউ আখাউড়া থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ভৈরব, নরসিংদী, আড়িখোলা, পূবাইল বিমানবন্দর-ঢাকা যাচ্ছেন। কেউ চট্টগ্রাম-সিলেট ও নোয়াখালী যাচ্ছেন। কাজ শেষে আবার ট্রেনে করে ফিরে আসছেন। তবে ঢাকা থেকে আসার পথে স্থানীয় কিছু ছাত্রনেতা, ছাত্র, যুবক, চাকরিজীবী টিকিট না কেটেই ট্রেনে ভ্রমণ করছেন। এতে ট্রেনের যাত্রীসহ সংশ্লিষ্ট লোকদের সঙ্গে তাদের বাকবিতণ্ডা ঘটছে।
আবার অনেক যাত্রী কাউন্টারে আসনযুক্ত টিকিট না পাওয়ায় তারা কৌশলে ট্রেনের অ্যাটেনডেন্টসহ দায়িত্বরদের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকার বিনিময়ে ভ্রমণ করছেন।

সরেজমিন আখাউড়া রেলওয়ে জংশন স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, নোয়াখালী থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী আন্তঃনগর উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনটি আখাউড়া রেলওয়ে জংশন স্টেশনে যাত্রা বিরতি করছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতে অনেক যাত্রী ট্রেনে উঠছেন। এর মধ্যে টিকিটবিহীন অনেক যাত্রীকে ট্রেনের দায়িত্বরত অ্যাটেনডেন্টদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। তারা বলছেন, বাড়ি আখাউড়া টিকিট দেন।
তারা নিরাপদে গন্তব্যে যেতে দরদাম করছেন। নিরুপায় হয়ে ঐসব যাত্রী অ্যাটেনডেন্টের হাতে তুলে দেন দাবি করা অর্থ। এরপর তাদের বিনা টিকিটের যাত্রীদের খাবার গাড়ির আসনে ও ইবাদতখানায় বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অপরদিকে স্থানীয় কিছু ছাত্রনেতা, ছাত্র, যুবক, চাকরিজীবী ট্রেনের দায়িত্বরতদের তোয়াক্কা করছেন না। গল্প-গুজব করে এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে ভ্রমণ করছেন।
একটি সূত্র জানায়, ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকেই নানা কৌশলে বিনা টিকিটের যাত্রীরা ট্রেনের আসনে গিয়ে বসে পড়ছেন। এদের বেশিরভাগ বিমানবন্দর রেলস্টেশনে নেমে পড়েন। পরে সেখান থেকে আবার একই কায়দায় বিনা টিকিটের যাত্রীরা ট্রেনে উঠছেন। এ সময় টিকিট তল্লাশি করতে আসা কর্মকর্তারা এলে বলেন সামনের স্টেশনে নেমে যাবো। এ নিয়ে ট্রেনে প্রায় সময় বাকবিতণ্ডা হয়ে থাকে। সবচেয়ে বেশি বিনা টিকিটের যাত্রী উঠানামা করার অভিযোগ রয়েছে নরসিংদী, ভৈরব ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দাদের মধ্যে।
আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশনে কথা হয় ট্রেন যাত্রী মিলন মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, স্ত্রীকে ডাক্তার দেখানোর জন্য অনেক চেষ্টা করেও ঢাকা যেতে আসনযুক্ত কোনো টিকিট পাননি তারা। এক পর্যায়ে আন্তঃনগর উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনের দায়িত্বরত অ্যাটেন্ডেন্টের সঙ্গে কথা বলে তারা ট্রেনে ওঠেন। এজন্য তাকে দিতে হয় জনপ্রতি ৩৬০ টাকা। এ স্টেশনের বেশিরভাগ টিকিট কালোবাজারিদের হাতে চলে যাওয়ায় সময়মতো টিকিট পাওয়া যায় না।
যাত্রী মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, কাউন্টারে টিকিট না পেয়ে অ্যাটেনডেন্টের সঙ্গে কথা বলে খাবারের বগিতে করে আসতে হয়েছে। এজন্য অ্যাটেনডেন্টকে ১৮০ টাকা দিতে হয়েছে।
ট্র্রেন যাত্রী মো. রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ঢাকায় কর্মরত আছেন। প্রতিদিন তিতাস কমিউটার ট্রেনে ঢাকায় যান। বিকেলে আবার উপকূল কিংবা তিতাস ট্রেনে বাড়ি ফেরেন। বেশিরভাগ সময় অ্যাটেনডেন্টের সঙ্গে কথা বলে যাওয়া-আসা করতে হয়।
চট্টলা ট্রেনের যাত্রী শিক্ষক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী চট্টলা ট্রেনে যাত্রা বিরতি দেওয়া প্রতিটা স্টেশন থেকেই বিনা টিকিটের যাত্রীদেরকে অ্যাটেনডেন্টরা ওঠা-নামার সুযোগ করে দিচ্ছেন। এজন্য তাদের কাছ থেকে নগদ টাকা নিয়ে কখনো সিটে বসাচ্ছেন, আবার কখনো কেবিনে, কখনো বাথরুমের পাশে মোড়া বিছিয়ে গন্তব্যে নেয়ার ব্যবস্থা করছেন। ট্রেনের দায়িত্বশীলরা যদি কঠোর হতেন তাহলে বিনা টিকেটধারী লোকজন এমন ভ্রমণ করতে পারতেন না।
নোয়াখালীগামী আন্তঃনগর উপকূল ট্রেনের অ্যাটেনডেন্ট মো. লিটন বলেন, প্রতিদিন নরসিংদী, পূবাইল, আড়িখলা, ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া, কুমিল্লা যেতে আসনবিহীন টিকিট বা বিনা টিকিটধারী কিছু ছাত্রনেতা, ছাত্র, যুবক, চাকরিজীবী ট্রেনে নিয়মিত ভ্রমণ করছেন। তারা সংঘবদ্ধ হয়ে যাতায়াত করার সুবাদে ট্রেনের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। ট্রেনের দায়িত্বরত লোকজন টিকিট আছে কিনা জিজ্ঞাসা করলে তারা বলেন, ‘বাড়ি আখাউড়া, আমরা ছাত্র, কেউ বলেন কাউন্টারে আসনযুক্ত টিকিট নেই, কেউ বলেন সামনের স্টেশনে নেমে যাব। এসব নিয়ে বাকবিতণ্ডাও হয়ে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেতে নরসিংদী, পূবাইল, আড়িখলা, ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া, কুমিল্লা পথে এ ঘটনা ঘটছে। প্রতিদিন ঢাকা থেকে আসার পথে যাত্রী কর্তৃক প্রভাব বিস্তারের কিছু ঘটনা ঘটলে ও সাপ্তাহিক বন্ধের দিন বেশি হয়ে থাকে। আমরা অনেক ক্ষেত্রে নিরুপায়।
চট্টগ্রামগামী কর্ণফুলী ট্রেনের অ্যাটেনডেন্ট মো. শাহজাহান বলেন, নরসিংদী থেকে আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশন পযর্ন্ত কয়েকটি স্টেশনে স্থানীয় পর্যায়ের কিছু যাত্রী প্রায় সময় প্রভাব বিস্তার করেন। কেউ বলেন স্টাফের ছেলে, কেউ বলেন ছাত্র, আবার কেউ কেউ ছাত্রনেতা বলে এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে ভ্রমণ করছেন। টিকিট কাটা নিয়ে অনেক সময় ঝামেলা তৈরি হয়।
আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশন সুপার মো. কামরুল হাসান তালুকদার বলেন, বিনা টিকিটে ট্রেনে ভ্রমণ করার কোনো সুযোগ নেই। আন্তঃনগর ও মেইল ট্রেনগুলোতে দায়িত্বরত টিটিইরা খুবই তৎপর। যেসব যাত্রী বিনা টিকিটে ট্রেন উঠছেন তাদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করছেন। প্রতিদিন বিনা টিকিটে ভ্রমণকারী যাত্রী কর্তৃক আদায়কৃত ভাড়াগুলো টিকিট কাউন্টারে জমা দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া ট্রেন যাত্রীদের নিরাপত্তা দিয়ে রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট লোকজন সার্বিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।