জেলার অন্যতম বড় হাওর ডিঙ্গাপোতা। মাছের অভয়ারণ্য এই হাওরে পানি থাকে বছরে ছয় মাস। ছোট বড় হাজারো নৌকা জুনের শুরু থেকেই মাছ ধরতে নামে হাওরে। তবে এবার পানি শূন্য হাওরে মাছ ধরা নিয়ে শঙ্কায় স্থানীয়রা।
হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধানের ঘরে উঠেছে প্রায় দেড় মাস আগে। কৃষকরা জাল আর নৌকা নিয়ে হাওরের নামার প্রস্তুতি থাকলেও বাধা শুধু পানির। হাওরের এমন বিরূপ রূপ আগে দেখেননি তারা।
.png)

গত বছর এ সময় বন্যার পানিতে হাওর ভাসলেও এবারের চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। অনাবৃষ্টিতে শুকিয়ে গেছে হাওরের খালবিল। যার প্রভাব পড়েছে মাছ উৎপাদনে। জেলায় প্রায় ৬৪ টি হাওরে গত বছর মাছ উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন। ৩শ টাকা কেজি দরে যা বাজার মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৭৫০ কোটি টাকায়।
মে থেকে জুন মাসে মাছের প্রজনন ও উৎপাদনের মৌসুম থাকলেও এবারের পানি শূন্যতা প্রভাব পড়তে পারে দেশীয় মাছ উৎপাদনে। চলতি মাসেও পানি না আসলে বাজারে মাছের সংকটসহ বৃদ্ধি পেতে পারে দামও। পাশাপাশি হাওরের এমন বৈরী পরিস্থিতি প্রভাব পড়বে স্থানীয় অর্থনীতিতে এমনটাই মনে করছেন কৃষকরা।

হাওরের মাছ শূন্যতার প্রভাব এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে বাজারে। জেলার একমাত্র মোহনগঞ্জ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে সরবরাহ নেই মাছের। গত বছর যেখানে প্রতিদিন মাছ বিক্রি হয়েছে কোটি টাকা সেখানে বিক্রি নেমে এসেছে অর্ধলাখ টাকায়।
মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ১০২টি আড়ৎ ঘরের সব কয়টি এখন প্রায় ফাঁকা। দুই একটিতে মাছ কেনাবেচা হলেও বাকিগুলোতে শুয়ে বসে দিন কাটছে ব্যবসায়ীদের। মাঝে মধ্যে কিছু মাছের ঝুড়িতে বোয়াল, পাবদা, টেংরা, মলা, গুলশাসহ হাওরের কিছু দেশি মাছ আসলেও দাম থাকে নাগালের বাহিরে। বাজার ধরে রেখেছে চাষের মাছ।

চাহিদা না থাকায় বন্ধ রয়েছে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র বিশ টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন বরফ কলটিও। গত বছরের ডিসেম্বরে বরফ কল বন্ধের পর এখন পর্যন্ত তা চালু হয়নি। অথচ গত বছর মে- জুন দুই মাসেই বরফ বিক্রি হয়েছে ৪ লাখ টাকা।
একই অবস্থায় হাওর পাড়ের আরো ৩০টি বরফ কলের। বাজারে মাছ না থাকায় চাহিদা নেই বরফের। মিল মালিকরা প্রতিষ্ঠানগুলো চালু রাখলেও শ্রমিক আর আনুষঙ্গিক ব্যয়ের পুরোটাই যাচ্ছে মালিকদের পকেট থেকেই। সব মিলিয়ে অর্ধকোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে বরফ কলগুলোর।

মোহনগঞ্জ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক শরিফুল ইসলাম ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, এবছর অবতরণ কেন্দ্রে মাছ সংকট রয়েছে। তাই এখনো মাছের তেমন কোনা বেচাবিক্রি শুরু হয়নি। গত বছর হাওরে বন্যা হওয়ায় মাছের উৎপাদনও বেশি হয়েছে। অবতরণ কেন্দ্রে বেচাবিক্রিও অনেক বেশি ছিলো। একদিনেই কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়েছে। কিন্তু এবছর উল্টা চিত্র। ভরা মৌসুমেও অবতরণ কেন্দ্রে মাছের দেখা নেই।

তিনি আরো বলেন, এখানকার হাজারো মাছ ব্যবসায়ী এখন কর্মহীন। আমাদের ১০২টি আড়ৎ ঘরের প্রায় সবকয়টি এখন ফাঁকা প্রায়। হাওরে পানি না আসলে বেচাবিক্রি এমনি থাকবে। গত বছর মে মাস থেকেই অবতরণ কেন্দ্র পুরোপুরি শুরু হয়। মে- জুন দুই মাসেই বরফ বিক্রি হয়েছে ৪ লাখ টাকা। কিন্তু এই বছর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র বিশ টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন বরফ কলটি চালু করতে পারিনি।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহান কবীর ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, উজানের ঢল আসতে দেরি হওয়ায় হাওরে মাছ উৎপাদনে কিছুটা শঙ্কা সৃষ্টি করতে পারে। তবে আশা করছি বৃষ্টিপাত শুরু হয়ে যাবে। হাওরে পানি আসবে দেরি হওয়া সাময়িক সমস্যা। বৃষ্টিপাত শুরু হলেই মাছের প্রজনন শুরু হয়ে যাবে সেই সঙ্গে মাছের উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া আমরা প্রতি বছর হাওরে মাছের পোনা অবমুক্ত করে থাকি। প্রাকৃতিক ভাবেও হাওরে মাছ আসবে তাই আমরা মনে করছি। হাওর মাছ উৎপাদনে কোনো সংকট সৃষ্টি হবে না। .

তিনি আরো বলেন, মাছ বিট বা প্রজনন করে প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর। হাওরে যেহেতু এখনো পুরোপুরি বৃষ্টি শুরু হয়নি তাই এই বছর মাছের প্রজনন করতে ও পোনা ছাড়তে কিছুটা দেরি হচ্ছে। তবে এরইমধ্যে জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা দুর্গাপুর ও কলমাকান্দায় উজানের পানি আসতে শুরু করছে। এই পানি অল্প কিছু দিনের মধ্যেই হাওরে প্রবেশ করবে। তাই আশা করি হাওরে মাছের উৎপাদনে কোনো ঘাটতি দেখা দিবে না। গত বছর হাওরে মাছের উৎপাদন হয়েছে ২৫ হাজার মেট্রিক টন। এ বছর এই উৎপাদন ২৬ বা ২৭ হাজার মেট্রিক টনে বৃদ্ধি পেতে পারে।