ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

জীবনযুদ্ধে হার না মানা মিলন

আব্দুল হালিম, রাজবাড়ি
প্রকাশিত: ১৫:৩০, ৬ আগস্ট ২০২৩
জীবনযুদ্ধে হার না মানা মিলন
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

সপ্তাহে ১০ টাকা বেতনে একটি কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন মিলন কাজী। এখন তিনি একটি কারখানার মালিক। তার কারখানাটিতে প্রতিদিন কাজ করেন ১৯ জন শ্রমিক। শত বাধা আর হার না মানা পরিশ্রম এনে দিয়েছে সাফল্য। এখন তিনি একজন সফল উদ্যোক্তা।

মিলন কাজীর বাড়ি রাজবাড়ি সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের চরলক্ষীপুর গ্রামে। তারা চার ভাইবোন। মিলন ভাইবোনদের মধ্যে দ্বিতীয়। পড়ালেখা বেশি করতে পারেননি তিনি। মাত্র ৬ষ্ঠ শ্রেণিতেই থামে তার স্কুল জীবন। স্কুল আর খেলাধুলা করে কাটানোর সময়ে তিনি কাজ করতে যান একটি ছোট কারখানায়। শুরু হয় কর্মজীবন। এখন আর তাকে কাজ করতে হয় না। কারখানার কাজ দেখাশোনা আর তৈরি মালামাল বিক্রিতেই সময় কাটে তার।

রাজবাড়ি-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে রাজবাড়ি শহরের চরলক্ষীপুর গ্রামে গড়ে তুলেছেন ‘মিলন ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসপ’ নামে একটি কারখানা। যেখানে রিকশা-ভ্যানের যাবতীয় যন্ত্রাংশ তৈরি করা হয়। প্রথমে এসব তৈরিকৃত মালামাল শহরের স্থানীয় ভ্যান-রিকশা গ্যারেজে বিক্রি করা হতো। এখন সারাদেশেই বিক্রয় করা হচ্ছে।

Advertisement

সম্প্রতি তার কারখানায় পৌঁছাতেই শোনা যায় টুংটাং শব্দ। কারখানার শ্রমিকরা আলাদা সেক্টরে ভাগ হয়ে কাজ করছেন। কেউ লেদ মেশিনে পাইপের প্যাঁচ কাটছেন, কেউ ঝালাইয়ের কাজে ব্যস্ত, আবার কেউ তৈরি হওয়া মালামাল বাছাই করছেন। কারখানার মালিক মিলন কারখানার সবার কাজ দেখভাল করছেন।

কারখানা গড়ে তোলার গল্পটা তিনি নিজে মুখেই বললেন। মিলন বলেন, স্বল্প আয়ের পরিবারে আমার জন্ম। ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে রাজবাড়ি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। আর্থিক সংকটের কারণে পড়ালেখা করতে পারিনি। ছয় মাস না যেতেই রাজবাড়ি স্টেশন রোড মওলা ওয়ার্কশপ নামে একটি দোকানে কাজে যাই। সেখান থেকে আমাকে হাত খরচ বাবদ সপ্তাহে ১০ টাকা দিতো। সেখানে দু’বছর কাজ শিখি। তারপর চলে যাই ঢাকা।

‘ঢাকার তেঁজগায়ে ট্রাক স্ট্যান্ডে গিয়াসউদ্দিন ওয়ার্কশপে কাজে ঢুকি। সেখানে এক হাজার ৮০০ টাকা মাসে পেতাম। সেখানে তিন বছর কাজ করি। আমার কাজ শেখা প্রায়ই হয়ে যায়। তারপর অন্য একটা ওয়ার্কশপে চলে যাই। সেখানে ৮ বছর ছিলাম। শুরুতে মাসে তিন হাজার টাকা দিতো। আর শেষের দিকে পেতাম ১৪ হাজার। এরপর রাজবাড়িতে চলে আসি। বিয়ে করি। নতুন সংসার। ঢাকা যেতে মন চাচ্ছিল না।’

ছবি ডেইলি বাংলাদেশতিনি আরো বলেন, এরপর রাজবাড়িতেই একটি লেদ কারখানায় কাজ শুরু করি। কিন্তু বেতন কম। বাধ্য হয়েই করতে লাগলাম। বছর দুয়েক করার পর কোমড়ে আঘাত পাই। কাজ ছেড়ে দেই। বেকার হয়ে বসে পড়লাম। সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলাম। তারপর রাজবাড়ি নতুন বাজার বাসস্ট্যান্ডে একটি ছোট দোকানে বিকাশের ব্যবসা শুরু করি। ব্যবসা চলাকালীন সময়ে একজন প্রতারকের ফাঁদে পরি। ডিসি অফিসে চাকরি দেওয়ার কথা বলে আমার কাছ থেকে অনেকগুলো টাকা নেয়। কিন্তু আমার চাকরি হয়নি। এখানে একটা বড় ধাক্কা খাই।

মিলন আরো বলেন, এলাকার এক বড় ভাই ঢাকায় ভ্যান-রিকশার সামনের চেসিস বানানোর ব্যবসা করতেন। তিনি শহরের বিসিক শিল্প এলাকায় এসে দোকান দেন। ২০১৭ সালে তার সঙ্গে ভাগে ব্যবসা শুরু করি। কিছুদিন পর তিনি (ব্যবসায়িক অংশীদার) অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসার খরচ মেটাতে তিনি তার অংশ আমার কাছে বিক্রি করে দেন। এরপর আমি চরলক্ষীপুর তালতলায় একটি ঘর ভাড়া নিয়ে আবার কারখানা চালু করি। সেখানে বছর দুয়েক কারখানা ছিল। কারখানার মালামালের চাহিদা বাড়তে থাকে। ওখানে জায়গা বাড়ানোর অবস্থা ছিল না। তাই কারখানার জন্য এই টিনশেড ঘরটি ভাড়া নিয়ে এখন ব্যবসা পরিচালনা করছি।

মিলন বলেন, আমার এখানে ১৯ জন শ্রমিক কাজ করছেন। তারা সবাই আমার এলাকার বাসিন্দা। একসময় তারা বেকার ঘুরতেন। আমি তাদেরকে কাজ দিতে পেরে আনন্দিত।

মিলন কাজীর বাবা সুমন কাজী বলেন, মিলন আমার দ্বিতীয় সন্তান। সে আগে অন্যের কারখানায় কাজ করতো। এখন নিজে করে একটা কারখানা করতে পেরেছে। এতে আমি অনেক খুশি।

রাজবাড়ি জেলা বিসিকের ভারপ্রাপ্ত সহকারী মহাব্যবস্থাপক চয়ন বিশ্বাস বলেন, আমরা সবসমই কাজের ক্ষেত্র তৈরি করতে চাই। বিসিকের নিবন্ধনকৃত প্রতিষ্ঠানকে আমরা ক্ষুদ্রঋণের সহায়তা করে থাকি। যদি মিলন ওয়ার্কশপ আমাদের এখান থেকে নিবন্ধন নেন। তাহলে আমরা তাকেই ক্ষুদ্রঋণ সহায়তা করার করবো।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআই
ট্যাগ: রাজবাড়ী
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!