ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]
শতবর্ষী শিমুল গাছকে ঘিরে শত গল্প

গাছের ডাল কাটলেই নাক-মুখ দিয়ে আসে রক্ত! 

সুজন সেন, শেরপুর
প্রকাশিত: ১২:১৮, ২৪ জানুয়ারি ২০২৪
গাছের ডাল কাটলেই নাক-মুখ দিয়ে আসে রক্ত! 
৫০০ বছরের পুরোনো বেড় শিমুল গাছ

অনেকদিন আগে শিমুল গাছটি বিক্রি করা হয়েছিল। গাছের একটি ডাল কাটতেই নাক ও মুখ দিয়ে রক্ত আসতে শুরু করে লোকজনের। তারপর থেকে আর গাছ বিক্রি করা সাহস করেননি মালিক। পরে তা কেউ কিনতেও আসেননি। এই গাছটির অবস্থান শেরপুরের নকলা উপজেলার নারায়ণ খোলা এলাকায়। 

স্থানীয় হোসেন আলী বলেন, বিশালাকৃতির শিমুল গাছটি দেখতে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন আসে। গাছটির বয়স কয়েকশ বছর। 

তিনি আরো বলেন, এক সময় ওই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে গবির ও অসহায় মানুষ বিয়ের কথা বললে কাশার থালা, বাসন, ঘটি-বাটিসহ নানা তৈজসপত্র কিছুক্ষণ পর গাছের নিচে পাওয়া যেতো। আবার কাজ শেষে সব জিনিস ফেরত দিতে হতো, যদি কেউ লোভ করে দুই একটা জিনিস রেখে দিতো তবে অদৃশ্যভাবে ভয়ভীতি দেখানো হতো। মানুষের লোভের কারণে এ জিনিস দেওয়া একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়। জীবনের চলার পথে বিপদে-আপদে এই গাছের নিচে মানত করলেও উপকার পাওয়া গেছে। 

Advertisement

ওই এলাকার মোকাররম মিয়া বলেন, জেলার বৃহত্তম শিমুল গাছকে ঘিরে রয়েছে নানান ইতিহাস। ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সংগ্রাম করতে হচ্ছে এই গাছকে। অযত্নে আর অবহেলায় বিলীনের শঙ্কায় রয়েছে কয়েকশ বছরের পুরোনো গাছটি। 

স্থানীয় বাসিন্দা জয়নব বেগম বলেন, গাছটির বয়স পাঁচশ বছরের মতো হবে। গাছের কান্ডের পশ্চিম পার্শ্বে হাতি সদৃশ্য এবং উত্তর পার্শ্বে নৌকার বৈঠা ও সাপের সদৃশ্য। গাছটির যেকোনো একটি শাখা ধরে নাড়া দিলে সমগ্র গাছ নড়ে ওঠে।

কৃষক মমতাজ মিয়া বলেন, গাছটি সমতল ভূমি থেকে প্রায় ১২০ ফুট উঁচু। ৪২ গজ ব্যাসের এই গাছটি প্রায় এক বিঘা জমিজুড়ে অবস্থান। শিমুল গাছটি এতটাই ঘন যে এর নিচে রোদ, বৃষ্টি ও কুয়াশা পড়ে না। প্রচন্ড গরমের সময়ও গাছের নিচের অংশ ঠান্ডা থাকে। পথিক ও কৃষক থেকে শুরু করে নানা বয়সি লোকজন গাছের তলায় শুয়ে-বসে বিশ্রাম নেয়। দুপুর ও বিকেলে দেখা যায়, ডালে ডালে শুয়ে ঘুমাচ্ছে মানুষ। গাছটি যার জমিতে আছে তিনি তার বাবার পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে পেয়েছেন এভাবেই চলে আসছে। কিন্তু কেউ বলতে পারে না এর জন্মলগ্নের সঠিক ইতিহাস।

৫০০ বছরের পুরোনো বেড়শিমুল গাছ

স্থানীয়রা জানান, অযত্ন-অবহেলা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও নানামুখী অত্যাচারের কারণে ঐতিহ্যবাহী বেড় শিমুল গাছটির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। মারা যাচ্ছে অনেক উপবৃক্ষ। ভেঙে পড়ছে বড় বড় ডাল।

স্থানীয় বাসিন্দা অলফাজ উদ্দীন বলেন, এলাকার চারিদিক খোলামেলা পরিবেশ থাকায় ধীরে ধীরে এটি পিকনিক স্পট হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এই বেড় শিমুল গাছের নিচে চলচ্চিত্রের শুটিংও হয়েছিল। খ্যাতিমান অভিনেতা অমিত হাসান, আলিরাজ, আনোয়ারা, জয় ও জাবেদসহ আরো অনেকেই এখানে শুটিং করার জন্য এসেছেন।

ময়মনসিংহ থেকে গাছটি দেখতে আসা শাহরিয়ার সুমন বলেন, আশ্চর্যজনক বিশালাকৃতির গাছটি দেখে অভিভূত হয়েছি। দেশের অনেক স্থানে ঘুরে বেড়িয়েও এমন দৃষ্টিনন্দন গাছ কোথাও দেখিনি। 

তিনি আরো বলেন, এই গাছটি নিয়ে মিডিয়ায় প্রচার হলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নজর কাড়বে। একই কথা জানালেন শেরপুর শহর থেকে আসা যুবক আরিফুর রহমান আকিব, জিয়া সরকার, মনিরসহ আরো অনেকে।

স্থানীয় চন্দ্রকোনা কলেজের অধ্যাপক এপোল দাশ বলেন, কয়েক বছর থেকে জেলা পরিষদ ও নকলা উপজেলা পরিষদ গাছটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রাচীন এই গাছটি বৈজ্ঞানিক উপায়ে রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারলে শেরপুরের পর্যটন শিল্পে যোগ হবে নতুন মাত্রা। 

নকলা উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সারোয়ার আলম তালুকদার বলেন, বেড় শিমুল গাছটির আশপাশ এলাকা পর্যটন এলাকা হিসেবে ঘোষণার জন্য জেলা প্রশাসনসহ ঊর্ধ্বতন দফতরে ছবি ও তথ্যসহ লিখিত আবেদন পাঠানো হয়েছে। 

তিনি আরো বলেন, যেহেতু গাছটি ঐতিহ্যবাহী, স্বাভাবিক কারণেই গাছটি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে আসেন পর্যটকরা। তাই পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য উপজেলা পরিষদের অর্থায়নে ইট-সিমেন্টের বেঞ্চ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআরএস
ট্যাগ: গাছ শেরপুর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!