ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে ন্যায্যমূল্যে ‘স্বস্তির বাজার’

আতিকুর রহমান, ঝালকাঠি
প্রকাশিত: ১৫:০৬, ১৯ নভেম্বর ২০২৪
সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে ন্যায্যমূল্যে ‘স্বস্তির বাজার’
জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে চলছে ন্যায্যমূল্যের পণ্যের দোকান। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ঝালকাঠিতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করতে ও ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট ভাঙতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। ছাত্রদের ন্যায্যমূল্যের বাজার, জেলার চার উপজেলা প্রশাসন পরিচালিত স্বস্তির বাজার ও কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর সূলভ মূল্যের বাজার অন্যতম। 

এর মাধ্যমে কৃষক সরাসরি তার উৎপাদিত শাক-সবজি এ বাজারে নিয়ে আসছেন এবং ক্রেতারাও সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সেই শাক-সবজি কিনতে পারছেন। এখানে কোনো তৃতীয় পক্ষ বা মধ্যসত্বভোগী নেই। এর ফলে কৃষকও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন এবং ক্রেতারাও সঠিক দামে ক্রয় করতে পারছেন। 

জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় ব্যতিক্রমী এ আয়োজনে সর্বমহলের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। ১ নভেম্বর (শুক্রবার) সকালে শহরের সাধনার মোড় এলাকায় ঝালকাঠিতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ছাত্র-জনতার ব্যানারে স্থানীয় বাজারের চেয়ে কম দামে সবজি বিক্রি করছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। এ সময় তুলনামূলক কম দামে সবজি কিনতে সেখানে ভিড় করেন ক্রেতারা। 

Advertisement

জেলা প্রশাসক আশরাফুর রহমান সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উপস্থিত থেকে সবজি বিক্রি কার্যক্রমে অংশ নেন। এ সময় ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। সবজির মধ্যে প্রতিকেজি পটল ৪০ টাকা, পেঁপে, জালিকুমড়া ও শসা বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়, কাঁচা মরিচ ১১০ টাকা, মুলা ৩৫ টাকা ও লাউ প্রতিটি ৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে । 

এ ছাড়া আরো বেশ কিছু সবজি বাজারের চেয়ে ১০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত কম দামে বিক্রি করা হচ্ছে। 

১৩ নভেম্বর (বুধবার) সকালে ঝালকাঠি সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে স্বস্তির বাজারের উদ্বোধন করেন ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক আশরাফুর রহমান। এ সময় পুলিশ সুপার উজ্জ্বল কুমার রায়, সহকারি কমিশনার (ভূমি) সাইফুল ইসলামসহ সরকারি বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। 

সবজি বাজারে সিন্ডিকেট ঠেকাতে কৃষকদের পণ্য বিক্রি ও ক্রেতাদের স্বল্পমূল্যে সবজিসহ কৃষিপণ্য সরাসরি ক্রয়-বিক্রয় করতে ঝালকাঠি শহরে উদ্বোধন করা হয়েছে কৃষকের বাজার। এ বাজারে কৃষকরা সরাসরি তাদের উৎপাদিত পণ্য কোনো মধ্যসত্বভোগীর সহায়তা ছাড়াই বিক্রি করতে পারছেন। ১৪ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) সকালে নলছিটিতে উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে চালু হয়েছে কৃষকের পণ্যে ভোক্তার বাজার স্বস্তি। 

উপজেলা চত্বরে এর শুভ উদ্বোধন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম। এ সময় উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষক তাদের উৎপাদিত পণ‌্য বিক্রির জন্য স্বস্তির বাজারে নিয়ে আসেন। ক্রেতারাও তুলনামূলক কমদামে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করতে পেরে স্বস্তি প্রকাশ করেন। 

১৬ নভেম্বর (শনিবার) সকালে রাজাপুরে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে চালু হয়েছে কৃষকের পণ্যে ভোক্তার বাজার স্বস্তি। উপজেলা পরিষদ চত্বরে এর শুভ উদ্বোধন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাহুল চন্দ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) হাসান মোহাম্মদ শোয়াইব, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ, উপজেলা কৃষি অফিসার মোসা. শাহিদা শারমিন আফরোজ, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইসমাইল হোসেন, রাজাপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম স্বপন তালুকদারসহ অনেকেই। 

এ সময় উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষক তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য স্বস্তির বাজারে নিয়ে আসেন। ক্রেতারাও তুলনামূলক কম দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করতে পেরে স্বস্তি প্রকাশ করেন। 

১৪ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) কাঁঠালিয়ায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে কৃষকের পণ্যে ভোক্তার বাজার ‘স্বস্তি’ প্রতিপাদ্যে কৃষকের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছে দিতে বাজার উদ্বোধন করা হয়েছে। 

উপজেলার সদর ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন বালুর মাঠে এ বাজার উদ্বোধন করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. রুহুল আমীন। এ সময় উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. জহিরুল ইসলাম, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সঞ্জয় দাস, উপজেলা কৃষি অফিসার ইমরান বিন ইসলাম, রূপালী ব্যাংক ম্যানেজার মো. নাইমুর রহমান, উপসহকারী কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার মো. হাছিবুর রহমান, মো. জাহিদুল ইসলামসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। 

কৃষকরা নিজেদের উৎপাদিত নিরাপদ ও বিষমুক্ত টাটকা শাক-সবজি, ফলমূল, সরাসরি ন্যায্য মূল্যে এ বাজারে বিক্রয় করতে পারছেন। ভোক্তারা পাচ্ছেন ভেজাল মুক্ত টাটকা শাক-সবজি ও ফলমুল। 

প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের হাত থেকে জনসাধারণকে স্বস্তি দিতে এ বাজারের আয়োজন করা হয়েছে। এখানে সবজি, ডিম, মাছসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য সুলভ মূল্যে বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরাসরি কৃষক তার পণ্য ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করবেন। তাই পণ্যের দাম তুলনামূলক বাজারের থেকে কম হবে এবং বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকবে। 

ক্রেতা নাইম ইসলাম জানান, এখানে কিছু পণ্যের দাম অন্য বাজারের থেকে কিছুটা কম। আবার কিছু পণ্যের দাম অন্য বাজার গুলোর মতোই। তবে কৃষক যদি নিয়মিত তাদের পণ্য নিয়ে আসেন তাহলে দাম আরো কমবে। আমরা চাই এ ব্যবস্থাপনা চালু থাকুক। সিন্ডিকেট ভাঙতে এই বাজারের প্রয়োজনীয়তা আছে। এখানে কৃষকের কাছ থেকে ক্রেতারা সরাসরি কৃষিপণ্য ক্রয় করতে পারছেন। বাজারের চেয়ে কম মূল্যে সবজিসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পেরে খুশী ক্রেতারা। 

সদর উপজেলার ভিমরুলী গ্রামের কৃষক মনোতোষ হালদার বলেন, আমরা মাঠ থেকে কৃষিপণ্য পাইকারদের কাছে বিক্রি করতাম। এতে আমরা ন্যায্যমূল্য পেতাম না। সেই কৃষিপণ্যই বাজারে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করা হতো। এখন কৃষকের বাজার করে দেওয়ায় আমরা সেখানে বাজারের চেয়ে কমমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রি করলেও ভালো লাভ হচ্ছে। এতে ক্রেতারাও যেমন খুশি হবে, তেমনি কৃষকও বাঁচবে। 

নলছিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম জানান, কৃষকের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি ভোক্তার হাতে পৌঁছে দিতে এই বাজার চালু করা হয়েছে। আপাতত সাতদিন বাজার চলমান থাকবে। তারপর যদি জনসাধারণ চায় তাহলে সময় আরো বর্ধিত করা হবে। 

তিনি আরো বলেন, এখানে দুস্থদের জন্য স্বস্তি নামে কর্নার আছে। সেখানে যে কেউ চাইলে পণ‌্য ক্রয় করে রেখে যেতে পারবেন। যা পরবর্তীতে দুস্থ ও অসহায় মানুষদের মাঝে বিতরণ করা হবে। 

পুলিশ সুপার উজ্জ্বল কুমার রায় বলেন, কৃষক এবং ক্রেতার মাঝখানে মধ্যস্বত্যভোগীরা মুনফা নিয়ে যায়। এটা যাতে না হয় সেজন্যই আমরা কৃষকের বাজার করেছি। এই বাজারে কৃষকও লাভবান হবেন, ক্রেতারাও ন্যায্যমূল্যে মালামাল কিনতে পারবেন। 

ঝালকাঠি সদর উপজেলা প্রশাসন এ বাজার তত্ত্বাবধায়নে রয়েছে। এখানে সরাসরি কৃষক তাদের জমিতে উৎপাদিত পণ্য নিয়ে এসে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করছেন। কৃষকের কাছ থেকে ক্রেতারা সরাসরি কৃষিপণ্য ক্রয় করতে পারছেন। কোনো মধ্যস্বত্বভোগী থাকবে না। বাজারের চেয়ে কম মূল্যে সবজিসহ অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পেরে খুশী ক্রেতারা। জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের সার্বিক সহযোগিতা করা হবে বলে জানানো হয়েছে। 

জেলা প্রশাসক জানান, কৃষক সরাসরি তার উৎপাদিত শাক-সবজি এ বাজারে নিয়ে আসছেন এবং ক্রেতারাও সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সেই সবজি কিনতে পারছেন। এখানে কোনো তৃতীয় পক্ষ নেই। এর ফলে কৃষকও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন এবং ক্রেতারাও সঠিক দামে ক্রয় করতে পারছেন। 

জেলা প্রশাসক আরো বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসন বাজারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য কাজ করছে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বাজার নিয়ন্ত্রণে মনিটরিং অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) খুচরা বাজারে সুলভ মূল্যে ডাল, চিনি, আলু, পেঁয়াজ, তেল বিক্রয় শুরু করেছে। জনগণকে যে কম মূল্যে পণ্য দেওয়া যায় তার একটি উদাহরণ হিসেবে স্বস্তি, ন্যায্যমূল্যে ও সুলভ মূল্যের বাজার স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে স্বল্প লাভে ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব বলে বাজার সিন্ডিকেটদের কাছে একটি ম্যাসেজ পৌছে দিতে চাই । আমরা আশা করি, এর মধ্য দিয়ে বাজারের বিক্রেতারাও উৎসাহিত হবে জনগণকে ন্যায্যমূল্যে পণ্য দিতে। 

ঝালকাঠিবাসীর প্রতি ভালোবাসা জানিয়ে তিনি বলেন, বাজারমূল্যের সমস্যা সারা দেশেই সমান। তবুও ঝালকাঠি জেলার জনসাধারণকে ভালো রাখতেই আমার এসব নানামুখী উদ্যোগ। সরকার আমাকে ঝালকাঠির দায়িত্ব দিয়েছেন, ঝালকাঠির সবাই যাতে ভালো থাকে সেই আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: ঝালকাঠি
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!