গণকবরগুলো অযত্নে অবহেলায় পড়ে থাকায় চেনার কোনো উপায় নেই। এতে তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা ও হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের টর্চার সেল সম্পর্কে জানতে পারছে না। অথচ ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের এক সোনালী ইতিহাস আছে এই আখাউড়ায়।
গণকবরগুলো সংরক্ষণ করে সেগুলোর নাম ফলকের মাধ্যমে স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস আগামী প্রজন্মকে জানার সুযোগ করে দেওয়ার দাবি জানান স্থানীয়রা।
.png)
মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্যমতে, উপজেলার চিহ্নিত বেশ কয়েকটি গণকবর রয়েছে। এসব গণকবরের বাইরেও পৌর শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক গণকবর। শহিদদের এসব গণকবর এখনো অযত্ন, অবহেলায় পড়ে আছে। অনেক স্থান পরিণত হয়েছে গোচারণ ভূমিতে।
এদিকে পৌর শহরের তারাগন, দেবগ্রাম, নারায়ণপুর, গঙ্গাসাগর, আজমপুর, গাজীরবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে অসংখ্য গণকবর। এরমধ্যে পৌর শহরের নারায়ণপুর এলাকায় অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে ২৮ জন শহিদদের গণকবর। স্বীকৃতির জন্য দফায় দফায় চিঠি চালাচালি করলেও এখন পর্যন্ত কোনো কিনারা হয়নি। ফলে অযত্ন অবহেলায় পড়ে আছে এই গণকবরটি।
যারা শহিদ হয়েছিলেন তারা হলেন কানু মিয়া, তারু মিয়া, আজিজ মিয়া, লালু মোল্লা, মুকসুদ আলী, বদর উদ্দিন, আবুল খায়ের, ওসমান আলী, ফজু মিয়া, মুকছুদ আলী, ওয়ালী মিয়া, হাফিজ উদ্দিন ফজলু মিয়া, দৌলত মিয়া, ফিরুজ মিয়া, আব্দুল হক, আব্দুল মাজন, আলী আহম্মদ।
এই গণকবরটিতে নেই কোনো বাউন্ডারী। পুরো কবরটি আগাছা ঘিরে রয়েছে। নেই কোনো স্মৃতিস্তম্ভ। এলাকাবাসী এই গণকবরটি সুরক্ষা রাখার দাবি জানান।
মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ৫ মে। দুপুরের দিকে মুক্তিবাহিনীর খোঁজে আখাউড়ার উপজেলার উত্তর ইউনিয়নের আজমপুর ক্যাম্পের দুটি পাকিস্থানী সেনা দল পৌরশহরের নারায়নপুর গ্রামে এসে হানা দেয়। স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় মুহূর্তের মধ্যে তারা গ্রামের চারদিকই ঘিরে ফেলে। মুক্তিযোদ্ধাদের ধরতে গ্রামের ভেতর চিরুনি অভিযান চালানো হয়। কিন্তু উদ্দেশ্য সফল না হওয়ায় পাক বাহিনী আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। পরে মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মীয়-স্বজনসহ ১৮ জন বৃদ্ধ ও যুবককে ধরে জড়ো করে। এ সময় তারা অন্যান্য গ্রামের আরো ১০ জনকে এখানে ধরে নিয়ে আসে। ওই দিন বিকেলেই সবার হাত-পা বেঁধে আখাউড়া-আগরতলা সড়কের পাশে (তারাগন ব্রিজ বরাবর) সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে।
জীবন বাঁচাতে গুলিবিদ্ধ অনেকেই খালের পানিতে ঝাঁপ দেয়। মৃত্যু নিশ্চিত করতে বর্বর পাক বাহিনী পানিতেও গুলি করে এবং রাইফেলের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খঁচিয়ে তাদের হত্যা করে। পরে দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পর হাল থেকে অনেক লাশের হাড় তুলে নারায়ণপুর এলাকায় কবর দেওয়া হয়।
শহিদ মুকসুদ আলীর ছেলে পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও নারায়ণপুর এলাকার বাসিন্দা মো. মন্তাজ মিয়া বলেন, আমার বাবা, চাচা, ভাই ভাগনিসহ আত্মীয় স্বজনরা এ গণকবরে শায়িত আছেন।
তিনি বলেন, যুদ্ধের সময় ছোট ছিলাম। মায়ের সঙ্গে ভারতের ত্রিপুরায় চলে যাই। দুপুরের দিকে তিনি নিজেও যাওয়ার জন্য ঘরে তালা দিয়ে ছোট ভাইকে ডাক দিতে গেলে পাক বাহিনী এসে আব্বাকে ধরে ফেলে। পরে আমার চাচা ওসমান আলী, বড় বোনজামাই বদর উদ্দিন, ভাগ্নে মাজনসহ গ্রামের ১৮ জনকে তারা ধরে নিয়ে আসে। বিকেলে আমাদের গ্রামের পাশে তারাগণ ব্রিজের সামনে সবাইকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, স্বাধীনতার এতো বছর পেরিয়ে গেলেও শহিদ পরিবার হিসেবে আমাদের কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। গণকবরটি চিহ্নিত না করায় পবিত্রতা নষ্ট হচ্ছে। গণকবরটি সংরক্ষণ করে বেষ্টনী নির্মাণ করে দেওয়ার পাশাপাশি আমাদেরকে যেন অন্তত শহিদ পরিবারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
পৌর শহরের তারাগন এলাকার কাজী অরুন মিয়া বলেন, ৭১ সালের ৬ মে আমার মা, তিন ভাই ও পাশের বাড়ির তিনজনসহ ৭জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে হানাদার বাহিনী। এই সাত শহিদের মধ্যে আমার মা, ভাই ও পাশের বাড়ির একজনকে বাড়ি সংলগ্ন এক জায়গায় গণকবর দেওয়া হয়। বাকি দুজনকে বাড়ি সংলগ্ন স্থানে কবর দেওয়া। এটা খুবই দুঃখজনক স্বাধীনতার এতো বছর পরও গণকবরটি চিহ্নিত ও সংরক্ষণ করা হয়নি। কোনো ধরনের বেষ্টনী না থাকার কারণে গণকবরটি বেহালদশায় পড়ে আছে। দীর্ঘ বছর ধরে সংশ্লিষ্ট দফতরের কাছে দাবি জানিয়ে আসছি গণকবরটি বেষ্টনি দিয়ে সংরক্ষণ করার। কিন্তু আজো তা করা হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আকবর হোসেন বলেন, এ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অনেক অসংখ্য নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করে মাটিচাপা দেওয়া আছে। স্বাধীন হওয়ার এতো বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত তাদের গণকবরে নামফলক বা স্মৃতিচিহ্ন করা হয়নি। এটা খুবই দুঃখজনক।
আখাউড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার সৈয়দ জামশেদ শাহ বলেন, পাকবাহিনীর নৃশংসতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে বাঙালিদের ধরে এনে হত্যা করে যেখানে সেখানে লাশ ফেলে রাখতো। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অনেক গণ কবর অযত্নে অবহেলায় পড়ে আছে। এরমধ্যে তারাগণ ব্রিজের কাছে নারায়নপুর গ্রামের ১৮ জন ও অজ্ঞাতনামা আরো ১০ জনকে এখানে এনে পাক সেনারা নির্মমভাবে হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখতে এসব গণকবর সংরক্ষণ ও নামফলক নির্মাণের দাবি জানান।