নাটোরের মাটিতে মরুভূমির ‘লাল সোনা’ চাষ!
একসময় ধারণা করা হতো বেদানা কেবলই মরু অঞ্চল বা পাহাড়ি রুক্ষ মাটির ফল। বাংলাদেশের মাটিতে এর বাণিজ্যিক চাষ প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করতেন অনেকে। কিন্তু সেই চেনা ধারণা বদলে গেছে। নাটোরের উর্বর মাটিতে এখন সগৌরবে ফলছে ধু ধু মরুভূমির মিষ্টি ও রসালো ফল বেদানা। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলে থাকা টকটকে লাল আর হালকা গোলাপী রঙের এই ফলগুলো নাটোরে কৃষির এক নতুন ও সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক দুয়ার খুলে দিয়েছে।
এই অভাবনীয় সাফল্যের রূপকার নাটোর সদর উপজেলার পার খোলাবাড়িয়া গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা প্রকৌশলী ইমরান হাসান। তাঁর হাত ধরেই নাটোরের মাটিতে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে বিদেশী ফল বেদানার সফল চাষ শুরু হয়েছে।
শখ থেকে বাণিজ্যিক বিপ্লব
.png)
শুরুটা হয়েছিল মাত্র চার বছর আগে। নিছক শখের বশে নিজের ছাদবাগানে ২৬ টা চারা দিয়ে চাষ শুরু করেন। সেখানে ভালো সাড়া পেয়ে ইমরান হাসান সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক চিন্তা থেকে দেড় বিঘা জমিতে বিদেশি জাতের বেদানার চারা রোপণ করেন। বর্তমানে তার বাগানে রয়েছে প্রায় ৪২টি ভিন্ন জাতের বেদানার গাছ।
কঠোর পরিশ্রম, সঠিক পরিচর্যা আর নাটোরের অনুকূল আবহাওয়া—এই তিনে মিলে মাত্র এক বছরের ব্যবধানেই গাছগুলোতে এসেছে আশাতীত ফলন। গাছে গাছে এখন ঝুলছে লাল টুকটুকে বেদানা।
উদ্যোক্তা ইমরান হাসান জানান, আম বা অন্য চিরাচরিত ফলের চেয়ে বেদানার বাজারমূল্য এবং চাহিদা দুটোই বারোমাস চড়া থাকে। ফলে অল্প পুঁজিতে এটি অত্যন্ত লাভজনক একটি আবাদ।
ইঞ্জিনিয়ার ইমরান হাসান (উদ্যোক্তা) আরও জানান,‘আমি প্রথমে শখ করেই ছাদবাগানে শুরু করেছিলাম। কিন্তু যখন দেখলাম আমাদের মাটিতেও এই ফল ভালো হচ্ছে, তখন বাণিজ্যিক রূপ দিই। আম বা অন্যান্য ফলের চেয়ে বেদানার বারো মাসের চাহিদাই আলাদা। সঠিক পরিচর্যা করলে অল্প পুঁজিতেই এর থেকে বড় অংকের লাভ করা সম্ভব।’
দূর-দূরান্তের দর্শনার্থী ও স্থানীয় চাষিদের আগ্রহ
মরুভূমির ফল নাটোরে ফলছে এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে অনেক মানুষ আসছেন ইমরান হাসানের এই দৃষ্টিনন্দন বাগান দেখতে। অনেকেই অনুপ্রাণিত হচ্ছেন এই ফল চাষে। বাগান পরিদর্শনে আসা দর্শনার্থী ও স্থানীয় চাষীরা নিজেদের পতিত জমিতে, বাড়ির আঙিনায় কিংবা ছাদবাগানে বেদানা চাষের জন্য পরামর্শ নিচ্ছেন এবং চারা সংগ্রহ করছেন।
স্থানীয় চাষিদের মতে, সহজ চাষপদ্ধতি এবং অধিক লাভজনক হওয়ায় প্রথাগত ফসলের বাইরে এসে বেদানা চাষে তাদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।
সদর উপজেলা কৃষি অফিসার নীলিমা জাহান, নাটোরে বেদানা চাষ নিয়ে দিলেন ইতিবাচক বার্তা।
নাটোরের মাটি বৈচিত্র্যময় ফল চাষের জন্য বরাবরই উর্বর ও বিখ্যাত। কৃষি বিভাগ ইমরান হাসানের এই উদ্যোগকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছে তিনি। সঠিক পদ্ধতিতে এই চাষাবাদ ছড়িয়ে দিতে পারলে তা স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনবে বলে মনে করেন তারা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন,‘নাটোরের মাটি যেকোনো বৈচিত্র্যময় ফল চাষের জন্য ভীষণ উর্বর। ইমরান হাসান যে উদ্যোগ নিয়েছেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়। সঠিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মেনে যদি এই বেদানার চাষাবাদ সাধারণ চাষীদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে এটি জেলার অর্থনীতিতে এক বিরাট ভূমিকা রাখবে।’
নাটোরের নতুন ব্র্যান্ডিংয়ের প্রত্যাশা
একসময় নাটোর কাঁচাগোল্লার জন্য বিখ্যাত থাকলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ড্রাগন, আঙুর কিংবা কমলার মতো বিদেশি ফলের সফল চাষে জেলাটি সারা দেশে নজর কেড়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, তরুণ উদ্যোক্তাদের হাত ধরে নাটোরের কৃষি অর্থনীতিতে যুক্ত হওয়া এই নতুন ফল ‘বেদানা’ আগামীতে দেশের বুক জুড়ে নাটোরের ব্র্যান্ডিংকে আরও সমৃদ্ধ ও অনন্য করে তুলবে। ওলট-পালট করে দেবে বিদেশি ফল আমদানির চেনা সমীকরণকে।