ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

ঝালকাঠি পৌরসভার উন্নয়ন প্রকল্পের নামে লুটপাট

ঝালকাঠি প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৩:২৭, ২৬ জুলাই ২০২৬
ঝালকাঠি পৌরসভার উন্নয়ন প্রকল্পের নামে লুটপাট
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ঝালকাঠি পৌরসভার উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অভূতপূর্ব লুটপাট হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে দায়সারা কার্যক্রম পরিচালনায় নাগরিক ক্ষোভ দানা বাঁধছে| যে কোনো সময় ফুঁসে উঠতে পারে নাগরিক সমাজ। অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংগঠিত হচ্ছে। 

খাল খনন, অবকাঠামো উন্নয়ন, ঝালকাঠি চত্ত্বর, নতুন গোরস্থান নির্মাণনতুন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, সড়ক সংস্কার ও পুনঃনির্মাণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা ও ফুটপাথ নির্মাণে ৬কোটি ১৫লাখ টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেন। কাজের সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের কাছে নির্দিষ্ট পরিমাণ পার্সেন্টিজ না দিলে কার্যাদেশ না দেওয়ার অভিযোগ ঠিকাদারদের। 

প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং মানবিক দান-অনুদান সহায়তা বাবদ কয়েক লাখ টাকা দানের নামে সিংহভাগ আত্মসাত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।সচেতন মহল যাতে প্রতিটি প্রকল্পের কোনোটাতে কি পরিমাণ বরাদ্দ, তা জানতে না পারে এজন্য নামফলক বা ভিত্তি ফলকে বরাদ্দ উল্লেখ করা হয়নি। 

Advertisement

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৩জুলাই পর্যন্ত পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উপপরিচালক-স্থানীয় সরকার ও সার্বিক) মো. কাওছার হোসেন।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর সারাদেশের ন্যায় ঝালকাঠি পৌরসভার মেয়রকে অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেয় সরকার। প্রশাসক পদে আসীন হন ঝালকাঠির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (স্থানীয় সরকার ও সার্বিক) মো. কাওছার হোসেন। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে এককোটি ৩৩ লাখ টাকা বরাদ্দে পৌর এলাকার ৭টি খাল খননের টেন্ডার দিয়ে ২৮ আগস্ট কাজ উদ্বোধন করেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক ফারাহ গুল নিঝুম। ৬টি খালের খনন কাজ শুরু করে মাঝ পথে থেমে যায় প্রকল্পটি| একটি খাল খনন কাজ শুরুই করতে পারেনি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। এ নিয়ে পৌর কর্তৃপক্ষ এবং একে অপরকে দোষারোপ করছে।

৬টি খালে এলোমেলো খনন করে ফেলে রাখায় বর্তমান বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। ময়লা আবর্জনায় খালগুলো নর্দমায় পরিণত হয়ে মশা প্রজনন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এককোটি ৩৩ লাখ টাকা বরাদ্দে অর্ধেক পরিমাণ কাজ না হলেও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আজমিরী বিল্ডার্সকে ৭০লাখ টাকার বিল পরিশোধ করে পৌর কর্তৃপক্ষ।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাস্তা কার্পেটিং এবং সিসি ঢালাইসহ মোট ৩.৬কিলোমিটার রাস্তার সংস্কার, ৮৫০ মিটার ড্রেন নির্মাণ, ৫০০মিটার ফুটপাত নির্মাণ এবং ১১টি অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে বরাদ্দ করা হয়েছে তিন কোটি ২৬ লাখ ঠাকা| যার কাজের বিল হিসেবে এরইমধ্যে দুই কোটি পাঁচ লাখ টাকা পরিশোধও করা হয়েছে।

এছাড়াও পৌরসভার জরুরি মেরামত বাবদ এডিবি প্রকল্পের এককোটি ৩৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ২০ নলাখ টাকা বরাদ্দে ৮৭৫মিটার পিচঢালাই রাস্তা কার্পেটিং বরাদ্দ দেয় পৌর প্রশাসক মো. কাওছার হোসেন।

নিম্ন মানের সামগ্রী দিয়ে নামেমাত্র দায়সারা কাজ করিয়ে অভূতপূর্ব লুটপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ পৌরবাসিন্দাদের। এসব কাজের বড় বড় প্রকল্প দেওয়া হয়েছে জেলার বাইরে প্রশাসকের ঘনিষ্ঠজনকে|

মনির হোসেন বলেন, পৌর এলাকার মধ্যে খাল খননের নামে খালগুলোকে নষ্ট করে রেখেছে| সেখানে এখন মশার প্রজনন কেন্দ্র ˆতরী হয়েছে| যার জন্য ঝালকাঠিতে ডেঙ্গু রোগীর দিন দিন বেড়েই চলছে| অপরদিকে পৌরসভার রাজস্ব থেকে লাখ লাখ টাকা খাল খননের নামে দুর্নীতি হয়েছে।

কলেজ রোডের বাসিন্দা হুমায়ুন কবীর বাদল বলেন, শহরের ফায়ার সার্ভিস মোড় থেকে কলেজ মোড় পর্যন্ত রাস্তা কার্পেটিং কাজ শেষ হতে না হতেই আস্তর উঠে যাচ্ছে। পৌরসভায় অনেক কাজ করিয়েছি বলে পুরোটাই নিজের নাম প্রকাশের কর্মযজ্ঞ হয়েছে। সেই সঙ্গে জনগণের টাকায় উন্নয়নের লুটপাট করা হয়েছে এবং জনভোগান্তি আরো বেড়েছে।

ঝালকাঠি জেলা স্বর্ণ ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ হাওলাদার বলেন, অকথ্য ভাষায় কিছু বলতে চাই কিন্তু পারি না। শহরের ৩ নম্বর কৃষ্ণকাঠি ওয়ার্ডে কবিরাজ বাড়ি রোডে ড্রেনের প্রয়োজন কিন্তু তা না করে বিলাসিতার পাহাড় গড়েছে পৌরসভা।

জেলা ছাত্রদলের যুগ্মআহ্বায়ক মুবিনুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, ক্রিম মলমের পার্টির হাতে কিছু কিছু বাপ দাদার তাল্লুক পেয়েছিল। কাওছার সাহেবের আমলে তার ঘনিষ্ঠজন এবং পৌরসভার কিছু আত্মীয় ছিল কাজ ভাগিয়ে নিতে এক টাকার কাজও সিন্ডিকেটের বাইরে যায়নি|

আমিনুল ইসলাম সুমন বলেন, কাওছার সাহেব যেখানে খাওন আছে সেই কাজটুকু করেছেন। কয়েকবছর আগে যেই রাস্তার সংস্কার দুই লাখ ৮০ হাজার টাকায় করা হয়েছিল সেই রাস্তা করেছে ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে। যদি নাম ফলক বা ভিত্তি ফলক দেয় তাহলে তো থলের কালো বিড়াল বের হয়ে যাবে।

মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, জেলা সুজন সম্পাদক ও  টিআইবির সনাক সদস্য ইসমাঈল মুসাফির বলেন, খাল খননে বরাদ্দ হওয়া ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকার কাজ শেষ না করেই ৭০ লাখ টাকার চলমান বিল উত্তোলন মানে হলো অর্ধেকেরও বেশি টাকা তুলে নেয়া হয়েছে। এটি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারই জবাব দেওয়া উচিৎ এটি কীভাবে সম্ভব হলো। আর পৌরসভার অবকাঠামো উন্নয়নের নামফলকে বা পাশে বড় সাইনবোর্ডে অর্থ বরাদ্দের কথা উল্লেখ করতে অন্তত নীতিগতভাবে হলেও পৌরসভা বাধ্য। এছাড়া পৌরসভার রাস্তা মেরামতে অনিয়মের বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট। এই সব কটি বিষয়ে সুজনের পক্ষ থেকে আমরা পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাইবো এবং একইসঙ্গে টিআইবির সনাক সভায় বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে নিয়মতান্ত্রিক পদক্ষেপ নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

ঝালকাঠি পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী টি. এম রেজাউল হক রিজভী বলেন, খাল খননের পরিমাণ হয়েছে ৫৩%। তাই তাদের কাজের চলমান বিল দেওয়া হয়েছে। রাস্তার কার্পেটিং নির্মাণের পরে উঠে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আজমিরী বিল্ডার্সকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। প্রক্রিয়া অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। অন্যান্য কাজের গুনগত মান রক্ষায় আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। যদি কোনো ত্রুটি থাকে তাহলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে অবশ্যই কফিয়ত দিতে হবে।

ঝালকাঠির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সাবির্ক) ও সাবেক পৌর প্রশাসক মো. কাওছার হোসেনের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি।

ঝালকাঠি পৌরসভার উন্নয়নমূলক কাজের ভিত্তিফলক/নামফলকে কোনো বরাদ্দের পরিমাণ উল্লেখ নেই।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: ঝালকাঠি
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!