ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]
নদীতে বসতভিটা বিলীনের শঙ্কা 

সঞ্চয়ের টাকায় জমি কিনে বিপাকে জেলে পরিবার 

তরিকুল ইসলাম, পিরোজপুর
প্রকাশিত: ১১:৫২, ৩ আগস্ট ২০২৬
সঞ্চয়ের টাকায় জমি কিনে বিপাকে জেলে পরিবার 
নদীতে বসতভিটা বিলীনের শঙ্কায় জেলে পরিবার। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ  

পিরোজপুরের জিয়ানগরে বসতভিটায় রাতের আঁধারে দোকানঘর স্থাপনের অভিযোগ উঠেছে প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি- তাদের কেনা জমিতে ২১ বছর ধরে বসবাস করে আসছিলেন। কিন্তু জমিটি সম্প্রতি দুই প্রতিবেশী দাবি করলে একাধিকবার মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও তা না মেনে উল্টো দিচ্ছেন জীবননাশের হুমকিও। এমনটাই অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। 

পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার বালিপাড়া ইউনিয়নের পশ্চিম বালিপাড়া গ্রামের ৫৫ বছর বয়সী হিরন বেগম জানান, তার স্বামী আশ্রাফ আলী সরদার (৬২) পেশায় একজন জেলে। তিনি পাশের চন্ডিপুর গ্রামের নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দা। তাদের বসতভিটা নদীভাঙনে বিলীনের পথে। নদীভাঙনে পুরোপুরি বিলীনের ভয়ে পরিবারের সঞ্চয় করা টাকা দিয়ে ২০০৫ সালসহ বিভিন্ন সময়ে বাবার বাড়ির পাশে ২৯ শতাংশের একটি জমি কিনেন হিরন বেগমের পরিবার। এই জেলের দম্পতির দুটি ছেলে ও চারটি মেয়ে সন্তান রয়েছে। 

সম্প্রতি বেশকিছুদিন ধরে পশ্চিম বালিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সিদ্দিক বয়াতী (৬০) ও মোতালেব শেখ (৫৮) তাদের ক্রয় করা জমি দাবি করেন। এছাড়া ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের নামে আদালতে সম্প্রতি দুটি মামলাও করেন অভিযুক্তরা। এ নিয়ে দুপক্ষের বিরোধ সৃষ্টি হলে ভুক্তভোগী পরিবারের করা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরির প্রেক্ষিতে পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা একাধিকবার মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও তা মানেননি অভিযুক্ত সিদ্দিক বয়াতী ও মোতালেব শেখ। পরে গত ২৮ জুলাই রাতে সিদ্দিক ও মোতালেবসহ ১০ থেকে ১৫ জন মিলে জমিতে থাকা বেড়া ভেঙে পুরোনো একটি দোকানঘর এনে ওই জমিতে স্থাপন করার অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। এ সময় ভুক্তভোগীরা টের পেয়ে বাধা দিলে তাদের দেশীয় অস্ত্র দিয়ে ধাওয়া করেন অভিযুক্তরা এমনটাই অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। 

Advertisement

ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, অবৈধভাবে তাদের জমি দখলের চেষ্টা করছেন অভিযুক্তরা। প্রশাসনের কাছে সুঠু বিচার দাবি করছেন তারা। অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্তরা জানান, তাদের নামে মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানো হচ্ছে। এগুলো তারা নিজেরাই করে অভিযুক্তদের ওপরে দায় চাপিয়ে দিচ্ছে। 

ভুক্তভোগী হিরন বেগম বলেন, ‘নদীতে ঘরবাড়ি সব ভাইঙ্গা যাইতেছে। মুই ৬-৭ ডা মাইয়া পোলা লোইয়া থাহি মেলা কষ্টে। মেলা কষ্ট কইরা কিছু টাহা জোমাইয়া এই জাগাডু কিন্না কোন রহমের এক‌খান ঘর বানাইয়া থাহা শুরু হরছিলাম কিন্তু ম্যালা বছর পর এহন মোগো বাঁধা দেয়, মোরা কিছু কোইলে মোগো মারতে আয়। আম্মেগো কাছে বিচার দিলাম, মোরে এট্টু থাহার জায়গা কইরা দেন।’ 

ভুক্তভোগীর ভাই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হারুন অর রশিদ মীর বলেন, ‘আমার এই অসহায় বোনের জন্য এই জমিটা কিনে দিয়েছি আজ প্রায় ২১-২২ বছর। নদীর পারে এদের ঘর ছিল সেখানে জমিজমা নদীতে ভেঙে গেছে। এখানে ছিল ডোবা ও খাল, এগুলো বালি দিয়ে ভরাট করে দিয়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ করে কাটা তারের বেড়া দিয়েছি। এই বেড়াগুলো সিদ্দিক বয়াতী ও মোতালেব শেখসহ বেশকিছু লোক মিলে ভেঙে নিয়ে যায় এবং অন্য জায়গার একটি দোকানঘর এনে এখানে স্থাপন করে। আমাদের দলিলসহ সব কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও, মিথ্যা মামলাসহ জমি দখলের চেষ্টা করছে, আমরা এর বিচার চাই।’

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হাই জমাদ্দার বলেন, ‘এখানে এই জেলে পরিবারের লোকজন বেড়া দিয়েছি সেগুলো ভেঙে নিয়ে গেছে এবং রাতে একটি ভাঙা পুরোনো দোকানঘর এই জমিতে এনে রেখে দিয়েছে। আমরা থানায় জানিয়েছি, প্রশাসনকে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানাচ্ছি।’ 

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত সিদ্দিক বয়াতী ও মোতালেব শেখ বলেন, ‘আমরা বেড়া ভাঙ্গিনি, মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে কিন্তু আমরা জমি পাবো এজন্য এখানে দোকান এনে রাখছি।’ 

স্থানীয় ইউপি সদস্য রিয়াজুল ইসলাম বয়াতী বলেন, ‘আমার জানা মতে একই অংশীদার থেকে দুই-তিন পক্ষ জমি কিনেছে বিভিন্ন সময়ে। সিদ্দিক বয়াতীও এখান থেকে জমি দাবি করতেছে। এজন্য সে এক রাতের মধ্যে এই জমিতে একটি দোকান এনে রেখেছে। এটা অনিয়ম হয়েছে, এই জমিটি হিরন বেগমের। তবে এটা সমাধান হওয়া উচিত।’ 

বালিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বাবুল বলেন, ঘটনাটি শুনেছি। ইতোমধ্যে স্থানীয় ইউপি সদস্যকে জানানো হয়েছে। দুই পক্ষকে ইউনিয়ন পরিষদে ডেকে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করবো। 

ইন্দুরকানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহব্বত খান বলেন, জমিজমা বিরোধ নিয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

এদিকে, দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ের অর্থ দিয়ে কেনা বসতভিটার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বিরোধের দ্রুত ও নিরপেক্ষ সমাধানে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!