নদীবেষ্টিত জেলা পিরোজপুর। জেলার বুক চিরে বয়ে গেছে কচা, বলেশ্বর, কালিগঙ্গা, সন্ধ্যাসহ অসংখ্য নদ-নদী। এসব নদ-নদী ও খাল-বিলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে সমৃদ্ধ মৎস্য সম্পদ। এক সময় জেলার বিভিন্ন নদী ও জলাশয়ে সারা বছরই পাওয়া যেত নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ। এসব মাছ স্থানীয় মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি হাজারো জেলে ও মৎস্যজীবী পরিবারের জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস। বর্ষা মৌসুমে বাজারে দেশীয় কৈ মাছ, শিং মাছ, মাগুর দেখা মিলছে না। চাষের মাসি এখন সাধারণ মানুষের একমাত্র ভরসা।
একসময় জেলায় ৫০-৬০ প্রজাতির দেশিয় মাছ পাওয়া যেত। এখন তা নেমেছে হাতে গোনা কয়েকটিতে। জেলার নদী-খাল আর জলাশয় জুড়ে এখন যেন চায়না দুয়ারীর ফাঁদ। অতি সূক্ষ্ম ফাঁসের এই জালে আটকা পড়ছে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ। রেহাই পাচ্ছে না মাছের পোনাও।
.png)
এতে মাছের প্রজনন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কমে যাচ্ছে দেশীয় মাছের উৎপাদন। কম পরিশ্রমে বেশি মাছ পাওয়ায় অনেক জেলে ঝুঁকছেন এ জাল ব্যবহারের দিকে। ফলে ধীরে ধীরে হুমকির মুখে পড়ছে পিরোজপুরের এই সমৃদ্ধ মৎস্য সম্পদ ও জলজ জীববৈচিত্র্য।
শুক্রবার পৌর শহরের মাছ বাজার ঘুরে দেখা যায়, বর্ষার মৌসুমেও যেসব দেশীয় মাছ থাকার কথা সেগুলো খুব বেশি একটা দেখা যাচ্ছে না। সাধারণ মানুষের একমাত্র ভরসা চাষের মাছ। বিগত বছরগুলোতে এই বর্ষার মৌসুমে শিং মাছ, কই মাছ, মাগুর মাছ সহ দেশীয় মাছের উপস্থিতি দেখা যেত কিন্তু বর্তমানে নেই বললেই চলে। চাষের মাছের পাশাপাশি সামুদ্রিক মাছও সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গিয়েছে। বিভিন্ন মাছের দরদাম করে দেখা যায়, পাঙ্গাস মাছ ২২০ থেকে ২৮০ টাকা, চাষের শিং মাছ ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, বিভিন্ন রকমের সামুদ্রিক মাছ ৩০০ থেকে ১১০০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়াও ভরা মৌসুমী মিলছে না কাঙ্খিত ইলিশ। ফলে দু একটা যাও পাওয়া যায় তারও দাম আকাশ ছোঁয়া। প্রতি কেজি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৩০০০ থেকে ৩২০০ টাকায়।
স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ীরা জানান, বর্ষার মৌসুমে অনেক দেশীয় মাছ পাওয়া যেত কিন্তু বর্তমানে বাজারে তার দেখা মিলছে না। বিভিন্ন জায়গায় চায়না দুয়ারি জাল, চায়না কই জাল সহ বিভিন্ন অবৈধ জাল দিয়ে মাছ ধরার কারণে মাছের উৎপাদন কমে গিয়েছে। দ্রুত এর বিরুদ্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ না নিলে দেশীয় মাছ উৎপাদন ধ্বংস হয়ে যাবে।
পিরোজপুর পৌর বাজারের মাছ ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, বর্তমানে দেশি মাছ না পাওয়ার কারণ হচ্ছে চায়না জাল। এই চায়না জালের কারণে ছোট মাছগুলো মরে যাইতেছে। এ কারণেই মাছ পাওয়া যাইতেছে না। আগে ভরা মৌসুমে দেশীয় মাছে বাজার ভরপুর থাকতো কিন্তু এখন আগের মতন মাছ পাওয়া যায় না। আমরা প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই এ ধরনের অবৈধ জাল দিয়ে কেউ যেন মাছ ধরতে না পারে।
অন্য আরেক ব্যবসায়ী শরিফুজ্জামান বলেন, দেশি মাছ না পাওয়ার অনেকগুলো কারণ আছে। চায়না জাল তা তো আছেই, অনেকে খালে বিষাক্ত ওষুধ দিয়ে মাছ ধরে। যার কারণে মাছের ছোট ছোট বাচ্চা মারা যায়, এই কারণেই মাছ কমে গেছে। এ ধরনের মানুষ দেশের শত্রু, জাতির শত্রু। তারা চায় না এই মাছগুলো বেঁচে থাক। এদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
জিয়ানগর উপজেলার বালিপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল জব্বার তিনি বলেন, আগের মতো মাছ পোনা পাইনা। কি আর করমু! আগের মতন পরিশ্রম করতে পারি না, এই কারণে একটা জাল কিনছি এটা দিয়ে একটু মাছ ধরে কোন মতে খাই।
পিরোজপুর পৌর বাজারে মাছ কিনতে এসেছেন তানজিম শেখ তিনি বলেন, এই বৃষ্টির সিজনে বাজারে দেশীয় মাছ পাওয়ার কথা কিন্তু আমরা দেশীয় মাছ দেখতে পাইতেছি না। চায়না যে জালগুলো আছে, এই জালগুলো দিয়ে খালে বিলে মাছ ধরে। এই জালের কারণে ছোট বড় সব মাছ মারা যায়। বাজারে এখন চাষের মাছ ছাড়া কোন মাছ নেই। আগে আমরা এই সিজনে শিং মাছ, কৈ মাছ, মাগুর মাছ সহ অনেক দেশীয় মাছ দেখতাম কিন্তু সেগুলো এখন আর পাওয়া যায় না।
পিরোজপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সঞ্জীব সন্নামত বলেন, চায়না দুয়ারী জেলার কারণে দেশীয় মাছের উৎপাদন কমে গিয়েছে। জেলা ও উপজেলা মৎস্য অফিসগুলো নিয়মিত অভিযানের মাধ্যমে নিষিদ্ধ জাল জব্দ করে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এরপরেও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়েই চলে নির্বিচারে পোনা নিধন। নিষিদ্ধ এই জালের ব্যবহার বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার করা হচ্ছে। দেশীয় মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে অবৈধ জলের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে।
পিরোজপুরের নদী-খাল ও জলাশয়কে ঘিরে জীবিকা চলে হাজারো মানুষের। তাই মৎস্য সম্পদ রক্ষায় চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধের দাবি সংশ্লিষ্টদের।