শনিবার (২৯ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টায় রংপুর জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফতাব উদ্দিন।
সংবাদ সম্মেলনে অ্যাডভোকেট আফতাব উদ্দিন বলেন, আইনজীবী সমিতির সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করেই একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার আসামিদের পক্ষে আইনি লড়াই না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে থেকে তাদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনি সহায়তা দেওয়া হবে।
.png)
তিনি বলেন, গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের চার সদস্যের হত্যাকাণ্ড একটি নৃশংস ও নিকৃষ্টতম ঘটনা। রংপুর জেলা আইনজীবী সমিতি এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে। কয়েকজন সরকারি আইনজীবী রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের সঙ্গে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন বলেও জানান তিনি।
পুলিশের তদন্ত নিয়ে আইনজীবী সমিতির বক্তব্য
আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জানান, এ ঘটনায় পুলিশ ইতোমধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের সময় লুণ্ঠিত কিছু গহনা উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার দুজন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
পুলিশের তদন্ত প্রসঙ্গে আফতাব উদ্দিন বলেন, পুলিশের তৎপরতা এবং সাংবাদিকদের সহযোগিতায় এখন পর্যন্ত তদন্ত ও আইনগত কার্যক্রম সঠিক পথেই এগোচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।
তবে হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও নানা ধরনের বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। কেউ কেউ ঘটনাটিকে রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে রাজনীতি করা উচিত নয়। একই সঙ্গে যাচাই ছাড়া কোনো ধরনের গুজব ছড়ানো থেকেও সবাইকে বিরত থাকতে হবে।’
সঠিক তথ্য তুলে ধরতে সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট মাহফুজ উন নবী ডন, অ্যাডভোকেট সাহেদ কামাল ইবনে খতিব, অ্যাডভোকেট কাওছার আলীসহ আইনজীবী সমিতির নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
১৯ অসংগতির অভিযোগ নাগরিক কমিটির
এদিকে একই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটি।
শনিবার দুপুরে নগরীর একটি কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত পৃথক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সদস্যসচিব পলাশ কান্তি নাগ লিখিত বক্তব্যে এ দাবি জানান।
তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডটি ঠান্ডা মাথায় অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও সংঘবদ্ধভাবে সংঘটিত হয়েছে বলে তারা মনে করছেন। তদন্ত ও প্রশাসনের বক্তব্যের মধ্যে বেশ কিছু যৌক্তিক অসংগতি রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ইয়াবা সেবনের পর হিতাহিতজ্ঞানশূন্য অবস্থায় দুই তরুণের পক্ষে এতটা নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করা কতটা সম্ভব এ নিয়ে তাদের প্রশ্ন রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ড ও তদন্তের বিষয়ে মোট ১৯টি অসংগতি চিহ্নিত করে সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরা হয়।
নাগরিক কমিটির দাবি, এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য উত্তর খুঁজে বের করতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রয়োজন। প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন, হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রকৃত ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং নিরপরাধ কাউকে হয়রানি থেকে রক্ষা করতে তদন্তের প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হওয়া জরুরি।
এ ঘটনায় রংপুরের নবাগত পুলিশ কমিশনার এবং রংপুর জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার কথাও জানিয়েছে সংগঠনটি।
যে রাতে শেষ হয়ে যায় একটি পরিবার
রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যান। একসময় তিনি নগরীর বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। পরে নগরীর মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকায় জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন।
জানা গেছে, ২০১০ সালে জমিটি কেনা হলেও দীর্ঘ সময় পর সেখানে বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু হয়। প্রায় তিন বছর ধরে ওই বাড়ির দোতলায় স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বসবাস করছিলেন গণপতি চক্রবর্তী। বাড়িটির নিচতলার নির্মাণকাজ তখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
অবসরের পর তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবেও রোগী দেখতেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
গত ২২ আগস্ট রাতে ওই বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬০), তার স্ত্রী প্রীতিলতা (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
একই পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া।
ঘটনার পরদিন নিহত গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে রংপুর কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
গ্রেপ্তার দুই তরুণ, স্বীকারোক্তির দাবি পুলিশের
মামলার তদন্তের একপর্যায়ে ওই এলাকার একটি স্থান থেকে মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তারের পর ওই দুই তরুণ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে লুণ্ঠিত কিছু গহনা উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
তবে মামলার তদন্তাধীন বিষয়ে আদালতে দেওয়া জবানবন্দির পূর্ণাঙ্গ বিষয়বস্তু এবং হত্যাকাণ্ডে অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
দুই ধরনের বক্তব্যে বাড়ছে প্রশ্ন
গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের চার সদস্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বর্তমানে দুটি ভিন্ন ধরনের বক্তব্য সামনে এসেছে। একদিকে পুলিশ দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করে তাদের ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির কথা জানিয়েছে এবং তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গহনা উদ্ধারের দাবি করেছে।
অন্যদিকে রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটি তদন্ত নিয়ে ১৯টি অসংগতির অভিযোগ তুলে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
ফলে চার সদস্যের একটি পরিবারের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য কী, হত্যাকাণ্ডে কতজন জড়িত এবং ঘটনার পেছনে আসল কারণ কী এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের ওপরই নির্ভর করছে।
নিহত পরিবারের স্বজন ও স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, তদন্তে সব দিক খতিয়ে দেখে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা হবে এবং নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা হবে।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা পক্ষকে চূড়ান্তভাবে দায়ী না করে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।