হাওর ও জলাভূমি অধ্যুষিত নবীনগর উপজেলায় প্রায় ৮ হাজার ৫০০ হেক্টর কৃষিজমি বর্ষা মৌসুমে দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধ থাকে। বছরের অন্যান্য সময়ে এসব জমিতে বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন হলেও বর্ষাকালে পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অধিকাংশ জমি অনাবাদি পড়ে থাকে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এটি কৃষকদের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ ছিল। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জলাবদ্ধ জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনতে ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নবীনগর উপজেলার ইব্রাহিমপুর, নাটঘর, রছুল্লাবাদ, বড়িকান্দি, সলিমগঞ্জ, নবীনগর পূর্ব ও সাতমোড়া এলাকায় গত দুই বছর ধরে কৃষি বিভাগের পরামর্শে ভাসমান ডালি পদ্ধতিতে সবজি আবাদ হচ্ছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ২০ বিঘা জমিতে এ পদ্ধতিতে সবজি চাষ করা হয়েছে।
.png)
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চলমান ফ্রিপ এবং কুমিল্লা অঞ্চলে টেকসই কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুই শতাধিক কৃষককে ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
ভাসমান ডালি পদ্ধতিতে বাঁশের তৈরি কাঠামোর ওপর মাচা নির্মাণ করে সেখানে লতাজাতীয় বিভিন্ন সবজি চাষ করা হয়। লাউ, চালকুমড়া, শসা ও করলাসহ বিভিন্ন সবজি এ পদ্ধতিতে ভালো ফলন দেয়। বর্ষাকালে স্বাভাবিকভাবে যখন বাজারে সবজির সরবরাহ কমে যায়, তখন ভাসমান পদ্ধতিতে উৎপাদিত সবজি বাজারজাত করে কৃষকেরা বাড়তি আয় করতে পারেন।
বর্ষা শেষ হলে একই কাঠামো ব্যবহার করে পুনরায় জমিতে সবজি আবাদ করা যায়। এতে পরবর্তী সময়ে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় অনেক কমে যায়। এ পদ্ধতিতে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম। একই সঙ্গে আলাদা করে সেচের প্রয়োজন হয় না। ফলে জলাবদ্ধ ও পতিত জমিকে কাজে লাগিয়ে তুলনামূলক কম খরচে নিরাপদ সবজি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভাসমান ডালি পদ্ধতিতে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশকের ব্যবহার কম হওয়ায় উৎপাদিত সবজির স্বাদও ভালো বলে জানান কৃষকেরা।
ইব্রাহিমপুর ইউনিয়নের মধ্যপাড়া গ্রামের কৃষক ইসমাইল মিয়া বলেন, ‘কৃষি বিভাগের পরামর্শে দুই বছর ধরে ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষ করছি। আগে বছরে দুই-তিন মাস সবজি আবাদ করার সুযোগ ছিল না। আমাকে দেখে এলাকার আরও অনেক কৃষক এ পদ্ধতিতে চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।’
ইব্রাহিম দক্ষিণপাড়া গ্রামের প্রবাসফেরত সুজন বলেন, ‘এ বছর কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রথমবারের মতো ২৫ শতাংশ জমিতে ভাসমান ডালি পদ্ধতিতে লাউ চাষ করেছি। প্রথমে ইউটিউবে এ ধরনের আবাদ দেখে আগ্রহী হই। পরে উপজেলা কৃষি অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করি। কৃষি অফিসের সহযোগিতায় চাষ শুরু করে ইতোমধ্যে কলমিশাক, শসা ও লাউ উৎপাদন করেছি। এখন পর্যন্ত এসব সবজি বিক্রি করে প্রায় ৩০ হাজার টাকা আয় করেছি।’
তিনি আরও বলেন, উৎপাদন ভালো হওয়া এবং রোগবালাই কম থাকায় এ পদ্ধতির প্রতি কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।
রছুল্লাবাদ ইউনিয়নের কৃষক এমরান বলেন, ‘২০ শতক জমিতে লাউ ও চালকুমড়া চাষ করেছি। বর্ষাকালে পানিতে ডুবে থাকা জমিতে সবজি উৎপাদন একসময় স্বপ্নের মতো মনে হতো। কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় সেটি এখন বাস্তবে পরিণত হয়েছে। ভাসমান ডালি পদ্ধতিতে ১৫ শতাংশ জমিতে লাউ চাষ করেছি। ইতোমধ্যে প্রায় ১৫ হাজার টাকার লাউ বিক্রি করেছি। আরও দুই মাস লাউ সংগ্রহ করতে পারব।’
নবীনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. জাহাঙ্গীর আলম লিটন বলেন, ‘নবীনগরে প্রথমবারের মতো ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষ শুরু করা হয়েছে। কৃষকদের হাতে-কলমে প্রযুক্তিটি শেখাতে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রদর্শনী স্থাপন, ভাসমান কাঠামো তৈরি, বীজ ও সার দিয়ে সহযোগিতা করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ভাসমান পদ্ধতিতে চাষ নিরাপদ কৃষি উৎপাদনের একটি সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি। জলাবদ্ধ ও পরিত্যক্ত জমি ব্যবহার করে কম খরচে সবজি উৎপাদন করা সম্ভব। বিশেষ করে লতাজাতীয় সবজির ফলনও এ পদ্ধতিতে ভালো হয়। ভবিষ্যতে নবীনগরের জলাবদ্ধ এলাকাগুলোতে এ প্রযুক্তির ব্যাপক সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।’
নবীনগরের জলাবদ্ধ জমিতে ভাসমান সবজি চাষ শুধু কৃষকদের বাড়তি আয়ের পথ তৈরি করছে না, বরং বর্ষাকালে নিরাপদ সবজি উৎপাদন, পতিত জমির সর্বোত্তম ব্যবহার এবং স্থানীয় বাজারে সবজির সরবরাহ বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা অব্যাহত থাকলে ভাসমান পদ্ধতিতে এ চাষাবাদ নবীনগরের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার আরও বিস্তৃত করবে।