দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর ধরে নিয়মিত ছাপা পত্রিকা পড়ে আসছেন আবুল হোসেন। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও পত্রিকার প্রতি ভালোবাসা কমেনি। প্রতিদিন একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা কিনে পড়েন তিনি। স্থানীয়দের কাছে তাই তিনি এখন ‘পত্রিকাপ্রেমী আবুল হোসেন’ নামেই বেশি পরিচিত।
আবুল হোসেন আখাউড়া পৌর শহরের রাধানগর এলাকার বাসিন্দা। স্ত্রী, তিন মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে তার পরিবার। সন্তানরা আলাদা থাকায় বর্তমানে স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস করেন তিনি। জীবিকার তাগিদে পৌর শহরের সড়ক বাজার এলাকায় ফুটপাতে বসে বিভিন্ন জাতের সবজি বীজ বিক্রি করেন।
.png)
পত্রিকা পড়ার প্রতি তার ভালোবাসার শুরু ছোটবেলা থেকেই। তবে তখন পত্রিকা কেনার সামর্থ্য ছিল না। তাই বাজারের লাইব্রেরি কিংবা বইয়ের দোকানে বসে পত্রিকা পড়তেন। পরে উপার্জন শুরু করার পর নিজের টাকা দিয়ে পত্রিকা কেনা শুরু করেন। সেই থেকে টানা প্রায় চার দশক ধরে ছাপা পত্রিকা কিনে পড়ছেন তিনি।
আবুল হোসেন বলেন, ছোটবেলা থেকেই পত্রিকা পড়ার প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল। তখন পত্রিকা কেনার সামর্থ্য ছিল না। তাই লাইব্রেরি বা বইয়ের দোকানে গিয়ে পত্রিকা পড়তাম। উপার্জন শুরু করার পর থেকে নিজের টাকা দিয়ে পত্রিকা কিনে পড়ছি। প্রায় ৪০ বছর ধরে নিয়মিত ছাপা পত্রিকা পড়ছি।
চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আমার চোখ আগে ঠিকঠাকই ছিল। কয়েক বছর ধরে সমস্যা শুরু হয়েছে। এখন দূরের লেখা আগের মতো স্পষ্ট দেখতে পাই না। তাই পত্রিকা চোখের কাছে এনে পড়তে হয়। তবে এভাবে পড়তে আমার কোনো সমস্যা হয় না।”
প্রতিদিনের পত্রিকায় কোন ধরনের খবর বেশি পড়েন জানতে চাইলে আবুল হোসেন বলেন, প্রথমে রাজনৈতিক খবর পড়ি। এরপর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ পড়ি। তারপর খেলাধুলা এবং গ্রামবাংলার বিভিন্ন খবর পড়ি। পত্রিকা পড়লে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও সমসাময়িক নানা বিষয়ে জানা যায়।
তিনি আরও বলেন, ঝড়-বৃষ্টি যাই হোক, পত্রিকা কেনা বন্ধ করি না। প্রতিদিন একটি করে জাতীয় পত্রিকা কিনি। পত্রিকা না পড়লে ভালো লাগে না। অনেক সময় মানুষ আমার কাছে এসে বিভিন্ন খবর জানতে চায়। তখন পত্রিকা পড়ার কারণে তাদের নানা তথ্য বলতে পারি।
আবুল হোসেন জানান, এসএসসি পাস করার পর একটি কোম্পানিতে চাকরি পান। সেখানে প্রায় ৩০ বছর চাকরি করার পর অবসর নেন। চাকরি থেকে অবসরের পর অনেকটা বেকার হয়ে পড়েন। এরপর জীবিকার প্রয়োজনে ফুটপাতে বসে সবজি বীজ বিক্রি শুরু করেন।
তিনি বলেন, এখন বয়স হয়েছে। আগের মতো ব্যবসা করতে পারি না। অনেক সময় বসে থাকতে হয়। তবে কাজের ফাঁকে পত্রিকা পড়ি। পত্রিকা পড়াটা এখন আমার অভ্যাসের চেয়েও বেশি কিছু হয়ে গেছে।
স্থানীয় কয়েকজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জানান, আবুল হোসেনকে এলাকার সবাই পত্রিকাপ্রেমী হিসেবেই চেনেন। প্রতিদিন সকালে পত্রিকা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত তিনি যেন অস্থির হয়ে থাকেন। খোলা আকাশের নিচে ফুটপাতে বসে ব্যবসা করার পাশাপাশি এই বয়সেও নিয়মিত পত্রিকা পড়ার দৃশ্য স্থানীয়দেরও আকৃষ্ট করে।
স্থানীয় পত্রিকার হকার মো. শাহআলম বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে পত্রিকা বিক্রি করছি। কিন্তু আবুল হোসেনের মতো এমন নিয়মিত পাঠক খুব কমই দেখেছি। আমাকে দেখামাত্রই তিনি পত্রিকা নেওয়ার জন্য এগিয়ে আসেন। প্রতিদিন একটি পত্রিকা কিনে পড়েন তিনি।
সড়ক বাজারের ব্যবসায়ী মো. মনির হোসেন বলেন, আমার আগে নিয়মিত পত্রিকা পড়ার অভ্যাস ছিল না। আবুল হোসেনকে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিদিন পত্রিকা কিনে পড়তে দেখেছি। তিনি সবজি বীজ বিক্রির ফাঁকে ফাঁকে পত্রিকা পড়েন। তার কাছ থেকে পত্রিকা নিয়ে পড়তে পড়তে আমারও অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন পত্রিকা না পড়লে ভালো লাগে না।
জীবনের নানা ব্যস্ততা, বয়সের ভার কিংবা চোখের দুর্বলতা কোনোটিই আবুল হোসেনের পত্রিকা পড়ার আগ্রহকে থামাতে পারেনি। ফুটপাতের ছোট্ট ব্যবসার ফাঁকে প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় চোখ রাখেন তিনি। তার কাছে পত্রিকা শুধু খবর জানার মাধ্যম নয়, বরং দীর্ঘদিনের এক প্রিয় সঙ্গী।