ধানক্ষেতে আধুনিক পদ্ধতিতে বিদেশি বিভিন্ন জাতের ফল উৎপাদনে সাফল্য কৃষকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। কৃষকদের কাছে বিদেশি ফলের চাষও দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় বিদেশি ফল চাষে খুলেছে নতুন সম্ভাবনার দ্বার। প্রায় ১৫ বছর আগে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া এই চাষ এখন বাণিজ্যিক রূপ পেয়েছে।
.png)
উপজেলার কৃষকেরা এখন অ্যাভোকাডো, রাম্বুটান, লংগান, মাল্টা, ড্রাগন, আনারকলি ও আঙুরের মতো বিদেশি ফল চাষ করছেন। একসময় মনে করা হতো, বাংলাদেশের মাটিতে আঙুর চাষ প্রায় অসম্ভব। কারণ আঙুর মানেই ছিল বিদেশি ফল, যা দেশে আমদানি করেই পাওয়া যেত। তবে সময় বদলেছে। উন্নত জাত, আধুনিক চাষপদ্ধতি ও কৃষকদের আগ্রহের কারণে এখন জীবননগরে সফলভাবে আঙুরসহ বিভিন্ন বিদেশি ফলের চাষ হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, উর্বর পলিমাটিতে এসব ফল চাষে তুলনামূলক কম খরচ হয়, আবার ফলনও ভালো। ফলে চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি বাজারেও ভালো দাম মিলছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরের ফলের দোকানগুলোতে সরবরাহ হচ্ছে জীবননগরে উৎপাদিত ফল।
জীবননগরে পরীক্ষামূলকভাবে আনারকলি চাষ করে সফলতা পেয়েছেন অনন্তপুর গ্রামের কৃষক আকশেদ আলী। তাঁর বাগানে এখন গাছে গাছে ঝুলছে ফুল ও কাঁচা-পাকা সবুজ ফল। অল্প খরচে লাভজনক হওয়ায় এ চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন অন্য কৃষকেরাও।
আকশেদ আলী জানান, দীর্ঘ ১০ বছর ধরে তিনি ড্রাগন ও মাল্টা চাষ করছেন। এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ইউটিউবে ভিডিও দেখে দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল ও প্যারাগুয়ের আদি ফল আনারকলির চারা সিরাজগঞ্জ থেকে সংগ্রহ করেন। ধানক্ষেত প্রস্তুত করে সেখানে চারাগুলো রোপণ করেন। এরপর নিয়মিত সেচ, সার, কীটনাশক প্রয়োগসহ পরিচর্যা করতে থাকেন।
মাত্র ছয় মাসের মাথায় গাছে থোকায় থোকায় ফুল আসতে শুরু করে। ফলগুলো সঠিকভাবে ধরে রাখতে এবং পচন থেকে রক্ষা করতে বাঁশের খুঁটি ও তার দিয়ে মাচা তৈরি করা হয়।
বর্তমানে মাচায় মাচায় ঝুলছে কাঁচা ও পাকা আনারকলি। আগস্টের শুরু থেকে পাকা ফল তোলা শুরু হয়েছে। এসব ফল ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বাজারজাত করা হচ্ছে।
জীবননগর উপজেলার রাজাপুর গ্রামের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সজল আহমেদ ২০১৪ সালে মাত্র ৯ বিঘা পেয়ারা বাগান দিয়ে শুরু করেন। বর্তমানে প্রায় ১৪০ বিঘা জমিতে দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির ফলের বাগান গড়ে তুলেছেন তিনি।
তাঁর বাগানে বর্তমানে মরক্কো, পাকিস্তান, আফ্রিকা ও ভিয়েতনাম জাতের মাল্টা রয়েছে ৪০ বিঘা জমিতে। বিভিন্ন প্রজাতির আম রয়েছে ৩৫ বিঘা জমিতে। এ ছাড়া ড্রাগন, কমলা, আঙুর, অ্যাভোকাডোসহ প্রায় ২০০ ধরনের দেশি-বিদেশি ফল রয়েছে।
সজল আহমেদ বলেন, পেয়ারা চাষে কাঙ্ক্ষিত লাভ না পাওয়ায় ২০১৪ সালে তিনি মাল্টা চাষে মনোনিবেশ করেন। শুরুতে কিছুটা চ্যালেঞ্জ থাকলেও ধীরে ধীরে তাঁর বাগানের পরিধি ও ফলন বাড়তে থাকে।
বর্তমানে সাধারণ সবুজ মাল্টার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত ‘ইয়েলো কিং’সহ প্রায় ১০ প্রজাতির দেশি-বিদেশি মাল্টা চাষ করছেন তিনি। তাঁর এই বিশাল কর্মযজ্ঞে গড়ে উঠেছে ‘বিসমিল্লাহ নার্সারি ও ফলের বাগান’ নামের একটি কৃষি প্রকল্প।
সজলের বাগান দেখতে এবং চাষপদ্ধতি শিখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থী ও নতুন উদ্যোক্তারা ভিড় করেন।
উপজেলার উথলী গ্রামের কৃষক আশরাফুজ্জামান মিলু ২০১০ সাল থেকে ড্রাগন ও মাল্টা চাষ করছেন। বর্তমানে তাঁর ২২ বিঘা জমিতে ড্রাগন, ৬ বিঘা জমিতে মাল্টা এবং ১০ বিঘা জমিতে পেয়ারা চাষ হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রাকৃতিকভাবে ফল চাষ করছি। এসব বাগানে ফল বড় করতে কোনো ওষুধ ব্যবহার করি না। এতে ফলের আকার ছোট হচ্ছে, দামও কম পাচ্ছি।’
একই গ্রামের রাজু আহমেদ দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে ফল চাষ করছেন। ২০১০ সালে আপেল কুল চাষের মাধ্যমে তাঁর ফল চাষে হাতেখড়ি। এরপর থাই পেয়ারা চাষ করেন। পরে মাল্টা ও ড্রাগন চাষ শুরু করেন।
তিনি বলেন, এক বিঘা জমিতে থাই পেয়ারা চাষ করলে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যায়।
উপজেলার হাসাদাহ গ্রামে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ করে দারুণ সাফল্য পেয়েছেন তরুণ উদ্যোক্তা দুই ভাই আশরাফুল ইসলাম ও তরিকুল ইসলাম। তাঁরা সাড়ে ৩ বিঘা জমিতে প্রায় ৭৫০টি পার্পেল ও বাইকুনুর জাতের আঙুরগাছ লাগিয়েছেন। বাগান থেকে অর্থনৈতিকভাবে লাভের মুখ দেখছেন তাঁরা।
কৃষকদের মতে, একসময় বাংলাদেশের মাটিতে আঙুর চাষ প্রায় অসম্ভব বলে মনে করা হতো। তবে উন্নত জাত, আধুনিক চাষপদ্ধতি ও কৃষকদের আগ্রহের কারণে সেই ধারণা বদলে গেছে। জীবননগরের মাটিতে এখন সফলভাবে আঙুর উৎপাদন হচ্ছে।
জীবননগর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জীবননগরে ড্রাগন ৬৮৮ হেক্টর, মাল্টা ৩১২ হেক্টর, কমলা ১২০ হেক্টর, শরিফা ১ হেক্টর, আঙুর ৯ হেক্টর, রকমেলন ৬ হেক্টর, আনারকলি ২ হেক্টর, অ্যাভোকাডো ৪ হেক্টর, রাম্বুটান শূন্য দশমিক ১৩ হেক্টর, পেয়ারা ৭৪৮ হেক্টর, আনার শূন্য দশমিক ৫০ হেক্টর ও বারোমাসি কাঁঠাল শূন্য দশমিক ৫০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জীবননগরের এসব ফলবাগানের খবর ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিদিন আশপাশের গ্রাম থেকে শুরু করে যশোর, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর এমনকি ঢাকা থেকেও মানুষ বাগান দেখতে ভিড় করছেন।
বাগানে ঘুরতে আসা স্থানীয় দর্শনার্থী হাসান নিলয় বলেন, ‘এমন ফল আগে শুধু টেলিভিশন ও ইউটিউবে দেখেছি। এখন গ্রামে কাছ থেকে দেখতে পারছি।’
আরেক দর্শনার্থী হাসিবুল ইসলাম বলেন, ‘এসব বিদেশি ফল খেতেও সুস্বাদু, দেখতেও সুন্দর। আমরাও এমন বাগান করার কথা ভাবছি।’
জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন বলেন, বিদেশি ফল চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। কৃষি বিভাগ থেকে তাঁদের প্রযুক্তিগত সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এতে কৃষকদের নতুন আয়ের পথ খুলবে।
তিনি বলেন, জীবননগরের মাটির বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে বিদেশি ফলের চাষ সফল হচ্ছে। কৃষকেরা লাভবান হওয়ায় এ চাষে আগ্রহ বাড়ছে। জীবননগরে ধান, পাট ও ভুট্টা চাষের পাশাপাশি বিদেশি ফলের বাণিজ্যিক চাষ কৃষির নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে। এতে কৃষকদের আয় বাড়ার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্রও বদলে যাচ্ছে।
তাঁর মতে, বিদেশি ফলের চাষ সম্প্রসারিত হলে দেশের ফলের চাহিদা পূরণে স্থানীয় উৎপাদনের ভূমিকা বাড়বে এবং আমদানিনির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে কৃষিকে আরও টেকসই করার সুযোগ তৈরি হবে।