দর্শনার্থীদের অনেকের মতে, টাঙ্গাইলের চমচম, সন্দেশ কিংবা শাড়ি স্থানীয় মানুষের কাছে নতুন কিছু নয়। এসব পণ্য তাঁরা নিয়মিতই দেখছেন, কিনছেন ও ব্যবহার করছেন। কিন্তু জেলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্ভাবনাকে একটি সমন্বিত ব্র্যান্ড হিসেবে দেশ-বিদেশে তুলে ধরার ভাবনাটিই এবারের উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) থেকে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত শহরের শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যানে অনুষ্ঠিত হয় তিন দিনব্যাপী এই উৎসব। উৎসব ঘিরে সকাল থেকেই দর্শনার্থীদের আনাগোনা থাকলেও বিকেলের পর ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। পরিবার-পরিজন নিয়ে আসা মানুষের পাশাপাশি তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য।
.png)
মেলায় জেলার ১২ উপজেলা থেকে মিষ্টি কারিগর ও উদ্যোক্তারা অংশ নেন। ২০টি স্টলে প্রদর্শন ও বিক্রি করা হয় পোড়াবাড়ির চমচম, জামুর্কির কালিদাস সন্দেশসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি। পাশাপাশি তিনটি স্টলে প্রদর্শিত হয় টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁতের শাড়ি।
কেউ মিষ্টি কিনেছেন, কেউ চেখে দেখেছেন বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি। আবার কেউ শাড়ির স্টলে ঘুরে ঘুরে দেখেছেন তাঁতিদের তৈরি নকশা ও বৈচিত্র্য। এরই মধ্যে অনেকের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে ‘ব্র্যান্ড টাঙ্গাইল’।
মেলা ঘুরতে আসা একাধিক দর্শনার্থী বলেন, ‘মিষ্টি আমরা সবসময়ই খাচ্ছি, টাঙ্গাইলের শাড়িও আমাদের পরিচিত। কিন্তু টাঙ্গাইলের এত ঐতিহ্য, পণ্য ও সংস্কৃতিকে একসঙ্গে নিয়ে একটি ব্র্যান্ড গড়ে তোলার উদ্যোগ এটাই আমাদের বেশি মনে ধরেছে। এই উদ্যোগের কথা শুনেই মেলায় আসার আগ্রহ তৈরি হয়েছে।’
তাঁদের মতে, টাঙ্গাইলের চমচম কিংবা শাড়ির নিজস্ব পরিচিতি আগে থেকেই রয়েছে। কিন্তু এসবকে শুধু স্থানীয় পণ্য হিসেবে না দেখে একটি জেলার সামগ্রিক ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
আয়োজকদের ভাষ্য, একটি অঞ্চলের ঐতিহ্য তখনই টেকসই হয়, যখন তা শুধু মানুষের স্মৃতি কিংবা আবেগে সীমাবদ্ধ না থেকে অর্থনীতি ও বাজারের সঙ্গে যুক্ত হয়। সেই ভাবনা থেকেই মিষ্টি শিল্প, তাঁতশিল্প, স্থানীয় সংস্কৃতি ও পর্যটনকে একই ছাতার নিচে এনে ‘ব্র্যান্ড টাঙ্গাইল’ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আয়োজকেরা মনে করেন, নিয়মিত এ ধরনের আয়োজন করা গেলে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্য শুধু স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়েই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও নতুন পরিচয়ে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে। এতে ঐতিহ্যবাহী পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোক্তা ও কারিগরদের কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।
জেলা প্রশাসক শরীফা হক বলেন, ‘টাঙ্গাইলের জিআই পণ্য শুধু টাঙ্গাইলের নয়, এগুলো বাংলাদেশের গর্ব’ এই বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই উৎসবের অন্যতম লক্ষ্য। এর মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী করার পাশাপাশি টাঙ্গাইলের পর্যটন সম্ভাবনাকেও এগিয়ে নেওয়া হবে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, টাঙ্গাইলের চমচম শুধু বাংলাদেশের মানুষের কাছেই নয়, বিশ্বের অনেক মানুষের কাছেও পরিচিত। টাঙ্গাইলের শাড়ির মতো চমচমও জেলার ঐতিহ্যের অংশ। এই ঐতিহ্যকে কীভাবে আরও এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী চমচম বিদেশে রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হবে। চমচম শিল্পের প্রসার ঘটলে রপ্তানি আয় বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও মানুষের আগ্রহও বাড়বে। এর মাধ্যমে প্রান্তিক অর্থনীতির পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
উৎসবে আসা দর্শনার্থীদের প্রত্যাশা, ‘ব্র্যান্ড টাঙ্গাইল’ যেন কেবল একটি উৎসবের স্লোগান হয়ে না থাকে। মেলার মাঠ থেকে এই উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ুক উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং, বিপণন ও আন্তর্জাতিক বাজার পর্যন্ত।
তাঁদের আশা, টাঙ্গাইলের চমচমের মিষ্টি স্বাদ আর তাঁতের শাড়ির নান্দনিকতা একদিন শুধু জেলার পরিচয় নয়, বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ডের পরিচয় হয়ে উঠবে।