বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৯৪ সালের ১ জানুয়ারি শ্রেণি কার্যক্রম শুরু হয়। দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে বিদ্যালয়ে প্রায় ৫৮৮ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এর মধ্যে ছাত্রীসংখ্যাই বেশি।
বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সংকটের চিত্রও বেশ নাজুক। ২০০৫ সালে নির্মিত দোতলা ভবনের বিভিন্ন স্থানে পলেস্তারা খসে রড বেরিয়ে পড়েছে। ছাদে দেখা দিয়েছে ফাটল। দরজা-জানালার অবস্থাও ভালো নয়। পাশাপাশি টিনশেড শ্রেণিকক্ষের চাল ফুটো হয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে ভিজে যায় শিক্ষার্থীদের বই-খাতা ও বেঞ্চ।
.png)
সবচেয়ে বড় সমস্যা শ্রেণিকক্ষ ও আসনসংকট। ৫৮৮ শিক্ষার্থীর জন্য বিদ্যালয়ে বেঞ্চ রয়েছে মাত্র ১১০টি। ফলে একটি বেঞ্চে যেখানে দুই থেকে তিনজন শিক্ষার্থীর বসার কথা, সেখানে পাঁচ থেকে ছয়জনকে গাদাগাদি করে বসতে হয়। শ্রেণিকক্ষের সংকটের কারণে কখনো প্রধান শিক্ষকের কক্ষে, কখনো লাইব্রেরি, বারান্দা কিংবা অন্য অস্থায়ী জায়গায় ক্লাস নিতে হয়।
বিদ্যালয়ে নেই বিজ্ঞানাগার, ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাব ও মানসম্মত লাইব্রেরি। ছাত্রীদের জন্য নেই আলাদা কমনরুম। স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারেরও তীব্র সংকট রয়েছে। বর্তমানে বিদ্যালয়ে মাত্র একটি শৌচাগার রয়েছে, যা ৩২৯ জন ছাত্রী ও নারী শিক্ষকের ব্যবহার করতে হয়। পুরুষ শিক্ষক ও ছাত্রদের শৌচাগারের জন্য আশপাশের বাড়ির ওপর নির্ভর করতে হয়।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, শিক্ষকদের জন্য পৃথক শৌচাগার নির্মাণে গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। পরে সেই বরাদ্দ বাতিল হয়ে যায়।
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহবুবা আক্তার ফাতেমা বলে, ‘মেয়েদের জন্য মাত্র একটি টয়লেট। সেখানে যেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। সাবান বা হাত ধোয়ার আধুনিক ব্যবস্থাও নেই। কমনরুম না থাকায় ছাত্রীদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়।’
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুহাম্মদ আবি আব্দুল্লাহ আহাদ বলে, ‘শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয়সংখ্যক ফ্যান নেই। প্রচণ্ড গরমে টিনের চালের নিচে দমবন্ধ পরিবেশে ক্লাস করতে হয়। এর ওপর বেঞ্চের সংকট থাকায় গাদাগাদি করে বসতে হয়।’
বর্ষা মৌসুমে বিদ্যালয়ের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। জলাবদ্ধতায় মাঠ ও প্রবেশপথ পানিতে ডুবে যায়। এতে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। সীমানাপ্রাচীর না থাকায় বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে। বহিরাগতদের অবাধ যাতায়াত ও আড্ডার অভিযোগও রয়েছে।
বিদ্যালয় সূত্রে আরও জানা যায়, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের সময় বিদ্যালয়ের দুটি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ভেঙে পড়ে। পরে সেগুলো পুনর্নির্মাণ করে সেমিপাকা ঘর করা হয়েছে। তবে মূল একাডেমিক ভবনের সংকট এখনো কাটেনি।
বর্তমানে বিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ১৯ জন। এর মধ্যে রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, চারুকলা ও সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ চারটি পদ শূন্য রয়েছে।
স্থানীয় অভিভাবকদের অভিযোগ, ভোলা সদর উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ইতোমধ্যে বহুতল ভবন নির্মাণ হয়েছে। কোথাও কোথাও আধুনিক শিক্ষা উপকরণ ও ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাবও রয়েছে। অথচ তিন দশকের বেশি পুরোনো বন্ধুজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি এখনো পুরোনো ভবন ও টিনশেড শ্রেণিকক্ষের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দীর্ঘদিনেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়ায় হতাশ তারা।
তবে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের ফলাফল সন্তোষজনক বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টির পাসের হার ৫৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে একজন শিক্ষার্থী। আগামী বছর প্রায় ৯০ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে।
শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি জাতীয় দিবস পালন, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সামাজিক সমাবেশ, ক্ষুদে ডাক্তার দল, মাদকবিরোধী কার্যক্রম ও ইভটিজিং প্রতিরোধসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রমেও বিদ্যালয়টি সক্রিয় রয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আ. সহিদ তালুকদার বলেন, ‘গত সরকারের আমলে বহুতল ভবনের জন্য চারবার আবেদন করেও কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। অথচ আশপাশের অনেক বিদ্যালয়ে একাধিক ভবন নির্মাণ হয়েছে। ভবনসংকটের কারণে এখন টিনের ঘরেও ক্লাস নিতে হচ্ছে। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি আধুনিক বহুতল একাডেমিক ভবন নির্মাণ হলে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের পরিবেশ অনেক উন্নত হবে। দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য যোগাযোগ করা হচ্ছে।’
বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি আবদুল কাদের সেলিম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে পড়া ঠেকাতে এখন আর দেরি করার সুযোগ নেই। জরুরি ভিত্তিতে একটি আধুনিক একাডেমিক ভবন, স্বাস্থ্যসম্মত ওয়াশ ব্লক, বিজ্ঞানাগার, ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাব, পর্যাপ্ত বেঞ্চ ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’
তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয়টি ১৯৯৫ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে ধর্ম ও পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী আলহাজ মোশারফ হোসেন শাহজাহান প্রতিষ্ঠা করেন।
ভোলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিদ্যালয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করে ভবনের নাজুক অবস্থা দেখা গেছে। বহুতল ভবনের জন্য বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় ছবি ও প্রতিবেদনসহ বিষয়টি প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে উপস্থাপনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে ভবিষ্যতে বিদ্যালয়টির উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।’
স্থানীয় শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, আর কোনো দীর্ঘসূত্রতা নয় জরুরি ভিত্তিতে বন্ধুজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একটি আধুনিক বহুতল একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হোক। পাশাপাশি বিজ্ঞানাগার, কম্পিউটার ল্যাব, পর্যাপ্ত বেঞ্চ, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, সীমানাপ্রাচীর ও জলাবদ্ধতা নিরসনের ব্যবস্থা করা হোক। এতে বিদ্যালয়টির দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকট দূর হওয়ার পাশাপাশি প্রত্যন্ত এলাকার শত শত শিক্ষার্থীর মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত হবে।