ঢাকা,  শনিবার   ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

ছয় লাখ মানুষের জন্য নেই আইসিইউ, সংকটাপন্ন রোগী নিয়ে ভোগান্তি

মোহাম্মদ জোবায়ের হোসেন, ‎চরফ্যাশন (ভোলা)
প্রকাশিত: ১৫:৪৮, ৩ অক্টোবর ২০২৬
ছয় লাখ মানুষের জন্য নেই আইসিইউ, সংকটাপন্ন রোগী নিয়ে ভোগান্তি
চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ফাইল ছবি।

‎ভোলার চরফ্যাশন ও মনপুরা উপজেলার ছয় লাখের বেশি মানুষের জন্য নেই পূর্ণাঙ্গ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)। ফলে হৃদ্‌রোগ, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, গুরুতর দুর্ঘটনা, তীব্র শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত সংকটাপন্ন রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য দূরবর্তী হাসপাতালে নিতে হয়। এতে একদিকে যেমন রোগীর চিকিৎসা পেতে বিলম্বের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি ভোগান্তি ও আর্থিক চাপে পড়ছেন স্বজনরা।

‎বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, চরফ্যাশন উপজেলায় জনসংখ্যা ৫ লাখ ১৮ হাজার ৮১৭ জন এবং মনপুরা উপজেলায় ৮৯ হাজার ৭৪৫ জন। দুই উপজেলা মিলিয়ে জনসংখ্যা ৬ লাখ ৮ হাজার ৫৬২ জন। বিপুল এই জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তবে এখানে পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ সুবিধা না থাকার বিষয়টি স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
‎
‎চরফ্যাশন ও মনপুরার পাশাপাশি আশপাশের বিচ্ছিন্ন চর ও দ্বীপাঞ্চলের মানুষও বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য চরফ্যাশনের ওপর নির্ভরশীল। চর কুকরি-মুকরি, ঢালচর, মুজিবনগরসহ দুর্গম এলাকার মানুষকে চিকিৎসার প্রয়োজনে নদীপথ ও সড়কপথ পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে আসতে হয়। ফলে এসব এলাকার সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
‎
‎চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, হৃদরোগ, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, গুরুতর দুর্ঘটনা, তীব্র শ্বাসকষ্ট, মারাত্মক সংক্রমণ ও জটিল অস্ত্রোপচারের পর অনেক রোগীর নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। এ ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথ সুবিধা না থাকলে রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হয়।
‎
‎চরফ্যাশনের ভৌগোলিক অবস্থান রোগী স্থানান্তরের ক্ষেত্রে বাড়তি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। চারদিকে নদীবেষ্টিত এই জনপদে সড়ক ও নৌপথের ওপর নির্ভরশীলতা রয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলা, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া কিংবা নদীপথে চলাচলে প্রতিকূলতা দেখা দিলে সংকটাপন্ন রোগীকে দ্রুত অন্য হাসপাতালে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। জরুরি মুহূর্তে পরিবহন সংকট ও দীর্ঘ যাত্রা রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয়।
‎
‎শিশু ও নবজাতকদের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও বিশেষায়িত সেবার প্রয়োজন রয়েছে। জন্মের পর শ্বাসকষ্ট, মারাত্মক সংক্রমণ, খিঁচুনি কিংবা অন্যান্য জটিলতায় আক্রান্ত শিশুদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও বিশেষায়িত চিকিৎসা দিতে হয়। এ জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (পিআইসিইউ) এবং নবজাতকদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ) গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিশেষায়িত সেবা স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত করা না গেলে শিশুদেরও দূরবর্তী হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
‎
‎একটি সংকটাপন্ন রোগীকে নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া স্বজনদের জন্য শুধু শারীরিক কষ্টের বিষয় নয়, বরং মানসিক উদ্বেগ ও আর্থিক চাপেরও কারণ। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসার অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে গিয়ে পরিবারগুলোকে নানা অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয়।
‎
‎২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা, জনবল সংকট ও প্রয়োজনীয় সেবা পেতে রোগীদের ভোগান্তির বিষয় উঠে এসেছিল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও তখন জনবল সংকটকে সেবা প্রদানের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করেছিল। এ পরিস্থিতিতে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে।
‎
‎চরফ্যাশন ও মনপুরার ছয় লাখের বেশি মানুষের পাশাপাশি আশপাশের বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বিবেচনায় চরফ্যাশনে একটি পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ স্থাপনের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স, আধুনিক যন্ত্রপাতি, নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ ও জরুরি রোগী স্থানান্তরের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
‎
‎স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়াতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। হাসপাতালের অবকাঠামো, জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার মাধ্যমে নিবিড় পরিচর্যা সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলে দুর্গম জনপদের মানুষের জন্য জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে।
‎
‎নদীবেষ্টিত চরফ্যাশন ও মনপুরার মানুষের জন্য জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ। সংকটাপন্ন রোগীকে দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসার আওতায় আনা এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা স্থানীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। একটি পূর্ণাঙ্গ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র এ অঞ্চলের মানুষের জন্য জরুরি চিকিৎসাসেবার সুযোগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Advertisement
ডেইলি-বাংলাদেশ/ভোলা
ট্যাগ: ভোলা
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!