ঢাকা,  রোববার   ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

গরুর গোবরেই জ্বলছে চুলা, নন্নী গ্রাম এখন ‘বায়োগ্যাস পল্লী’

মো. সুরুজ্জামান, নালিতাবাড়ী (শেরপুর)
প্রকাশিত: ১৮:৪১, ১ নভেম্বর ২০২৬
গরুর গোবরেই জ্বলছে চুলা, নন্নী গ্রাম এখন ‘বায়োগ্যাস পল্লী’
বাড়িতে বায়োগ্যাস প্লান্টের গ্রাস দিয়ে রান্না করছেন গৃহবধূ। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ।

শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার নন্নী ইউনিয়নে গরুর গোবর থেকে উৎপাদিত বায়োগ্যাসে রান্না করছেন প্রায় ৫০টি পরিবারের সদস্যরা। এক থেকে পাঁচটি বা তার বেশি গরু থাকলেই মিলছে পারিবারিক রান্নার জ্বালানির জোগান। এতে একদিকে কমছে রান্নার খরচ, অন্যদিকে গোবর থেকে তৈরি হচ্ছে জৈব সার। পরিবেশবান্ধব এই উদ্যোগে বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ জনপদের জ্বালানি ব্যবহারের চিত্র।

জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নন্নী ইউনিয়নের ডেকরাপাড়া গ্রামের আবুল কালাম আজাদ (৪৫) ছয়টি গরুর গোবর থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন করছেন। এই গ্যাসে তাঁর দুটি পরিবারের রান্নার চাহিদা পূরণ হচ্ছে। ছয় মাস ধরে তাঁরা এই গ্যাস ব্যবহার করছেন। এতে দুই পরিবারের মাসে প্রায় ৪ হাজার টাকা সাশ্রয় হচ্ছে।

একই ইউনিয়নের বায়োগ্যাস ব্যবহারকারী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, গরুর গোবর থেকে উৎপাদিত গ্যাস ব্যবহার করতে বাড়তি কোনো ঝামেলা নেই। বরং রান্নার জ্বালানির খরচ কমছে। গ্যাস উৎপাদনের পর অবশিষ্ট গোবর জমিতে জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা যাচ্ছে। এতে একসঙ্গে জ্বালানি ও কৃষি, দুই ক্ষেত্রেই উপকার পাওয়া যাচ্ছে।

তিনটি গরু থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন করছেন একই গ্রামের মাদরাসা শিক্ষক খোকন মিয়া। তিনি বলেন, স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরি করেন। আগে খড়ির চুলায় রান্না করতে অনেক সময় ও শ্রম ব্যয় হতো। এখন বায়োগ্যাস ব্যবহারে সেই ভোগান্তি নেই। গরু থেকে দুধের পাশাপাশি রান্নার গ্যাসও পাওয়া যাচ্ছে। দ্রুত রান্না শেষ করা সম্ভব হচ্ছে।

খোকন মিয়া আরও বলেন, আগে প্রতি মাসে সিলিন্ডার গ্যাস কিনতে কমপক্ষে ২ হাজার টাকা খরচ হতো। এখন সেই টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। বছরে প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ কমছে। গ্রামাঞ্চলের পরিবারের জন্য বায়োগ্যাস বেশ উপযোগী।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একজনের উদ্যোগ দেখে অন্যরাও উৎসাহিত হচ্ছেন। এভাবে নন্নী ইউনিয়নের প্রায় ৫০টি পরিবার বায়োগ্যাস ব্যবহার শুরু করেছে। এসব পরিবারের কেউ কেউ গরুর গোবরের পাশাপাশি পোলট্রির বিষ্ঠা থেকেও গ্যাস উৎপাদন করছেন।

শেরপুর জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বায়োগ্যাস প্লান্টের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ আল মনসুর বলেন, একটি বাড়িতে তিনটি গরু থাকলে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কেজি গোবর পাওয়া যায়। প্রতি ২২ কেজি গোবর থেকে প্রায় এক কেজি গ্যাস উৎপাদন সম্ভব। এই পরিমাণ গ্যাস দিয়ে একটি পরিবারের দৈনন্দিন রান্নার চাহিদা পূরণ করা যায়। নন্নী এলাকায় বায়োগ্যাসের ব্যবহার দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারের ‘ইমপ্যাক্ট প্রকল্প ফেজ-৩’-এর আওতায় শেরপুর জেলার পাঁচটি উপজেলায় মোট ৮৫টি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করা হচ্ছে। এর মধ্যে নালিতাবাড়ী উপজেলার নন্নী ইউনিয়নে স্থাপন করা হয়েছে ৩০টি প্লান্ট। ইউনিয়নটিকে ‘বায়োগ্যাস পল্লী’ হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি আনুষ্ঠানিকভাবে এ নামে ঘোষণা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

শেরপুর জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. হারুনর রশীদ বলেন, গ্রামীণ এলাকায় বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে গ্রামাঞ্চলে রান্নার জ্বালানির চাহিদা পূরণে বায়োগ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

গোবরকে বর্জ্য হিসেবে ফেলে না দিয়ে জ্বালানি ও জৈব সারে রূপান্তরের এই উদ্যোগ নন্নী ইউনিয়নের পরিবারগুলোর ব্যয় কমানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/নালিতাবাড়ী/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!