নিসর্গচেতনার বাতিঘর- কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
বাংলা কথাসাহিত্যের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কথাশিল্পী হিসেবে তিনি বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। গ্রামীণ জনজীবন, প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য, মানুষের অন্তর্জগৎ এবং জীবনসংগ্রামের নিপুণ রূপকার ছিলেন তিনি। তাঁর লেখনীতে সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আশা-নিরাশা, মান-অভিমান ও জীবনের বহুমাত্রিক বাস্তবতা অসাধারণ শিল্পকুশলতায় ফুটে উঠেছে।
তাঁর সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রকৃতি ও মানুষের নিবিড় মেলবন্ধন। ভাষার মাধুর্য, চরিত্রের স্বাভাবিক উপস্থাপন, গভীর জীবনবোধ এবং প্রকৃতির সূক্ষ্ম বর্ণনায় তাঁর রচনা হয়ে উঠেছে স্বতন্ত্র ও অনন্য। বিশেষ করে বাংলার গ্রামীণ সমাজ, নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের আর্থসামাজিক বাস্তবতা, লোকজ সংস্কৃতি ও চিরায়ত জীবনধারার যে বিশ্বস্ত চিত্র তিনি এঁকেছেন, তা বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।
১৮৯৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার কাঁচরাপাড়ার নিকটবর্তী ঘোষপাড়া-মুরারিপুর গ্রামে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল একই জেলার বনগাঁর নিকটবর্তী বারাকপুর গ্রামে। তাঁর পিতা মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সংস্কৃত পণ্ডিত ও কথক; মা মৃণালিনী দেবী। পাঁচ সন্তানের মধ্যে বিভূতিভূষণ ছিলেন জ্যেষ্ঠ।
দারিদ্র্যের মধ্যেই তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে। পিতার কাছেই তাঁর শিক্ষার হাতেখড়ি। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় পিতাকে হারান তিনি। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যান। ১৯১৪ সালে প্রথম বিভাগে এনট্রান্স, ১৯১৬ সালে প্রথম বিভাগে আইএ এবং ১৯১৮ সালে ডিস্টিংশনসহ বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
পরবর্তী সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ ও আইন বিষয়ে ভর্তি হলেও আর্থিক ও পারিপার্শ্বিক কারণে পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি।
১৯১৯ সালে হুগলির একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে সোনারপুরের হরিনাভি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। এরপর পাথুরিয়াঘাটার জমিদার খেলাৎচন্দ্র ঘোষের গৃহশিক্ষক ও এস্টেটের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে বিহারের ভাগলপুরে তাঁর এস্টেটের সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে গোপালনগর বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন এবং আমৃত্যু সেখানেই কর্মরত ছিলেন।
ব্যক্তিজীবনেও তাঁকে নানা দুঃখ ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। প্রথম জীবনে গৌরী দেবীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।
কিন্তু বিয়ের অল্পদিনের মধ্যেই নিউমোনিয়ায় গৌরী দেবীর মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে শোকাহত করে। দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৪০ সালে রমা দেবীকে বিয়ে করেন। পরবর্তী জীবনে তাঁদের একমাত্র সন্তান তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম হয়।
১৯২১ সালে প্রবাসী পত্রিকায় ‘উপেক্ষিতা’ গল্প প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যিক জীবনের সূচনা ঘটে। তবে সাহিত্যজগতে তাঁর ব্যাপক পরিচিতি ও প্রতিষ্ঠা আসে ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসের মাধ্যমে। ভাগলপুরে অবস্থানকালে ১৯২৫ সালে তিনি উপন্যাসটি লেখা শুরু করেন এবং ১৯২৮ সালে রচনা শেষ করেন।
১৯২৯ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত এই উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। গ্রামীণ জীবনের দারিদ্র্য, পারিবারিক টানাপোড়েন, শৈশবের বিস্ময়, প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং জীবনসংগ্রামের এক অনবদ্য আখ্যান ‘পথের পাঁচালী’।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উপন্যাসটি সম্পর্কে প্রশংসাসূচক মন্তব্য করেছিলেন বলে জানা যায়। ‘পথের পাঁচালী’ শুধু বাংলা সাহিত্যেই নয়, বিশ্বসাহিত্যেও বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় এই উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ১৯৫৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রটি ১৯৫৬ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘শ্রেষ্ঠ মানবিক দলিল’ হিসেবে পুরস্কৃত হয়।
পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত হয় ছবিটি। উপন্যাসটিও বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে আন্তর্জাতিক পাঠকমহলে পরিচিতি লাভ করে।
‘পথের পাঁচালী’র পর এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘অপরাজিত’ও বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সৃষ্টি। অপুর শৈশব, কৈশোর, শিক্ষা, স্বপ্ন ও জীবনসংগ্রামের ধারাবাহিক বিবর্তন এতে অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে। সত্যজিৎ রায় এই উপন্যাস অবলম্বনেও চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।
বিভূতিভূষণের আরেকটি কালজয়ী সৃষ্টি ‘আরণ্যক’। প্রকৃতি, অরণ্য, আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষের জীবন, সভ্যতার বিস্তার এবং মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। বিহারের অরণ্য অঞ্চলে কাজ করার সময় অর্জিত অভিজ্ঞতা তাঁর এই রচনার পটভূমি নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল।
প্রকৃতির প্রতি গভীর মমত্ববোধ এবং মানুষের জীবনসংগ্রামের পাশাপাশি সভ্যতার আগ্রাসনে অরণ্য ও জীববৈচিত্র্যের বিপন্নতার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেছেন। ‘আরণ্যক’ বাংলা সাহিত্যে প্রকৃতিনির্ভর কথাসাহিত্যের এক অনন্য নিদর্শন। তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ‘ইছামতী’।
নদীর নাম ধারণ করলেও এটি নিছক নদীকেন্দ্রিক উপন্যাস নয়; বরং উনিশ শতকের বাংলার গ্রামীণ সমাজ, নীলচাষ, জমিদারি ব্যবস্থা, সামাজিক বৈষম্য, মানুষের সম্পর্ক ও জীবনযাত্রার এক বিস্তৃত আখ্যান। ইতিহাস ও জনজীবনের মেলবন্ধনে রচিত এই উপন্যাসের জন্য তিনি ১৯৫১ সালে মরণোত্তর রবীন্দ্র পুরস্কারে ভূষিত হন।
এ ছাড়া তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ‘চাঁদের পাহাড়’, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘দৃষ্টিপ্রদীপ’, ‘দেবযান’, ‘মেঘমল্লার’, ‘মৌরীফুল’, ‘অশনি সংকেত’, ‘মরণের ডঙ্কা বাজে’ প্রভৃতি। ‘চাঁদের পাহাড়’ বিশেষভাবে কিশোর-তরুণ পাঠকদের কাছে জনপ্রিয় একটি রোমাঞ্চকর অভিযানমূলক উপন্যাস।
আফ্রিকার দুর্গম অরণ্য ও অজানা জগতের পটভূমিতে রচিত এই উপন্যাস তাঁর কল্পনাশক্তি ও বর্ণনাশৈলীর অনন্য পরিচয় বহন করে। পরবর্তী সময়ে এটি অবলম্বনে চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে।
বিভূতিভূষণের সাহিত্যকর্মে মানুষ ও প্রকৃতি কখনো বিচ্ছিন্ন সত্তা নয়। তাঁর কাছে প্রকৃতি শুধু সৌন্দর্যের আধার নয়, মানুষের অস্তিত্ব, অনুভূতি ও জীবনবোধের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
গাছপালা, নদী, মাঠ, অরণ্য, পাখি, কীটপতঙ্গ—প্রকৃতির প্রতিটি অনুষঙ্গ তাঁর লেখায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ সমাজের কুসংস্কার, শ্রেণিবৈষম্য, দারিদ্র্য, সামাজিক অনাচার ও মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বও তিনি গভীর পর্যবেক্ষণে তুলে ধরেছেন।
তাঁর সাহিত্যদৃষ্টিতে মানবিকতা ছিল সবচেয়ে বড় মূল্যবোধ। তিনি মানুষকে তার শ্রেণি, সামাজিক অবস্থান কিংবা আর্থিক পরিচয়ে বিচার করেননি; বরং মানুষের সহজাত অনুভূতি, ভালোবাসা, মমত্ববোধ ও জীবনসংগ্রামকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর রচনার সাধারণ চরিত্রগুলোও তাই অসাধারণ হয়ে উঠেছে।
সাহিত্যকে তিনি কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; মানুষের কল্পনা, অনুভূতি ও জীবনবোধকে জাগ্রত করার শক্তি হিসেবেও বিবেচনা করেছেন।
ব্যক্তিজীবনে বিভূতিভূষণ ছিলেন অনেকটাই নিভৃতচারী। প্রচার-প্রতিপত্তির আড়ালে থেকেও তিনি সৃষ্টি করে গেছেন বাংলা সাহিত্যের অমর সব সম্পদ। ১৯৫০ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন বিহারের ঘাটশিলায় (বর্তমান ঝাড়খণ্ড) হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ঘাটশিলায় তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটির নাম ‘গৌরীকুঞ্জ’।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন এমন একজন কথাশিল্পী, যিনি প্রকৃতির নিসর্গ সৌন্দর্যের সঙ্গে মানুষের অন্তর্জগতের এক অপূর্ব সেতুবন্ধন রচনা করেছেন। তাঁর সৃষ্ট চরিত্র, গ্রামীণ জীবনচিত্র, প্রকৃতিপ্রেম ও গভীর মানবিক দর্শন আজও পাঠককে নতুন করে ভাবতে শেখায়। সময়ের পরিবর্তনে সমাজ ও সভ্যতা এগিয়ে গেলেও তাঁর সাহিত্যকর্মের আবেদন কখনো ম্লান হওয়ার নয়।
বাংলা কথাসাহিত্যে নিসর্গচেতনা, মানবিকতা ও জীবনবোধের এক অনন্য বাতিঘর হিসেবে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ৭৬তম প্রয়াণবার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।