দেড় দশক পর সরাসরি তালিকাভুক্তির পথ খুলছে পুঁজিবাজারে
দীর্ঘ সাড়ে ১৬ বছর বন্ধ থাকার পর দেশের পুঁজিবাজারে আবারও সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ চালু হচ্ছে। ২০১০ সালে জারি করা এ-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ফলে নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণকারী সরকারি, বেসরকারি, বহুজাতিক ও বড় দেশীয় কোম্পানি প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও ছাড়াই স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হতে পারবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গত সোমবার এক আদেশে ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জারি করা সরাসরি তালিকাভুক্তির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া ওই আদেশে বলা হয়েছে, পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে সরকারি, বেসরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এর আগে গত ১ সেপ্টেম্বর বিএসইসির ১ হাজার ২৭তম কমিশন সভায় ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে সিকিউরিটিজের সরাসরি তালিকাভুক্তি) বিধিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া অনুমোদন করা হয়। পরে খসড়াটি জনমত যাচাইয়ের জন্য প্রকাশ করা হয়।
যেসব কোম্পানি সুযোগ পাবে
খসড়া বিধিমালায় সব কোম্পানির জন্য সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ রাখা হয়নি। নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণকারী বড় ও প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানই এ সুবিধা পাবে।
শতভাগ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি এবং যেসব কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ১০ শতাংশ সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মালিকানায় রয়েছে, তারা সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করতে পারবে। একইভাবে সম্পূর্ণ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানিও এ সুযোগ পাবে।
এ ছাড়া অন্তত ৫০০ কোটি টাকা বার্ষিক লেনদেন বা সম্পদ রয়েছে—এমন বড় দেশীয় কোম্পানি এবং কমপক্ষে ৩০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের বিটিআরসি অনুমোদিত টেলিকম ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো বা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এ ব্যবস্থার আওতায় আসবে। ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট যোগ্যতার শর্ত রাখা হয়েছে।
বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানির ক্ষেত্রে পুঞ্জীভূত লোকসান না থাকা এবং আগের দুই অর্থবছরে পরিচালন কার্যক্রম থেকে ইতিবাচক নগদ প্রবাহ থাকার শর্ত রাখা হয়েছে।
যোগ্য কোম্পানির বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডাররা তাদের হাতে থাকা মোট শেয়ারের ১০ থেকে ২০ শতাংশ বাজারে ছাড়তে পারবেন। এ ক্ষেত্রে কোম্পানি নতুন শেয়ার ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহ করবে না; বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডাররাই তাদের শেয়ার বিক্রি করবেন। ফলে শেয়ার বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ কোম্পানির হিসাবে না গিয়ে সংশ্লিষ্ট শেয়ারহোল্ডারের হিসাবে যাবে।
কারসাজি ঠেকাতে কঠোর শর্ত
দেশে ২০০৬ সালে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ চালু হয়েছিল। তবে ২০১০ সালের শেয়ারবাজার ধসের পর এ পদ্ধতিতে অনিয়ম ও কারসাজির অভিযোগ ওঠে। শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ ও তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়ায় দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ১ ফেব্রুয়ারি বেসরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তি নিষিদ্ধ করা হয়।
নতুন কাঠামোয় আগের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে শেয়ারদর কারসাজির সুযোগ কমাতে বেশ কিছু শর্ত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রেফারেন্স মূল্যের ভিত্তিতে ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ, তালিকাভুক্তির প্রথম ৩০ মিনিটে শুধু ক্রেতাদের দরপ্রস্তাবের সুযোগ এবং প্রথম দুই কার্যদিবসে শেয়ার বিক্রিতে বিধিনিষেধ।
এ ছাড়া প্রথম পাঁচ কার্যদিবসে একক আদেশে সর্বোচ্চ ১ হাজার শেয়ার কেনাবেচার সীমা এবং তালিকাভুক্তির পর এক বছর পর্যন্ত কোম্পানির স্পনসর ও পরিচালকদের বাজার থেকে শেয়ার পুনঃক্রয়ে নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাজারে ভালো কোম্পানি বাড়ানোর প্রত্যাশা
বিএসইসি মনে করছে, যেসব প্রতিষ্ঠানের নতুন করে মূলধন সংগ্রহের প্রয়োজন নেই, কিন্তু বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডাররা তাদের শেয়ার বাজারে বিক্রি করতে চান, তাদের জন্য সরাসরি তালিকাভুক্তির ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। এতে নতুন ও ভালো কোম্পানির অংশগ্রহণ বাড়ার পাশাপাশি পুঁজিবাজার আরও গভীর ও বৈচিত্র্যময় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রচলিত আইপিও প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লাগায় বড় ও প্রতিষ্ঠিত অনেক কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসতে আগ্রহী হয় না। সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ চালু হলে এ বাধা কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তবে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার পর শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ, লেনদেন ও কোম্পানির প্রকাশিত তথ্যের ওপর বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জের নজরদারি কতটা কার্যকর হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।
বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, সরাসরি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে যোগ্যতার মানদণ্ড কঠোর করা হয়েছে। বিশেষ করে বহুজাতিক ও বড় স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনতে সরাসরি তালিকাভুক্তির পাশাপাশি হাইব্রিড পদ্ধতিও চালু করা হচ্ছে। এতে জনগণের কাছে শেয়ার ছাড়ার মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহের পাশাপাশি বিদ্যমান মালিকদের শেয়ার বিক্রির সুযোগ থাকবে।
তিনি আরও জানান, বাজারকে স্বচ্ছ ও আধুনিক করতে ডিজিটাল ও রিয়েল টাইম নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা হবে। ব্রোকারদের ব্যাক অফিস সফটওয়্যার একীভূত করার পাশাপাশি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও বিএসইসির নজরদারিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
মাসুদ খান বলেন, আইপিও অনুমোদনের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে নতুন নিয়মে আবেদন করার তিন মাসের মধ্যে অনুমোদন দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। অতীতে যেখানে আইপিও অনুমোদনে এক থেকে দেড় বছর পর্যন্ত সময় লাগত, নতুন ব্যবস্থায় তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হবে।
এদিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির আবেদনে লিস্টিং ফিতে ৫০ শতাংশ ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে ডিএসই। ডিএসই চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, কোনো প্রতিষ্ঠান ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে ডিরেক্ট লিস্টিং বা আইপিওর জন্য আবেদন করলে তাদের লিস্টিং ফিতে ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হবে।