ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ ফিচার ]
আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস

দীর্ঘায়ুর যুগ: দীর্ঘতর জীবনের জন্য ব্যবস্থাগুলোকে নতুনভাবে ভাবা

ডাঃ এম আর করিম রেজা
প্রকাশিত: ০৯:৪৩, ১ অক্টোবর ২০২৬
দীর্ঘায়ুর যুগ: দীর্ঘতর জীবনের জন্য ব্যবস্থাগুলোকে নতুনভাবে ভাবা
দীর্ঘ জীবন তখনই সত্যিকারের অর্জন, যখন সেই দীর্ঘ জীবনের বছরগুলো শুধু সংখ্যায় নয়—স্বাস্থ্য, স্বাধীনতা, অংশগ্রহণ, নিরাপত্তা ও মর্যাদায়ও সমৃদ্ধ হয়। প্রবীণদের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ তৈরি করা মানে আসলে সমাজের সামগ্রিক ভবিষ্যৎকে আরও মানবিক, নিরাপদ ও মর্যাদ

বিশ্বজুড়ে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। জাতিসংঘের হিসাবে, ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ২০৫০ সালের মধ্যে বর্তমান প্রায় ১২০ কোটি থেকে বেড়ে প্রায় ২১০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে—যা বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।

মানুষের গড় আয়ু আগের তুলনায় বেড়েছে। ফলে শুধু দীর্ঘ জীবন লাভ করাই নয়—জীবনের অতিরিক্ত বছরগুলো যেন সুস্থতা, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, অংশগ্রহণ ও মর্যাদার সঙ্গে কাটানো যায়, সেটিও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

প্রবীণদের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বার্ধক্য সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রতিবছর ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস (International Day of Older Persons) পালিত হয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৯০ সালে দিবসটি ঘোষণা করে এবং ১৯৯১ সাল থেকে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়ে আসছে।

Advertisement
  • জাতিসংঘের আলোচনায় সাধারণত ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষকে প্রবীণ ব্যক্তি (Older Persons) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে দেশ, নীতি ও সামাজিক প্রেক্ষাপটভেদে এই বয়সসীমা ভিন্ন হতে পারে।
  • বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের আয়ু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধু চিকিৎসাসেবা নয়, প্রবীণদের জন্য উপযোগী কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং আজীবন শেখার সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। জাতিসংঘও দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে মর্যাদা, নিরাপত্তা ও নিজের পছন্দ অনুযায়ী জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

 ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য

  • “দীর্ঘায়ুর যুগ: দীর্ঘতর জীবনের জন্য ব্যবস্থাগুলোকে নতুনভাবে ভাবা” (The Age of Longevity: Rethinking Systems for Longer Lives)

২০২৬ সালের এই প্রতিপাদ্য দীর্ঘায়ুর ফলে ব্যক্তি ও সমাজে যে পরিবর্তনগুলো আসছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, আবাসন, কর্মসংস্থান, পেনশনসহ বিভিন্ন ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবার ওপর গুরুত্ব দেয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশেও প্রবীণ মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। জনসংখ্যার এই বয়সগত পরিবর্তন যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে, তেমনি প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, আর্থিক সুরক্ষা, আবাসন, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ও পারিবারিক সহায়তা নিয়ে আরও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবার প্রয়োজন তৈরি করছে।
একসময় উপমহাদেশের পারিবারিক কাঠামোতে প্রবীণ সদস্যদের ছিল সম্মানজনক ও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। তাঁদের জীবনের অভিজ্ঞতা ছিল পরিবারের সম্পদ। বহু প্রজন্মের একসঙ্গে বসবাসও ছিল সামাজিক জীবনের স্বাভাবিক অংশ।

কিন্তু নগরায়ণ, কর্মব্যস্ততা, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং একক পরিবারের বিস্তারের ফলে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে।
এর ফলে অনেক প্রবীণ মানুষ জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে একাকিত্ব, অবহেলা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি হচ্ছেন। কখনো কখনো প্রবীণদের প্রতি নির্যাতন, অবহেলা কিংবা অমানবিক আচরণের ঘটনাও সামনে আসে—যা আমাদের সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

বার্ধক্য কোনো দুর্বলতা নয়
বার্ধক্য কোনো দুর্বলতা নয়; এটি জীবনের একটি স্বাভাবিক পর্যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বয়স্ক মানুষের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা একরকম নয়। একই বয়সেও বিভিন্ন মানুষের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকতে পারে।

  • তাই প্রবীণদের শুধু নির্ভরশীল বা দুর্বল মানুষ হিসেবে দেখার পরিবর্তে তাঁদের বৈচিত্র্য, সক্ষমতা, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি।

 প্রবীণদের জন্য কী প্রয়োজন?
বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য আরও কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে—
🔹 বিস্তৃত ও কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা
🔹 টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পেনশনব্যবস্থা
🔹 সুলভ ও প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা
🔹 নিরাপদ ও উপযোগী আবাসনব্যবস্থা
🔹 প্রয়োজনে দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার সুযোগ
🔹 প্রবীণবান্ধব পরিবহন ও নগরব্যবস্থা
🔹 পরিবার ও সমাজে তাঁদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
🔹 সামাজিক ও নাগরিক কর্মকাণ্ডে তাঁদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা
তবে শুধু সেবা বা আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করাই যথেষ্ট নয়।

প্রবীণদের কেবল “সহায়তা প্রয়োজন এমন মানুষ” হিসেবে নয়, বরং তাঁদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও অবদানকে মূল্য দেওয়া সক্রিয় ও মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে সম্মান করা এবং জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করাও একটি মানবিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

আজকের তরুণরাই আগামী দিনের প্রবীণ

  • আজকের তরুণ প্রজন্মের মানুষই একদিন প্রবীণ হবেন।
  • তাই প্রবীণদের জন্য নিরাপদ, সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা শুধু তাঁদের প্রতি সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি মানবিক ও টেকসই সমাজ গড়ার অংশ।

একটি সমাজের মানবিকতার পরিচয় শুধু তার অর্থনৈতিক উন্নতি কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে নয়; বরং সেই সমাজ তার প্রবীণ মানুষদের কতটা মর্যাদা, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও ভালোবাসা দিয়ে বাঁচতে দেয়, তার মধ্যেও নিহিত।

দীর্ঘ জীবন তখনই সত্যিকারের অর্জন, যখন সেই দীর্ঘ জীবনের বছরগুলো শুধু সংখ্যায় নয়—স্বাস্থ্য, স্বাধীনতা, অংশগ্রহণ, নিরাপত্তা ও মর্যাদায়ও সমৃদ্ধ হয়।
প্রবীণদের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ তৈরি করা মানে আসলে সমাজের সামগ্রিক ভবিষ্যৎকে আরও মানবিক, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলা।

লেখক : ডাঃ এম আর করিম রেজা, চিকিৎসক ও সমাজকর্মী

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!