শিশুর স্থুলতা রোধে পরিবারের ভূমিকা : ৬টি পরামর্শ
শিশুদের অতিরিক্ত ওজন ও স্থুলতার পেছনে শুধু বেশি খাওয়াকে দায়ী করা যায় না। বংশগত বৈশিষ্ট্য, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা, ঘুমের ধরন, পারিবারিক পরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবার সুযোগসহ নানা বিষয় এর সঙ্গে যুক্ত। তাই শিশুকে আলাদাভাবে খাবার নিয়ন্ত্রণ বা ওজন কমানোর পরামর্শ দেওয়ার পরিবর্তে পুরো পরিবারকে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাসে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের ‘শিশুদের স্থুলতা প্রতিরোধে পরিবার যা করতে পারে’ শীর্ষক নির্দেশনায় পরিবারের দৈনন্দিন জীবনে কয়েকটি সহজ পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। এসব অভ্যাস শিশুদের স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন গড়ে তুলতে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।
১. শিশুর সামনে বড়দের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ
.png)
শিশুরা শুধু উপদেশ শুনে শেখে না, তারা বড়দের আচরণও অনুসরণ করে। পরিবারের বড়রা যদি নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাবার খান, শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকেন এবং নিজেদের জীবনযাপনে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস বজায় রাখেন, তাহলে শিশুর জন্যও সেই অভ্যাস তৈরি করা সহজ হয়।
![]()
তাই ‘সবজি খাও’, ‘বাইরে খেলতে যাও’ এ ধরনের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি পরিবারের সবাই মিলে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া ও সক্রিয় থাকার অভ্যাস গড়ে তোলা বেশি কার্যকর হতে পারে।
পরিবারের খাবারের তালিকায় শাকসবজি, ফল, পূর্ণশস্য, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও পর্যাপ্ত প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবার সীমিত করা প্রয়োজন।
২. মিষ্টি পানীয়ের বদলে পানি
শিশুদের খাদ্যাভ্যাসে পানীয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত চিনিযুক্ত কোমল পানীয়, কৃত্রিমভাবে মিষ্টি করা পানীয় কিংবা অতিরিক্ত চিনি মেশানো পানীয় গ্রহণের ফলে খাদ্য থেকে অপ্রয়োজনীয় ক্যালরি গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে।
তাই শিশুদের নিয়মিত পানি পান করার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। ঘরে ও বাইরে পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং চিনিযুক্ত পানীয়ের পরিবর্তে পানি বেছে নেওয়ার অভ্যাস তৈরি করা যেতে পারে।
নিয়মিত চিনিযুক্ত পানীয় গ্রহণের সঙ্গে ওজন বৃদ্ধি, স্থুলতা ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মতো বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
৩. খেলাধুলা হোক প্রতিদিনের অভ্যাস
শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা প্রয়োজন। রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী, ৬ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের প্রতিদিন অন্তত ৬০ মিনিট শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা উচিত।

- হাঁটা, দৌড়ানো, সাইকেল চালানো, সাঁতার, মাঠে খেলাধুলা কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সক্রিয় খেলায় অংশ নেওয়া সবই শারীরিক সক্রিয়তার অংশ হতে পারে।
৩ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় ধরে ব্যায়াম করানোর পরিবর্তে সারা দিনে বিভিন্নভাবে সক্রিয় থাকার সুযোগ তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৪. পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা
শিশুদের স্বাস্থ্যকর ওজন ও সামগ্রিক সুস্থতার সঙ্গে পর্যাপ্ত ঘুমের সম্পর্ক রয়েছে। অপর্যাপ্ত ঘুমের সঙ্গে স্থুলতার ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কম ঘুম শিশুর ক্ষুধা, খাদ্যগ্রহণের ধরন ও শারীরিক সক্রিয়তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো ও জাগার অভ্যাস তৈরি করা প্রয়োজন।
৫. পর্দার সময় কমিয়ে সক্রিয় সময় বাড়ানো
টেলিভিশন দেখা, মুঠোফোন, কম্পিউটার বা বিভিন্ন বৈদ্যুতিন যন্ত্র ব্যবহারে অতিরিক্ত সময় কাটানো শিশুদের শারীরিক সক্রিয়তা কমিয়ে দিতে পারে। এর সঙ্গে ঘুমের সমস্যারও সম্পর্ক রয়েছে।
তাই শিশুর পর্দার সময় বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। এর পরিবর্তে বাইরে খেলাধুলা, হাঁটা, সাইকেল চালানো কিংবা পরিবারের সঙ্গে সক্রিয় সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি করা ভালো।
৬. ‘ডায়েট’ নয়, স্বাস্থ্যকর পারিবারিক পরিবেশ
শিশুর ওজন নিয়ে কথা বলার সময় সতর্ক থাকা প্রয়োজন। শিশুকে ‘মোটা’, ‘বেশি খাচ্ছ’ কিংবা ‘ওজন কমাতে হবে’ এ ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য তার আত্মসম্মান ও খাদ্যাভ্যাসে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
শিশুর ওজন কমানোর পরিবর্তে স্বাস্থ্যকর আচরণ গড়ে তোলাকে গুরুত্ব দেওয়া বেশি কার্যকর। পরিবারে পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং পরিমিত পর্দা ব্যবহারের অভ্যাস তৈরি করা যেতে পারে।
রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের পরিবারভিত্তিক স্বাস্থ্যকর ওজন কর্মসূচিতে ২ থেকে ১৮ বছর বয়সী অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত শিশুদের জন্য পরিবারকে সম্পৃক্ত করে খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা ও আচরণ পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে দীর্ঘমেয়াদি আচরণগত পরিবর্তনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের পরিবারগুলোর জন্যও প্রাসঙ্গিক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে তৈরি হলেও এসব নির্দেশনার মূল বার্তা বাংলাদেশের পরিবারগুলোর জন্যও প্রাসঙ্গিক। শিশুর স্বাস্থ্যকর ওজন নিশ্চিত করতে শুধু তার খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া যথেষ্ট নয়। পরিবারের খাবারের ধরন, দৈনন্দিন শারীরিক সক্রিয়তা, ঘুমের রুটিন এবং পর্দা ব্যবহারের অভ্যাস সবকিছুর দিকে একসঙ্গে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

- বিশেষ করে শিশুকে আলাদা করে কঠোর খাদ্যনিয়ন্ত্রণে রাখার পরিবর্তে পরিবারের সবাই মিলে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত হাঁটা বা খেলাধুলা করা এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।
শিশুর শরীর ও ওজন নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য না করে স্বাস্থ্যকর আচরণকে উৎসাহিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একটি শিশুর স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শুধু খাবারের প্লেটে নয়; পরিবারের প্রতিদিনের জীবনযাপন, আচরণ ও পরিবেশের মধ্য দিয়েও।
স্থুলতা প্রতিরোধ তাই কোনো কঠিন খাদ্যনিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়। বরং এটি পুরো পরিবারের স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।
লেখক : ফিটনেস ও পুষ্টিবিদ রাইসা মেহজাবীন
পিজিটি (Nutrition and Fitness Training), ইন্সপিরন ফিটনেস এন্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টার
স্পেশালাইজড ইন ফিটনেস নিউট্রিশন ট্রেনিং, নিউট্রিশন সলিউশনস
ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ও ফিটনেস কোচ, ইন্সপিরন ফিটনেস এন্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টার, ধানমন্ডি ব্রাঞ্চ
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), নিউট্রিশন ফর চেঞ্জ