জ্বর হতে পারে মানসিক চাপের কারণেও!
জ্বর হলেই সাধারণত আমাদের মনে আসে সংক্রমণ বা কোনো শারীরিক অসুস্থতার কথা। তবে সবসময় জ্বরের পেছনে সংক্রমণ থাকে না। তীব্র মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অস্থিরতার সঙ্গেও শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের অবস্থাকে Psychogenic Fever বা স্ট্রেস-জনিত জ্বর বলা হয়।
মানসিক চাপ থেকে জ্বর হয় কীভাবে?
তীব্র মানসিক চাপের সময় শরীরে ‘স্ট্রেস রেসপন্স’ সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ সময় অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসলের মতো হরমোনের পরিবর্তনের পাশাপাশি স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকলাপও বেড়ে যায়। এর প্রভাবে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে পারে এবং তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা বেড়ে যেতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ, পরীক্ষা বা চাকরির চাপ, পারিবারিক সমস্যা, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা কোনো তীব্র মানসিক ঘটনার পর এমন পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে।
.png)
সাইকোজেনিক ফিভার ও সাধারণ জ্বরের পার্থক্য
- সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৯৭ থেকে ৯৯ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মধ্যে থাকে এবং ১০০ দশমিক ৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি হলে তাকে জ্বর ধরা হয়।
সাধারণ জ্বর: এটি মূলত কোনো ইনফেকশন বা প্রদাহের কারণে হয়। এতে প্যারাসিটামল বা প্রদাহবিরোধী ওষুধ কাজ করে। সাইকোজেনিক ফিভার: এটি মানসিক চাপের সরাসরি বা পরোক্ষ প্রতিক্রিয়ায় ঘটে। অনেক সময় তীব্র দুশ্চিন্তায় শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ ১০৫ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠে যেতে পারে, আবার কারো ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের কাছাকাছি মৃদু জ্বর বজায় থাকতে পারে। তবে এ জ্বরে সাধারণ জ্বর কমানোর ওষুধগুলো তেমন কার্যকর হয় না।
শরীর সুস্থ রাখতে সঠিক পুষ্টিকর খাবার এবং প্রতি রাতে নির্দিষ্ট সময় ঘুমানো জরুরি। বই পড়া, গান শোনা বা প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানো মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
নিয়মিত যোগব্যায়াম ও ধ্যান, দীর্ঘ শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, পেশি শিথিল ব্যায়াম করলে স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণের হার কমে এবং মন মেজাজ ভালো থাকে।
শরীর ও মনের গভীর সম্পর্ক
মানসিক চাপ শুধু মনের ওপর প্রভাব ফেলে না; শরীরের বিভিন্ন স্বাভাবিক কার্যক্রমেও এর প্রভাব পড়ে। ঘুম, হৃদস্পন্দন, হজম, ঘাম এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের মতো শারীরিক প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন ঘটতে পারে।
তাই দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ বা উদ্বেগের সময় বারবার শরীর গরম লাগা কিংবা তাপমাত্রা বেড়ে গেলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে শুরুতেই ধরে নেওয়া উচিত নয় যে এর কারণ শুধু মানসিক চাপ। সম্ভাব্য শারীরিক কারণগুলোও বিবেচনা করা জরুরি।
কী কী উপসর্গ দেখা দিতে পারে?
- তাপমাত্রা বাড়ার পাশাপাশি দেখা দিতে পারে—
👉 মাথাব্যথা
👉 অতিরিক্ত ঘাম
👉 শরীর গরম বা ফ্লাশিং অনুভূত হওয়া
👉 হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া
👉 দুর্বলতা বা ক্লান্তি
👉 অস্থিরতা ও উদ্বেগ
👉 ঘুমের সমস্যা
তবে এসব উপসর্গ শুধু মানসিক চাপের কারণে হয় না। বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
কীভাবে বোঝা যাবে কারণটি মানসিক চাপ?
- Psychogenic fever সাধারণত অন্য সম্ভাব্য শারীরিক কারণ বিবেচনা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর নির্ণয় করা হয়।
জ্বরের সঙ্গে কাশি, গলা ব্যথা, প্রস্রাবে জ্বালা, ডায়রিয়া, তীব্র ব্যথা, ত্বকে সংক্রমণ বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট উপসর্গ থাকলে সংক্রমণসহ অন্যান্য কারণ খুঁজে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে উচ্চমাত্রার বা দীর্ঘস্থায়ী জ্বরকে শুধু মানসিক চাপের কারণে হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
চিকিৎসা কী?
- মূল্যায়নের পর যদি দেখা যায় যে শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে মানসিক চাপের সম্পর্ক রয়েছে, তাহলে শুধু তাপমাত্রা কমানোর ওষুধের ওপর নির্ভর না করে মূল কারণ—অর্থাৎ মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম, নিয়মিত শরীরচর্চা, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম এবং মানসিক চাপের কারণ মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা উপকারী হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ বা মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি?
- জ্বর খুব বেশি হলে, কয়েকদিন ধরে থাকলে, বারবার ফিরে এলে অথবা শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, বিভ্রান্তি, তীব্র ব্যথা, পানিশূন্যতা বা অন্য কোনো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কারণ “মানসিক চাপ থেকেই জ্বর হয়েছে” ধরে নিয়ে অন্য কোনো শারীরিক রোগের চিকিৎসা বিলম্বিত করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
মনে রাখা দরকার, শরীরের তাপমাত্রার পরিবর্তন কখনো কখনো মানসিক চাপেরও প্রকাশ হতে পারে। তবে জ্বর বা তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ নির্ণয়ের সময় সংক্রমণসহ অন্যান্য শারীরিক কারণ যথাযথভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক চাপ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে (ইমিউন সিস্টেম) সাময়িকভাবে দুর্বল করে ফেলে। নিউইয়র্কের ওয়েল কর্নেল মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক ড. আলকা গুপ্তা জানান, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নামিয়ে আনে, ফলে শরীর সহজেই বিভিন্ন ভাইরাস বা অন্যান্য সংক্রমণের শিকার হয় এবং পরোক্ষভাবে জ্বর চলে আসে।
এছাড়া মস্তিষ্কের মেজাজ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী অংশে মানসিক চাপের যে প্রভাব পড়ে, তাও শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে।
লেখক : ডাঃ এম আর করিম রেজা
ত্বক, সৌন্দর্য, সংক্রামক রোগ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।