ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ লাইফস্টাইল ]

 সকালের নাশতায় দীর্ঘায়ুর গোপন রহস্য!

ওয়ারিশা মেহেবুবা
প্রকাশিত: ১১:১৬, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
 সকালের নাশতায় দীর্ঘায়ুর গোপন রহস্য!
দিনের প্রথম ও শেষ খাবার খাওয়ার সময়ের সঙ্গে মানুষের মৃত্যুঝুঁকির সম্পর্ক থাকতে পারে।

দীর্ঘায়ুর গোপন রহস্য লুকিয়ে আছে ব্রেকফাস্টে! সকালের সঠিক খাবারই হতে পারে সকল সমস্যার সমাধান। কেননা আমরা প্রতিদিন সকালে যা খাই, তা কেবল আমাদের খিদে মেটায় তা নয়, আমাদের শরীরের আয়ুও নির্ধারণ করে সকালের খাবার বা নাশতা।

কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী ৩১ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, দিনের প্রথম ও শেষ খাবার খাওয়ার সময়ের সঙ্গে মানুষের মৃত্যুঝুঁকির সম্পর্ক থাকতে পারে। চীনের হুয়াঝং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা গবেষণাটি করেছেন। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ইউরোপিয়ান জার্নাল অব ক্লিনিকাল নিউট্রিশন সাময়িকীতে।

GrandeCentrePoint Ratchadamri | ✨ Start Your Day with Our Breakfast –  Freshly Made, Lovingly Served ✨ Fuel your morning with an International  Breakfast Buffet at Grande... | Instagram

সকালের খাবার যত দেরি, ঝুঁকি তত বেশি

গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের প্রথম খাবার খাওয়ার সময় যত পিছিয়েছে, মৃত্যুঝুঁকিও তত বেড়েছে। যারা সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে প্রথম খাবার খেতেন তাদের সঙ্গে তুলনা করে দেখা যায়, সকাল ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে প্রথম খাবার খেলে যেকোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ১০ শতাংশ বেশি ছিল। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে প্রথম খাবার খেলে ঝুঁকি প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি।

Advertisement

আর দুপুর ১২টার পর প্রথম খাবার খেলে ঝুঁকি প্রায় ২৯ শতাংশ বেশি ছিল। হৃদরোগজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে ওই গবেষণায়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক গবেষণা বলছে, অনিয়মিত জীবনযাপন এবং ভুল খাদ্যাভ্যাসের কারণে আমাদের অজান্তেই শরীরের ভিতরে বাসা বাঁধে এক নীরব ঘাতক, যার নাম ‘ক্রনিক ইনফ্ল্যামেশন’ বা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ। আর এই ঘাতককে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামাটরি ব্রেকফাস্ট (Anti-inflammatory Breakfast)।

১. দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ (Chronic Inflammation) কী? এটি কেন বিপজ্জনক?

আমাদের শরীরে যখন কোনো চোট লাগে বা মশা কামড়ায়, তখন সেই জায়গাটা লাল হয়ে ফুলে ওঠে এবং ব্যথা করে। এটি হলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার (Immune System) একটি স্বাভাবিক লড়াই, যাকে বলে ‘অ্যাকিউট ইনফ্ল্যামেশন’। শরীর ঠিক হয়ে গেলে এই লড়াইও থেমে যায়।

কিন্তু যখন ভুল খাওয়া-দাওয়া, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অনিদ্রা এবং প্রসেসড ফুডের কারণে এই লড়াই শরীরের ভিতরে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কোষে কোষে বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে। তখন তাকে বলে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ বা ক্রনিক ইনফ্ল্যামেশন। বাইরে থেকে এর কোনো লক্ষণ চট করে দেখা যায় না, কিন্তু ভিতরে ভিতরে এটি সুস্থ কোষ, ধমনী এবং অঙ্গগুলিকে ধ্বংস করতে থাকে।

5 Steps to Mindful Eating - Sweat

UCLA Health এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের শীর্ষস্থানীয় জার্নাল Nature Medicine-এর আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের যৌথ গবেষণা জানাচ্ছে, বিশ্বের মোট মৃত্যুর প্রায় ৫০% থেকে ৬০% ঘটনাই ঘটে এই দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের কারণে। হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার এবং ডায়াবেটিসের মতো মারণব্যাধির মূল উৎস আসলে এই ইনফ্ল্যামেশন।

Furman et al. (2019) – Nature Medicine গবেষণাপত্রে বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট দেখিয়েছেন, আমাদের সামাজিক পরিবেশ, মানসিক চাপ, অনিদ্রা এবং আধুনিক লাইফস্টাইল শরীরের কোষে কোষে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ (SCI) তৈরি করে। যা পরবর্তীকালে কার্ডিওভাসকুলার রোগ, ক্যান্সার, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, ক্রনিক কিডনি ডিজিজ এবং অ্যালঝাইমার্সের মতো স্নায়ুরোগের জন্ম দেয়।

জনস হপকিন্স ও হার্ভার্ড হেলথের গবেষকদের মতে, এই প্রদাহ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে শরীরের সুস্থ টিস্যু এবং রক্তনালীকে আক্রমণ করে ধ্বংস করতে শুরু করে।

দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের কারণে কী কী ক্ষতি হয়?

হৃদরোগ: 
রক্তনালীর দেওয়ালে প্রদাহ তৈরি হয়ে কোলেস্টেরল জমে এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে।

টাইপ-২ ডায়াবেটিস: 
এটি শরীরের ইনসুলিন হরমোনের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয় (Insulin Resistance), ফলে রক্তে সুগারের মাত্রা লাগামছাড়া হয়ে যায়।

আর্থ্রাইটিস বা জয়েন্ট পেইন: 
হাড়ের জয়েন্টগুলিতে প্রদাহের কারণে তীব্র ব্যথা এবং বাত উপচে পড়ে।

স্থূলতা ও মেদ বৃদ্ধি: 
প্রদাহ মেটাবলিজম কমিয়ে দেয়, যার ফলে ওজন কমানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

মানসিক ক্লান্তি ও ডিপ্রেশন: 
এটি মস্তিষ্কের কোষকে প্রভাবিত করে মুড সুইং এবং মানসিক অবসাদ তৈরি করে।

২. অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামাটরি ব্রেকফাস্ট

এই প্রাতরাশের মূল মন্ত্র হলো—এমন খাবার খাওয়া যা শরীরের ভিতরের এই প্রদাহকে শান্ত করবে। এর জন্য সকালের খাবারে প্রধানত ৪টি উপাদান থাকা বাধ্যতামূলক:

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং পলিফেনলস: 
এগুলি শরীরের ক্ষতিকর ‘ফ্রি র‍্যাডিক্যালস’ বা বিষাক্ত উপাদান দূর করে কোষকে বুবার্ধক্য থেকে বাঁচায়। টাটকা ও রঙিন ফল এবং শাকসবজি এর প্রধান উৎস।

ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড: 
এটি এক ধরনের স্বাস্থ্যকর চর্বি বা ফ্যাট, যা প্রদাহের বিরুদ্ধে শরীরের সবচেয়ে বড় ঢাল। বিভিন্ন ধরনের বাদাম ও বীজে এটি প্রচুর থাকে।

উচ্চ ফাইবার (Dietary Fiber): 
ফাইবার আমাদের অন্ত্র বা পেটের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। পেট পরিষ্কার থাকলে শরীরের অর্ধেক প্রদাহ এমনিই কমে যায়।

অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামাটরি মশলা: 
রান্নাঘরের দুটি সাধারণ উপাদান—হলুদ ও আদা। হলুদে আছে ‘কারকিউমিন’ এবং আদাতে আছে ‘জিঞ্জারল’, যা পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী প্রাকৃতিক প্রদাহনাশক।

৩.প্রতিদিন এই ব্রেকফাস্ট কেন খাবেন?

দীর্ঘ ৮-১০ ঘণ্টা ঘুমের পর আমাদের শরীর একদম খালি থাকে। এই সময় আপনি যা খাবেন, শরীর তা স্পঞ্জের মতো দ্রুত শুষে নেবে।

গাট-ব্রেইন অ্যাক্সিস (Gut-Brain Axis) উন্নত করে: 
আমাদের পেটের সঙ্গে মস্তিষ্কের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। দই বা প্রোবায়োটিক যুক্ত খাবার পেটে ‘গুড ব্যাকটেরিয়া’ তৈরি করে। এই ব্যাকটেরিয়াগুলি এক ধরনের অ্যাসিড (Short-Chain Fatty Acids) তৈরি করে, যা সরাসরি আমাদের মস্তিস্ককে শান্ত রাখে এবং মন ভালো করে।

রক্তে সুগারের ভারসাম্য: 
সকাল সকাল চিনি বা ময়দার খাবার খেলে রক্তে হুট করে সুগার বেড়ে যায় এবং শরীর ইনসুলিনের মাত্রা প্রচুর বেড়ে যায়, যা প্রদাহের মূল কারণ। ফাইবার ও প্রোটিন সমৃদ্ধ ব্রেকফাস্ট সারাদিন এনার্জি লেভেল একদম স্থির রাখে।

কোষের সুরক্ষা: হলুদে থাকা কারকিউমিন শরীরের ক্ষতিকর প্রদাহ মার্কার (যেমন- CRP, IL-6) গুলির মাত্রা রক্তে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে।

৪. ৫টি সহজ ব্রেকফাস্ট রেসিপি

আমাদের হাতের কাছে পাওয়া যায় এমন উপাদান দিয়েই এই ব্রেকফাস্টগুলি অত্যন্ত সুস্বাদুভাবে তৈরি করা সম্ভব:

১. ওটস ও বাদামের পোরিজ

উপকরণ: 
রোলড ওটস ১ কাপ, দুধ বা আমন্ড মিল্ক, এক চিমটি কাঁচা হলুদ বা হলুদ গুঁড়ো, সামান্য আদা কুচি, ১টি পাকা কলা বা বেরি (স্ট্রবেরি/ব্লুবেরি), ১ চামচ চিয়া সিড এবং কয়েকটি আখরোট বা কাঠবাদাম।

কীভাবে বানাবেন: 
ওটস সামান্য জল বা দুধে ফুটিয়ে সেদ্ধ করে নিন। নামানোর আগে হলুদ ও আদা মেশান। এবার একটি বাটিতে নামিয়ে উপর থেকে ফল, চিয়া সিড এবং বাদাম কুচি ছড়িয়ে দিন।

ওটসে ‘আভেনানথ্রামাইডস’ নামক বিশেষ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা ধমনীর প্রদাহ কমায়।

২. প্রো-বায়োটিক ইয়োগার্ট বোল

উপকরণ: ১ বাটি ঘরে পাতা জল ঝরানো টক দই বা গ্রিক ইয়োগার্ট, মরশুমী ফল (আম, পেয়ারা, আপেল বা স্ট্রবেরি কুচি), ১ চামচ গুঁড়ো করা ফ্ল্যাক্সসিড (তিসি বীজ) এবং সামান্য আমন্ড বাদাম।

কীভাবে বানাবেন: দইয়ের উপর ফলের টুকরোগুলি সাজিয়ে দিন। উপর থেকে ফ্ল্যাক্সসিড এবং বাদাম ছড়িয়ে হালকা মিশিয়ে নিলেই তৈরি।

দইয়ের প্রোবায়োটিক এবং ফলের ফাইবারের যুগলবন্দী পেটকে ভিতর থেকে ঠান্ডা রাখে।

৩. পালং বা মেথির পুষ্টিকর পরোটা

উপকরণ: হোল গ্রেইন আটা বা মাল্টিগ্রেইন আটা, এক মুঠো পালং শাক বা মেথি শাক বাটা, সামান্য কাঁচা লঙ্কা ও আদা বাটা, এক চিমটি হলুদ এবং পাশে খাওয়ার জন্য এক বাটি টক দই।

কীভাবে বানাবেন: আটার সঙ্গে শাক বাটা, হলুদ ও মশলা দিয়ে ভালো করে মেখে নিন। এবার খুব সামান্য অলিভ অয়েল বা রাইস ব্র্যান অয়েল দিয়ে এপিঠ-ওপিঠ হালকা করে সেঁকে নিন।

Should you eat breakfast? (And what really breaks the fast) – Designer  Wellness
সবুজ শাকে থাকা ভিটামিন K এবং উদ্ভিজ্জ পুষ্টি উপাদান শরীরের হাড় ও জয়েন্টের প্রদাহ দ্রুত কমায়।

৪. রাগি বা জোয়ারের সবজি খিচুড়ি

উপকরণ: রাগি বা জোয়ারের দানা (অথবা ভাঙা গমের ডালিয়া), কুচানো গাজর, বিনস, মটরশুঁটি, পালং শাক, আদা-হলুদ বাটা, সামান্য সরষের তেল ও কালোজিরে।

কীভাবে বানাবেন: কড়াইতে সামান্য সরষের তেল দিয়ে কালোজিরে ফোড়ন দিন। সবজি ও আদা-হলুদ দিয়ে হালকা নেড়ে রাগি বা ডালিয়া ও জল দিয়ে প্রেসার কুকারে ২-৩টি সিটি দিয়ে নামিয়ে নিন।

এটি একটি লো-গ্লাইসেমিক ইনডেক্স খাবার, যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরিয়ে রাখে এবং ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য অমৃত।

৫. ওভারনাইট চিয়া পুডিং

উপকরণ: ৩ চামচ চিয়া সিড, ১ কাপ দুধ, সামান্য দারচিনি গুঁড়ো, ১ চামচ মধু বা খেজুরের রস, এবং পছন্দের ফল।

কীভাবে বানাবেন: রাতে শোওয়ার আগে একটি পাত্রে চিয়া সিড, দুধ এবং দারচিনি গুঁড়ো একসঙ্গে মিশিয়ে ফ্রিজে রেখে দিন। সকালে চিয়া সিড ফুলে জেলের মতো হয়ে যাবে। এর উপর ফল মিশিয়ে ঠান্ডা ঠান্ডা খান।


চিয়া সিড ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডে ঠাসা, যা রক্তনালীকে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।

এছাড়া ঘুম থেকে উঠে এক গ্লাস হালকা গরম জলে লেবুর রস, এক চিমটি হলুদ গুঁড়ো এবং অবশ্যই এক চিমটি কালো গোলমরিচ গুঁড়ো মিশিয়ে খান। গোলমরিচে থাকা ‘পাইপারিন’ হলুদের ‘কারকিউমিন’কে শরীরে শুষে নিতে প্রায় ২০০০% বেশি সাহায্য করে। গোলমরিচ ছাড়া হলুদ খেলে তার পুষ্টিগুণ শরীর পুরোপুরি পায় না।

চায়ের বদল: 
সকালের চিনি-দুধের চা বা কফি শরীরের প্রদাহ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর বদলে গ্রিন টি, ম্যাচা টি বা আদা-হলুদ-দারচিনি ফোটানো ভেষজ জল পানের অভ্যেস করুন।

প্লেট থেকে যা আজই বাদ দেবেন: 
ময়দার লুচি, পরোটা, সাদা ব্রেড, দোকানের প্যাকেটজাত ফলের রস, অতিরিক্ত চিনি দেওয়া কর্নফ্লেক্স বা সিরিয়াল এবং প্রক্রিয়াজাত মাংস (সসেজ বা সালামি)।

inscript.me এবং হেলথ সায়েন্স অবলম্বনে ওয়ারিশা

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস এম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!