বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যবান হওয়ার রহস্য লুকিয়ে থাকে মূলত অন্ত্রে। সাধারণত, খাদ্য পরিপাকনালীর ভেতর দিয়ে যেতে ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা সময় নেয়। এটি নির্ভর করে খাদ্যের ধরন ও পরিমাণের ওপর। আমরা কী খাচ্ছি তার ওপরও নির্ভর করে হজমের হার। যেমন, প্রোটিন ও স্নেহপদার্থ থাকার কারণে মাংস-মাছ পুরোপুরি হজম হতে দুদিন লেগে যায়। অপরদিকে, অত্যধিক আঁশজাতীয় খাদ্য, যেমন- সবজি, ফলমূল হজম হতে একদিনেরও কম সময় লাগে।
কোনো কিছু খাওয়ার পর তা হজমের প্রভাব সুস্বাস্থ্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই সঠিক সময়ে সঠিক খাবারটি বাছাই করা এবং খাবারের কার্যকারিতা জানা অত্যন্ত জরুরী।
.png)
হজম প্রক্রিয়ার ৫টি ধাপ
খাবার মুখ থেকে শুরু করে শরীর থেকে নিষ্কাশিত হওয়া পর্যন্ত পাঁচটি প্রধান ধাপ অতিক্রম করে:
১. গ্রহণ: মুখগহ্বরে লালার মাধ্যমে কার্বোহাইড্রেট ভাঙার কাজ শুরু হয়।
২. খাদ্যনালী: চিবানো খাবারটি মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে খাদ্যনালীর মাধ্যমে পাকস্থলীতে পৌঁছায়।
৩. পাকস্থলী: এখানে খাবার গ্যাস্ট্রিক জুস এবং এনজাইমের সাথে মিশে ২ থেকে ৪ ঘণ্টা অবস্থান করে আধা-তরল অবস্থায় পরিণত হয়।
৪. ক্ষুদ্রান্ত্র: এটি পুষ্টি শোষণের প্রধান জায়গা, যেখানে খাবার ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা থাকে এবং রক্তে প্রোটিন, ফ্যাট ও কার্বোহাইড্রেট শোষিত হয়।
৫. বৃহদান্ত্র: অবশিষ্টাংশ এখানে ১২ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত থাকতে পারে, যেখানে পানি শোষিত হয়ে মল তৈরি হয়।
হজমে কত সময় লাগে?
সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, পুরো পরিপাক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে একেক জনের একেক রকম সময় লাগে। সাধারণত পাকস্থলী খালি হতে ৩ দশমিক ৩ থেকে ৭ ঘণ্টা, ক্ষুদ্রান্ত্র অতিক্রম করতে ৩ দশমিক ৩ থেকে ৭ ঘণ্টা এবং বৃহদান্ত্রে ১৫ দশমিক ৯ থেকে ২৮ দশমিক ৯ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে মোট ২৩ থেকে ৩৭ দশমিক ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় নিতে পারে।
দ্রুত হজমযোগ্য খাবার
আপনি যদি দ্রুত হজমযোগ্য খাবার খান, তাহলে দেখবেন আপনার যতটা প্রয়োজন তার থেকে বেশি খাবার খাচ্ছেন। কারণ, সেগুলো খাওয়ার পর দ্রুত হজম হয়ে যায় এবং পুনরায় ক্ষুধা অনুভূত হয়। এই ধরনের খাবার আপনাকে দ্রুত শক্তির জোগান দেয় ঠিকই, পাশাপাশি গ্লুকোজের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। আর এই গ্লুকোজ যদি সবটা ব্যবহৃত না হয়, তাহলে তা চর্বিতে পরিণত হয়।
ধীরে হজম হওয়া খাবার
ধীরে হজম হওয়া খাবার আপনার রক্তে শর্করার পরিমাণ অনেকটাই ধীরে গতিতে বাড়ায়, সুস্থিত ও ভারসাম্যপূর্ণ শক্তি প্রদান করে। কিন্তু, যদি আপনি শুধু ধীর গতির হজমের খাদ্য গ্রহণ করেন, তাহলে আপনার হজমযন্ত্রকে সব সময় সর্বোচ্চ কর্মতৎপরতায় ব্যস্ত করে তুলবেন এবং এটি আপনার দেহের জন্যে যথেষ্ট কঠিন হবে।
মানুষের দেহে বিভিন্ন ধরনের খাবার হজম হতে বিভিন্ন ধরনের সময় নেয়। কিছু খাবার হজম হতে বেশি সময় লাগে আবার কিছু খাবার কয়েক মিনিটেই হজম হয়ে যায়।
আসুন জেনে নিই, কোন খাবার হজম হতে কত সময় লাগে এবং কখন খাওয়া ভালো:
পানি সঙ্গে সঙ্গেই শোষিত হয় (০–১০ মিনিট)। খালি পেটে সকালে পানি খাওয়া সবচেয়ে উপকারী।
পানিসমৃদ্ধ ফল (তরমুজ, বাঙ্গি, আঙুর) ২০–৩০ মিনিটে হজম হয়। খালি পেটে বা খাবারের মাঝে খান।
অম্লীয় ফল (কমলা, আনারস, কিউই) ৩০–৪০ মিনিটে হজম হয়। সকালে বা স্ন্যাক্স টাইমে ভালো, তবে খাবারের পরপর খেলে গ্যাস হতে পারে।
আপেল, নাশপাতি, পেঁপে ৪০–৫০ মিনিটে হজম হয়। খালি পেটে বা খাবারের মাঝে খেলে ভালো।
কাঁচা শাকসবজি (শসা, গাজর, সালাদ) ৩০–৪০ মিনিটে হজম হয়। দুপুর বা রাতের খাবারের আগে খেলে উপকারি।
রান্না করা সবজি ৪০–৫০ মিনিট লাগে। দুপুর বা রাতে খাওয়া যায়।
ভাত, রুটি, আলু প্রায় ১.৫–২ ঘণ্টা লাগে। দুপুর বা রাতে ভালো।
ডাল, ছোলা, সয়াবিন ২–৩ ঘণ্টা লাগে। দুপুর বা বিকেলের দিকে খেলে হজম সহজ হয়।
দুধ ও দই ৩-৪ ঘণ্টা লাগে। সকালে বা রাতে খাওয়া ভালো।
সেদ্ধ ডিম ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট লাগে, ভাজা ডিমে সময় বেশি লাগে। সকাল বা দুপুরে ভালো।
মাছ ১ ঘণ্টায় হজম হয়। দুপুর বা রাতে উপযোগী।
মুরগি ২-৩ ঘণ্টা লাগে। দুপুর বা রাতে ভালো।
গরু/খাসি মাংস ৩–৪ ঘণ্টা লাগে। দুপুরে খাওয়া উত্তম, রাতে খেলে হজম ধীর হয়।
বাদাম ও বীজ ২–৩ ঘণ্টা লাগে। সকালে বা বিকেলে স্ন্যাক্স হিসেবে ভালো।
ফাস্টফুড ও তেলেভাজা ৩–৪+ ঘণ্টা লাগে। যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন।
আরো কিছু - সেদ্ধ আলু হজম হতে সময় নেয় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। মুরগির মাংস হজম হতে লাগে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। সহজেই হজম হয় সেদ্ধ ডিম। ডিমের কুসুম ৩০ মিনিটে আর সাদা অংশ ৪৫ মিনিটে হজম হয়। কাঁচা ফল ও সবজি মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটের ভেতরেই হজম হয়ে যায়।
রান্না করা সবজি হজম হতে সময় লাগে ৪০ মিনিট। বাদাম হজম হতে সময় লাগে অন্তত তিন ঘণ্টা। এ কারণে বাদাম খেলে অনেকক্ষণ খিদে পায় না। গরুর মাংস হজম হতেও লাগে তিন ঘণ্টা। দুগ্ধজাত খাবার, যেমন দই, পনির ইত্যাদি হজম হতে ১২০ মিনিট বা ২ ঘণ্টার মতো লাগে। ৩০ থেকে ৬০ মিনিটে চিনি হজম হয়ে যায়।
টিপস:
ফল সবসময় খালি পেটে বা খাবারের অন্তত ১ ঘণ্টা আগে খান। দুপুরে ভারী খাবার, রাতে হালকা খাবার রাখুন। পানি খাবারের ঠিক আগে বা ৩০ মিনিট পরে পান করুন।
পুষ্টিবিদদের মতে, দিনের প্রথম ভাগে ভারী খাবার খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য বেশি উপকারী। এছাড়া রাতে দ্রুত রাতের খাবার শেষ করা এবং হালকা খাবার গ্রহণ করলে হজম সংক্রান্ত সমস্যা ও অকাল সুগার নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। সঠিক হজম প্রক্রিয়া কেবল পেটের শান্তি নয়, বরং স্থূলতা ও জীবনযাত্রার নানা রোগ প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পুনশ্চ : খাবার কতক্ষণে হজম হবে এটা বংশগত কারণ, জীবনযাপনের পদ্ধতি (হাঁটাহাঁটি, ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম কতটা করেন) ও স্বাস্থ্যের অবস্থার ওপরেও নির্ভর করে।
সূত্র: হেলথ লাইন ডটকম