ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ জাতীয় ]

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে প্রস্তুত ফ্রান্স

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩:০১, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে প্রস্তুত ফ্রান্স
সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করতে ফ্রান্স প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন দেশটির রাষ্ট্রদূত জঁ-মার্ক সেরে-শার্লে। তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বহুপক্ষীয়তা ও সহযোগিতার মতো অভিন্ন মূল্যবোধের ভিত্তিতে অর্থনীতি, জলবায়ু, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও রাজনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

মঙ্গলবার ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) আয়োজিত ‘ডিক্যাব টক’ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

Advertisement

অনুষ্ঠানের শুরুতে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য ডিক্যাবের নেতৃবৃন্দকে ধন্যবাদ জানান ফরাসি রাষ্ট্রদূত। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ডিক্যাব বাংলাদেশের অন্যতম পুরোনো সাংবাদিক সংগঠন হিসেবে কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি সংগঠনটির কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেন।

বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতি আগের তুলনায় বেশি বিশৃঙ্খল, ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন জঁ-মার্ক সেরে-শার্লে। তাঁর মতে, বিভিন্ন দেশের মধ্যে সংঘাত অনেক ক্ষেত্রে যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে উঠছে এবং সহযোগিতার পরিসর সংকুচিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিশ্ব বর্তমানে বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ ও সংঘাতের বিস্তার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে বলপ্রয়োগের প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

এ অবস্থায় ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। ১৯৫০ সালে তৎকালীন ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট শুম্যানের উপস্থাপিত ধারণা পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় একীকরণের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে বলেও জানান রাষ্ট্রদূত।

রাষ্ট্রদূত বলেন, ইউরোপীয় প্রকল্পে সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে—এমন মত প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁও দিয়েছেন। তবে তাঁর মতে, ইউরোপীয় একীকরণের মূল লক্ষ্য সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাওয়া।

মধ্যপ্রাচ্য প্রসঙ্গে জঁ-মার্ক সেরে-শার্লে বলেন, ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতির ঘোষণা দেন। সৌদি আরবের সঙ্গে সহসভাপতিত্বে দ্বিরাষ্ট্র সমাধান নিয়ে আয়োজিত সম্মেলনের প্রেক্ষাপটে ফ্রান্স এ সিদ্ধান্ত নেয় বলে জানান তিনি।

ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির লক্ষ্য হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিপ্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়া, ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি ফ্রান্সের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার কথা বলেন রাষ্ট্রদূত।

বাংলাদেশকে ফ্রান্সের দীর্ঘদিনের, নির্ভরযোগ্য ও অনুমানযোগ্য অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতা, বহুপক্ষীয়তা ও শান্তিপূর্ণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দুই দেশের মূল্যবোধের মিল রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন।

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ফ্রান্সের অবস্থান তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার মধ্যে ফ্রান্স বহুপক্ষীয় ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানকে গুরুত্ব দেয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যাতে নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে পারে, সে বিষয়েও ফ্রান্স গুরুত্ব দেয় বলে জানান তিনি।

ভারত মহাসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও নৌ চলাচলের স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে অবৈধ মাছ ধরা, জলদস্যুতা ও পাচারের মতো নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলেন তিনি।

বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে গতিশীল উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ সাড়ে চার বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়েছে। তবে বাণিজ্যে কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। ফ্রান্সের বাংলাদেশ থেকে আমদানির প্রায় ৯৫ শতাংশই টেক্সটাইল, বিশেষ করে পোশাক ও পরিধেয় পণ্য থেকে আসে বলে জানান তিনি।

এ ছাড়া বিমান চলাচল, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। পরিবহন, জ্বালানি ও টেকসই নগর উন্নয়নেও ফরাসি শিল্পগোষ্ঠীগুলোর সম্পৃক্ততার কথা তুলে ধরেন তিনি।

ভবিষ্যতে ফার্মাসিউটিক্যালস, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির মতো খাতে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বৈচিত্র্যময় করার সুযোগ রয়েছে বলেও জানান ফরাসি রাষ্ট্রদূত।

জলবায়ু সহযোগিতার বিষয়ে তিনি বলেন, ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তির অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে ফ্রান্স পরিবেশগত সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের সঙ্গে অভিযোজন, টেকসই অবকাঠামো ও দুর্যোগঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

রাষ্ট্রদূতের ভাষ্য অনুযায়ী, ফরাসি উন্নয়ন সংস্থার তহবিলের ৮০ শতাংশের বেশি জলবায়ু সহনশীলতা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশে টেকসই অবকাঠামো ও সবুজ অভিযোজন উদ্যোগেও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্তরণ এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়াতেও ফ্রান্স সহযোগিতা করছে বলে জানান জঁ-মার্ক সেরে-শার্লে।

নারীর অধিকার ও জেন্ডার সমতার ক্ষেত্রেও ফ্রান্সের নীতির কথা তুলে ধরেন তিনি। ২০২৫-২০৩০ মেয়াদের কৌশলে শিক্ষা, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও প্রজনন অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান রাষ্ট্রদূত।

সবশেষে বাংলাদেশ-ফ্রান্স সম্পর্ক আরও গভীর করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অভিন্ন মূল্যবোধ ও শান্তিপূর্ণ সম্পর্কের পক্ষে থাকা দেশগুলোর আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আরও বাড়াতে ফ্রান্স প্রস্তুত এবং দুই দেশের সম্পর্কের অর্থনীতি ও ব্যবসায়ও বড় সম্ভাবনা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এম ইউ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!