ঢাকা,  সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ জাতীয় ]

ওএমএসে কমছে চাল-আটার বরাদ্দ, খাদ্যনিরাপত্তায় শঙ্কা

বায়েজীদ মুন্সী বায়েজীদ মুন্সী
প্রকাশিত: ২০:৫১, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
ওএমএসে কমছে চাল-আটার বরাদ্দ, খাদ্যনিরাপত্তায় শঙ্কা
ছবি সংগৃহীত

চারদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কশাঘাত আর নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাস—এটাই বর্তমান বাজার অর্থনীতির নির্মম চিত্র। চাল, ডাল, তেল ও লবণ থেকে শুরু করে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। ঠিক এমন এক সংকটময় মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় সহায়তার প্রধান স্তম্ভ—ওপেন মার্কেট সেল বা ওএমএস কার্যক্রমের আওতায় চাল ও আটা বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা এবং ভর্তুকি বরাদ্দ হ্রাসের সিদ্ধান্ত জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। মূল্যস্ফীতির এই বাজারে এ ধরনের সিদ্ধান্ত দেশের কোটি কোটি নিম্ন আয়ের এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির থালায় এক প্রকার অশনি সংকেত হয়ে দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, সম্প্রতি খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্যে চলতি অর্থবছরে ওএমএসে চাল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৪০ হাজার টন এবং আটা ৩ লাখ ৫০ হাজার টন নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ এর আগের অর্থবছরে বিক্রি হয়েছিল ৩ লাখ ৪ হাজার টন চাল ও ৩ লাখ ৪৯ হাজার টন আটা। সে হিসেবে সম্মিলিতভাবে বরাদ্দের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার টন কমেছে। অর্থাৎ চালের বরাদ্দ কমানো হয়েছে প্রায় ২১ শতাংশ।

এছাড়া ওএমএসের ভর্তুকি বরাদ্দ ৪ হাজার ৯৬ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৩ হাজার ৪১১ কোটি টাকায় নামানো হয়েছে, যা প্রায় ১৭ শতাংশ কম। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে খাদ্য খাতে মোট ভর্তুকি ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা, যা এর আগের বছর ছিল ৮ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা।

ওএমএস মূলত শহরাঞ্চলের নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পরিচালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কার্যক্রম, যদিও শহরের দরিদ্রদের জন্য প্রাপ্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সংখ্যা এমনিতেই সীমিত। সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০২২ ও সংশ্লিষ্ট গবেষণা অনুযায়ী, নগরে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ২০১০ সালের ৭৪ লাখ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ৭৯ লাখে এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৩৩ লাখ থেকে বেড়ে ১ কোটি ৫৩ লাখে দাঁড়িয়েছে। দেশের অতিদরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেকই কোনো সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা পায় না; আর শহরাঞ্চলে এই হার প্রায় ৬৪ শতাংশ।

শহরের রিকশাচালক, দিনমজুর, ছোট চাকরিজীবী কিংবা গ্রামের প্রান্তিক কৃষক—সবারই সংসার চালাতে গিয়ে নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম হয়েছে। বাজারে গিয়ে চালের বস্তা বা তেলের বোতল কেনার সময় তাদের হিসাবের খাতা ছোট হয়ে আসে। পুষ্টির কথা তো দূরে থাক, অনেক পরিবার এখন দুই বেলা দু’মুঠো ভাত জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওএমএসে চালের কেজি ৩০ টাকা, যেখানে বাজারে মোটা চাল ৫০-৫৫ টাকা এবং মাঝারি চাল ৫৬-৬৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ওএমএসের সুবিধা না পেলে একটি পরিবারকে কেজিপ্রতি অন্তত ২০ থেকে ২৫ টাকা বেশি ব্যয় করতে হবে। কমানো ৬৪ হাজার টন চালের হিসাব ধরলে উপকারভোগী পরিবারগুলোর সম্মিলিত বাড়তি ব্যয় হবে আনুমানিক ১২৮ থেকে ১৬০ কোটি টাকা; আর আটার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে এই অঙ্ক আরও অনেক বেশি হবে।

এই বাস্তবতায় সরকারি সহায়তা বা ভর্তুকি বাড়ানো তো দূরের কথা, উল্টো তা কমানো বা সংকুচিত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের পিঠ দেওয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, সাধারণ মানুষের কাছে ওএমএস মানেই স্বস্তির আরেক নাম। খোলাবাজারে কম মূল্যে চাল ও আটা বিক্রির এই কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে শহরাঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার বড় ভরসা হয়ে আসছিল। তবে সরকারের এই সংকুচিত নীতি নিম্ন আয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের দুর্ভোগ এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

এ বিষয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম মাসুদ বলেন, বর্তমান সময়ে ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সীমিত সামাজিক সুরক্ষার প্রেক্ষাপটে সরকারের এই সিদ্ধান্ত নগরের নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও পুষ্টি অধিকারকে আরও বেশি সংকটাপন্ন করে তুলতে পারে। সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবে যেখানে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর কথা, সেখানে চাল-আটার বরাদ্দ ও ভর্তুকি কমানো হঠকারী সিদ্ধান্ত।

এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় ওএমএস কর্মসূচির বরাদ্দ অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করা, কর্মসূচির আওতা ও পরিসর আরও সম্প্রসারণ করা, বিতরণ ব্যবস্থায় পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং অধিকারভিত্তিক নগর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা জরুরি। পাশাপাশি, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে দেশের প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের নীতিনির্ধারক মহলকে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে মনে করেন নুরুল আলম মাসুদ। 

তবে এ বিষয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওএমএস বরাদ্দের সিদ্ধান্তটি এখনও চূড়ান্ত নয় এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত বরাদ্দের তহবিল সরকারের হাতে রয়েছে।
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/বিএম/এসআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!