ইতিহাসের সবচেয়ে উচ্চ-রেজোলিউশনের ছবিতে প্রথমবারের মতো সূর্যের দৃশ্যমান পৃষ্ঠে ঘূর্ণাবর্ত (ভর্টেক্স) আকৃতির অতিক্ষুদ্র গঠন শনাক্ত করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সৌর টেলিস্কোপে ধারণ করা এসব ছবিতে সূর্যের উত্তপ্ত প্লাজমার এমন সূক্ষ্ম ঘূর্ণি ও অস্থিরতা ধরা পড়েছে, যা আগে কখনো এত বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। বিজ্ঞানীদের মতে, এই আবিষ্কার সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্র, শক্তি সঞ্চালনের প্রক্রিয়া এবং সৌর বিস্ফোরণের উৎপত্তি সম্পর্কে নতুন ধারণা দিতে পারে।
বুধবার আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারে প্রকাশিত গবেষণায় এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সোলার অবজারভেটরি, ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা।
.png)
গবেষণায় ব্যবহৃত ছবিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়ে অবস্থিত ড্যানিয়েল কে. ইনোউয়ে সোলার টেলিস্কোপ দিয়ে ধারণ করা হয়। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এই সৌর টেলিস্কোপ সূর্যের দৃশ্যমান পৃষ্ঠ বা ফটোস্ফিয়ারের অত্যন্ত সূক্ষ্ম অংশ পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম। সূর্যের ব্যাস প্রায় ১৪ লাখ কিলোমিটার হলেও গবেষণায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে মাত্র প্রায় ১০০ কিলোমিটার পুরু এই স্তরের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গঠন।
স্থিরচিত্র ও টাইম-ল্যাপস ভিডিওতে দেখা গেছে, সূর্যের অতিউত্তপ্ত প্লাজমার মধ্যে ক্রমাগত সৃষ্টি হচ্ছে ছোট ছোট ঘূর্ণাবর্ত। এগুলোর ব্যাস প্রায় ১৯ থেকে ১৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত। মানুষের হিসেবে বিশাল মনে হলেও সূর্যের মতো নক্ষত্রের তুলনায় এগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র।

গবেষণার সহ-প্রধান লেখক, ন্যাশনাল সোলার অবজারভেটরির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. ফ্রিডরিখ ভ্যোগার বলেন, প্রথমবারের মতো কোনো নক্ষত্রের পৃষ্ঠে কেলভিন-হেলমহোল্টজ অস্থিতিশীলতা প্রত্যক্ষভাবে শনাক্ত করা গেছে। ভিন্ন গতিতে চলা দুটি প্লাজমা স্তরের পারস্পরিক ক্রিয়ার ফলে এ ধরনের ঘূর্ণি তৈরি হয়। তিনি বলেন, অনেকটা বাতাসের প্রভাবে হ্রদ বা সমুদ্রের পানিতে ঢেউ ও ঘূর্ণি তৈরির মতোই এই প্রক্রিয়া কাজ করে।
ড. ভ্যোগার আরও বলেন, পৃথিবীতেও বিরলভাবে এ ধরনের মেঘের গঠন দেখা যায়। বৃহস্পতি ও শনির বায়ুমণ্ডলেও এমন ঘূর্ণির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তবে সূর্যের ক্ষেত্রে পার্থক্য হলো, এখানে কয়েক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্লাজমা শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে প্রবাহিত হয়, যা এই অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে সহায়তা করে।
গবেষণার আরেক সহ-প্রধান লেখক ড. ডেভিড কুরিদজে বলেন, সূর্য ও সূর্যের মতো নক্ষত্র অত্যন্ত গতিশীল। সেখানে প্রায়ই বিস্ফোরণ ও শক্তিশালী চৌম্বকীয় ঘটনা ঘটে। কিন্তু এসব বিস্ফোরণের সূচনা কীভাবে হয়, তা এখনো সৌর পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম বড় প্রশ্ন। নতুন এই আবিষ্কার সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষকদের মতে, এই ঘূর্ণিগুলো সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্রকে পাকিয়ে বিপুল পরিমাণ শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। পরে সেই শক্তি হঠাৎ মুক্ত হয়ে সৌর শিখা কিংবা করোনাল মাস ইজেকশনের মতো শক্তিশালী বিস্ফোরণের জন্ম দিতে পারে। এসব ঘটনার প্রভাবে পৃথিবীর কৃত্রিম উপগ্রহ, জিপিএস, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কে বিঘ্ন ঘটতে পারে।
ড. ভ্যোগার নতুন এই আবিষ্কারকে সৌর পদার্থবিজ্ঞানের জন্য ‘একটি যুগান্তকারী অগ্রগতি’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, এটি সূর্যের বায়ুমণ্ডল কীভাবে শক্তি অর্জন করে, তা বোঝার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা করেছে।
গবেষকদের দৃষ্টি কেড়েছে নতুন ছবিগুলোর নান্দনিক সৌন্দর্যও। তাদের মতে, সূর্যের পৃষ্ঠের এই ঘূর্ণিগুলো অনেকটা ডাচ চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘দ্য স্টারি নাইট’ -এর আকাশের ঘূর্ণির মতো। একই সঙ্গে জাপানি শিল্পী হোকুসাইয়ের বিখ্যাত উডব্লক প্রিন্ট ‘দ্য গ্রেট ওয়েভ অফ কানাগাওয়া’ -এর ঢেউয়ের বাঁকানো আকৃতির সঙ্গেও এর বিস্ময়কর মিল রয়েছে।
বিজ্ঞানীদের আশা, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সৌর টেলিস্কোপের মাধ্যমে ভবিষ্যতে সূর্যের আরও সূক্ষ্ম গঠন ও আচরণ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এর ফলে সৌর ঝড়ের পূর্বাভাস আরও নির্ভুল হবে এবং পৃথিবীর প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো সুরক্ষায় নতুন সুযোগ তৈরি হবে।