পাচারকারীদের কাছ থেকে উদ্ধার করা দুটি চীনা বনরুইকে আবারও বনে ছেড়ে দিয়ে তাদের গতিবিধি, আচরণ ও বেঁচে থাকার সক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করছেন বিজ্ঞানীরা। মৌলভীবাজারের লাওয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে চলছে এ গবেষণা।
বন্যপ্রাণী পাচারের কারণে বিশ্বজুড়ে সংকটাপন্ন হয়ে পড়া চীনা বনরুইয়ের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে উদ্ধার করা বনরুইগুলোকে বনে ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের ওপর গবেষণা চালিয়ে প্রজাতিটির সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
.png)
পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মঙ্গাবেই বলছে, চীনা বনরুইয়ের শরীর শক্ত আঁশে আবৃত। লম্বাটে মুখ ও শরীরের প্রায় সমান দৈর্ঘ্যের আঠালো জিহ্বা দিয়ে মাটির নিচে থাকা পিঁপড়া ও উইপোকার বাসা থেকে খাবার সংগ্রহ করে প্রাণীটি। দিনের বড় একটি সময় তারা মাটিতে খোঁড়া গর্তে কাটায়।
তবে বিশ্বের পরিচিত আট প্রজাতির বনরুইয়ের মতো চীনা বনরুইও বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পাচার হওয়া স্তন্যপায়ী প্রাণীদের একটি। চীন ও ভিয়েতনামে বনরুইয়ের মাংস এবং আঁশসহ শরীরের বিভিন্ন অংশের চাহিদার কারণে অবৈধ বাণিজ্যের জন্য বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব প্রাণী শিকার ও পাচার করা হয়।

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন) চীনা বনরুইকে মহাবিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। শিকার, আবাসস্থল ধ্বংস ও বন উজাড়—সব মিলিয়ে প্রজাতিটির অস্তিত্ব হুমকির মুখে।
বাংলাদেশেও চীনা বনরুইয়ের সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য খুবই সীমিত।
বাংলাদেশভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের (সিসিএ) সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহরিয়ার সিজার রহমান বলেন, ‘সমস্যা হলো, বাংলাদেশে বনরুইয়ের সংখ্যা কত এবং কীভাবে তাদের সবচেয়ে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়, সে সম্পর্কে আমাদের পর্যাপ্ত তথ্য নেই।’
২০১৭ সালে শাহরিয়ার সিজার রহমান বাংলাদেশের বনরুই নিয়ে প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। ওই গবেষণায় দেখা যায়, দেশের যেসব এলাকায় একসময় বনরুই পাওয়া যেত, সেসব এলাকায় প্রাণীটির সংখ্যা ক্রমেই কমছে। বিশেষ করে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় অবৈধ বন্যপ্রাণী পাচারের কারণে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য এলাকায় বনরুই প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।’
উদ্ধার করা দুটি বনরুই
গত বছরের অক্টোবরে একটি স্ত্রী বনরুই এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে একটি পুরুষ বনরুই পাচারকারীদের কাছ থেকে উদ্ধার করে বন বিভাগ। পরে তাদের লাওয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে সিসিএ পরিচালিত জাঙ্কিছড়া বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে রাখা হয়।
সিসিএর গবেষকরা তখন এই দুই বনরুইকে বনে ফিরিয়ে দিয়ে তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের সুযোগ পান।
শাহরিয়ার বলেন, ‘আমরা জানতে চেয়েছিলাম তারা কীভাবে চলাফেরা করে এবং গর্ত কীভাবে ব্যবহার করে। কিন্তু তাদের খুবই লুকিয়ে থাকার স্বভাবের কারণে আমাদের একাধিক পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়েছে।’
বনে ছাড়ার আগে পশু চিকিৎসকেরা দুই বনরুইয়ের শরীর পরীক্ষা করেন। কোনো আঘাত, পানিশূন্যতা বা অতিরিক্ত চাপ রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের লেজের গোড়ার আঁশের সঙ্গে ছোট **ভিএইচএফ রেডিও ট্রান্সমিটার** যুক্ত করা হয়।
এর মাধ্যমে গবেষকেরা পায়ে হেঁটে বনরুইগুলোর গতিবিধি অনুসরণ করেন।
রাতভর চলে নজরদারি
বনে ছাড়ার পর প্রথম দিকে সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত বনরুই দুটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়। তারা কোথায় যায়, কীভাবে চলাফেরা করে এবং কোন ধরনের পরিবেশ পছন্দ করে—এসব তথ্য সংগ্রহ করেন গবেষকেরা।
প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যে দুটি বনরুইই নিজেদের জন্য গর্ত বেছে নিয়ে সেখানে অবস্থান করতে শুরু করে।
পরে দিনের বেলায় তারা কোথায় অবস্থান করে তা শনাক্ত করে গর্তের মুখে ক্যামেরা ট্র্যাপ বসানো হয়। একই সঙ্গে রেডিও ট্র্যাকিংয়ের সময় কমিয়ে রাতে কয়েক ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
গবেষকেরা ১ হাজার ২৫০ হেক্টর এলাকাজুড়ে গর্তগুলোও পর্যবেক্ষণ করেন। তাদের ধারণা, গবেষণাস্থলের আশপাশে আরও প্রায় ছয়টি বন্য বনরুই রয়েছে।

নতুন পরিবেশে দ্রুত মানিয়ে নিল
ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে গবেষণা চালানোর পর পাওয়া তথ্যকে আশাব্যঞ্জক বলছেন গবেষকেরা।
উদ্ধারকেন্দ্রে অল্প সময় থাকার পর প্রাকৃতিক খাবার—যেমন পচা কাঠের ভেতর থাকা পিঁপড়া—খাওয়ানো ও পানি দেওয়ার মাধ্যমে দুটি বনরুই দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে।
বনে ছাড়ার পর দেখা যায়, তারা খুব বেশি দূরে যায়নি। বরং একই ধরনের পরিবেশের মধ্যে তুলনামূলক ছোট এলাকায় চলাফেরা করেছে।
এটি গবেষকদের কিছুটা অবাক করেছে। কারণ আগের কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, উদ্ধার করা প্রাণীকে নতুন পরিবেশে ছেড়ে দিলে তারা অনেক দূর পর্যন্ত ঘুরে বেড়ায়।
গবেষণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্যবেক্ষণগুলোর একটি হলো, বনে থাকা একটি পুরুষ বনরুইকে ছেড়ে দেওয়া স্ত্রী বনরুইটির ব্যবহৃত গর্তে আসতে দেখা গেছে।
গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে ক্যামেরা ট্র্যাপে হয়তো ওই বনরুই দুটির শাবকেরও দেখা মিলবে।
নতুন গর্ত নয়, পুরোনো গর্তেই বেশি নির্ভরতা
রেডিও ট্র্যাকিংয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। বনরুইগুলো নতুন গর্ত খোঁড়ার চেয়ে পুরোনো গর্ত ব্যবহার করতেই বেশি পছন্দ করে।
এ তথ্য বনরুইয়ের সংখ্যা নির্ধারণের প্রচলিত পদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ সাধারণত গর্তের বাইরে নতুন মাটির স্তূপ বা অন্যান্য চিহ্ন দেখে কোনো এলাকায় বনরুইয়ের উপস্থিতি অনুমান করা হয়।
কিন্তু পুরোনো গর্ত ব্যবহার করলে সেখানে নতুন মাটির চিহ্ন নাও থাকতে পারে। ফলে শুধু গর্তের চিহ্ন দেখে বনরুইয়ের সংখ্যা নির্ধারণ করলে প্রকৃত সংখ্যা কম দেখানোর আশঙ্কা রয়েছে।
গবেষকেরা ক্যামেরা ট্র্যাপের ছবিতে আরও দেখেছেন, বনরুইগুলো বনের বন্যপ্রাণীর সঙ্গে সহজেই মিশে যাচ্ছে। এমনকি বাদুড়, অজগর ও কচ্ছপের মতো প্রাণীর সঙ্গে একই গর্তও ব্যবহার করছে।
বনরুই কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বনরুই এক রাতে বিপুল পরিমাণ পিঁপড়া ও উইপোকা খেতে পারে। ফলে বনজ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় প্রাণীটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
গবেষকদের মতে, বনরুইকে শুধু একটি বিরল প্রাণী হিসেবে দেখলে হবে না; তারা বাস্তুতন্ত্রের প্রকৌশলী হিসেবেও কাজ করে।
শাহরিয়ার সিজার রহমান বলেন, ‘বনরুই না থাকলে উইপোকা ও পিঁপড়া বনের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।’
শুধু বনে ছাড়লেই রক্ষা হবে না
আইইউসিএনের প্যাঙ্গোলিন বিশেষজ্ঞ দলের এশিয়া অঞ্চলের ভাইস চেয়ার কুমার পৌডেল বলেন, উদ্ধার করা বনরুই বনে ছাড়ার পর তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে বনরুইয়ের আবাসস্থল দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। তাই প্রাণীটির চলাফেরা, আচরণ ও বসবাসের এলাকা সম্পর্কে আরও জানা জরুরি।
তবে উদ্ধার করা প্রাণীর আচরণ দেখে পুরো প্রজাতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন তিনি। কারণ পাচারকারীদের কাছ থেকে উদ্ধার করা প্রাণীগুলোর প্রকৃত উৎস অনেক সময় জানা যায় না। ফলে নতুন পরিবেশে তাদের আচরণ স্বাভাবিক বন্য বনরুইয়ের আচরণ থেকে কিছুটা আলাদা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে বনরুইকে রক্ষা করতে হলে অবৈধ পাচার বন্ধ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু শিকার বন্ধ করলেই হবে না; চীন ও ভিয়েতনামে বনরুইয়ের মাংস ও আঁশের চাহিদা কমানো, আইন প্রয়োগ জোরদার করা এবং বনরুইয়ের আবাসস্থলের আশপাশের জনগোষ্ঠীকে সংরক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত করাও জরুরি।
শিকারিকে বানাতে হবে সংরক্ষণকর্মী
সিসিএ ভবিষ্যতে উদ্ধার করা বনরুইগুলোকে আরও দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ বনাঞ্চলে ফিরিয়ে দিতে চায়। এসব এলাকায় বন সুরক্ষা তুলনামূলক কম এবং এখনো বনরুই শিকারের ঘটনা ঘটে।
চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে এশিয়ান জায়ান্ট কচ্ছপ সংরক্ষণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করে সিসিএ যে কার্যক্রম চালিয়েছে, সেটিকেও বনরুই সংরক্ষণে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
ওই প্রকল্পে স্থানীয় স্কুল ও জীবিকার সুযোগ তৈরির পাশাপাশি সাবেক শিকারিদের ‘প্যারাবায়োলজিস্ট’ হিসেবে নিয়োগ দিয়ে বনে টহল ও প্রাণী পর্যবেক্ষণের কাজে যুক্ত করা হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বনরুইয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও কঠিন হতে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে এই প্রাণীর ব্যাপক চাহিদা থাকায় শিকার থেকে পাওয়া অর্থ স্থানীয় সংরক্ষণ উদ্যোগের সুবিধার চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হতে পারে।
কুমার পৌডেল বলেন, ‘আমাদের আরও বেশি শিকারিকে সংরক্ষণকর্মীতে পরিণত করতে হবে। তা না হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।’

চলছে গবেষণা
লাওয়াছড়া জাতীয় উদ্যানকে বনরুই গবেষণার জন্য উপযুক্ত স্থান মনে করছেন গবেষকেরা। নিরাপদ ও সহজে পর্যবেক্ষণ করা যায় বলে এখানেই আরও কিছুদিন গবেষণা চালিয়ে যেতে চায় সিসিএ।
শাহরিয়ার সিজার রহমানের মতে, বনরুই রক্ষায় রেডিও ট্র্যাকিং অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতি।
তিনি বলেন, ‘আপনি যখন প্রতিদিন বনের মধ্যে প্রাণীটির গতিবিধি অনুসরণ করছেন, তখন মূলত একই সঙ্গে তার আবাসস্থল ও প্রজাতিটিকেও রক্ষা করছেন।’
বাংলাদেশে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা চীনা বনরুইকে বনে ফিরিয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগ তাই শুধু দুটি প্রাণীকে নতুন জীবন দেওয়ার ঘটনা নয়; বরং দেশের বনাঞ্চলে হারিয়ে যেতে বসা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখার সম্ভাবনাও তৈরি করছে।