এর শুরুর ইতিহাস সরাসরি নবীজির জীবনের শেষ পর্বের সঙ্গে জড়িত। ১১ হিজরির সফর মাসে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতা ক্রমে তীব্র রূপ নেয়। তিনি নামাজের ইমামতি করতে পারছিলেন না। সফর মাসের শেষ বুধবার তিনি কিছুটা সুস্থবোধ করেন। গোসল করে মসজিদে নববিতে গিয়ে শেষবারের মতো নামাজে ইমামতি করেন। উপস্থিত সাহাবিরা এ খবরে আনন্দিত হন। অনেকে দান-খয়রাত করেন। যদিও পরবর্তীতে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে তিনি ইন্তেকাল করেন, তবুও সেই সাময়িক সুস্থতার মুহূর্তটি মুসলিম উম্মাহর স্মৃতিতে গভীরভাবে রয়ে গেছে। এ দিনটিকে তাই শুকরিয়ার দিন হিসেবে স্মরণ করা হয়।
ইতিহাসবিদ ও সীরাতকারদের বর্ণনায় দেখা যায়, নবীজির অসুস্থতার সময় সাহাবিরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ছিলেন। সেই উদ্বেগের মধ্যে হঠাৎ সাময়িক সুস্থতার সংবাদ তাঁদের আনন্দিত করেছিল। এ আনন্দ ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশই পরবর্তীকালে আখেরি চাহার সোম্বা পালনের ভিত্তি তৈরি করে। দিনটি মূলত আল্লাহর নিয়ামতের জন্য শুকরিয়া আদায়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। মুসলিম সমাজ এ দিনকে অসুস্থতা থেকে মুক্তি, রোগশান্তি এবং জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে।
.png)
সাংস্কৃতিকভাবে এ দিনটি উপমহাদেশের মুসলিম জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। মুঘল আমলে দিল্লির দরবারে এ উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন হতো। বাদশাহ, অভিজাত ও সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে শুকরিয়া প্রকাশ করতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ ঐতিহ্য গ্রাম ও শহরের সাধারণ মানুষের জীবনেও ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশেও বহু প্রজন্ম ধরে এ দিনটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ হিসেবে টিকে আছে। মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকা ও বাড়িতে ওয়াজ, জিকির, মিলাদ ও দোয়ার আয়োজন হয়। অনেকে গোসল করে দুই রাকাত শুকরানা নফল নামাজ আদায় করেন। রোগমুক্তি ও পরিবারের কল্যাণ কামনা করে দোয়া করেন। দান-সদকা ও দরিদ্রদের সাহায্য করার রীতিও প্রচলিত।
এ দিনটির সাংস্কৃতিক গুরুত্ব আরও গভীর। এটি শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়, বরং সামাজিক সংহতির প্রকাশ। পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হন, আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেন এবং সামাজিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান। গ্রামীণ সমাজে মসজিদকে কেন্দ্র করে ছোটখাটো আয়োজন হয়। শহরাঞ্চলেও বিভিন্ন সংগঠন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এ দিনকে গুরুত্ব দিয়ে পালন করে। এভাবে আখেরি চাহার সোম্বা ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিকতা ও সামাজিক ঐতিহ্যের সেতুবন্ধন তৈরি করেছে।
মুসলিম সমাজে এ দিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৃতজ্ঞতার শিক্ষা। সফর মাসকে অনেকে অশুভ বলে মনে করতেন। কিন্তু নবীজি এ ধারনা খণ্ডন করেছেন। আখেরি চাহার সোম্বা সেই প্রেক্ষাপটে একটি ইতিবাচক স্মৃতি বহন করে। অসুস্থতার মধ্যেও আল্লাহর রহমতের নিদর্শন দেখার শিক্ষা দেয় এ দিন। এটি মানুষকে ধৈর্য, আশা এবং শুকরিয়ার পথে পরিচালিত করে।
যদিও কিছু আলেম এ দিনের বিশেষ ফজিলত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং এটিকে ঐতিহাসিক স্মরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে বলেন, তবুও সামাজিক বাস্তবতায় এ দিনটি মুসলিম সমাজের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ হিসেবেই টিকে আছে। এটি কোনো বাধ্যতামূলক ইবাদত নয়, বরং ঐতিহ্য ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ। যারা এ দিন পালন করেন, তাঁরা নবীজির স্মৃতি ও আল্লাহর নিয়ামতের জন্য শুকরিয়া আদায় করেন। এ পালন ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও সামাজিক রীতিনীতির সমন্বয়।
আখেরি চাহার সোম্বা তাই মুসলিম সমাজের জীবনচক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সংযোগ স্থাপন করে। নবীজির জীবনের শেষ পর্বের সেই সাময়িক সুস্থতার মুহূর্তকে স্মরণ করে মুসলিম উম্মাহ শুকরিয়া প্রকাশ করে। এ দিনের মাধ্যমে তাঁরা রোগ, কষ্ট ও জীবনের অনিশ্চয়তার মধ্যেও আল্লাহর রহমতের প্রতি বিশ্বাস রাখেন। ধর্মীয় অনুভূতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এই মিশ্রণই আখেরি চাহার সোম্বাকে মুসলিম সমাজের একটি স্থায়ী অনুষঙ্গ করে তুলেছে।