খেয়াল করে দেখুন- জন্মের মুহূর্ত থেকেই মানুষের চারপাশে এক অদৃশ্য শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়—‘ভবিষ্যৎ’। শিশুটি যখন কথা বলতে শেখেনি, অথচ তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চলছে। কোন স্কুলে পড়বে? কোন ভাষা শিখবে? কোন পেশায় যাবে—সবকিছু যেন ঠিক হয়ে যায় জন্মের আগেই।
যে ব্যক্তি মাসিক ৩০ হাজার টাকা ইনকাম করে, সে আরও কিছুটা বেশি উপার্জন করার জন্য ছুটছে। আর যে দৈনিক ৩০ হাজার টাকা ইনকাম করে, সেও এই পরিমাণটাকে আরও বৃদ্ধি করার জন্য ছুটছে।
.png)
মনে করুন, এই যে তারা ছুটছে। ছুটতে ছুটতে যে ৩০ হাজার টাকা ইনকাম করতো, সে মাসিক ৫০ হাজার টাকা ইনকাম করতে শুরু করলো। আর যে দৈনিক ৩০ হাজার ইনকাম করতো, সেও দৈনিক ৫০ হাজার টাকা ইনকাম করতে শুরু করলো। তাহলে কি তারা সন্তুষ্ট হবে? কিংবা তাদের এই ছুটে চলা কি থেমে যাবে?
নাহ! মানুষের ছুটে চলা কখনোই থেমে যাবে না। এই ছুটে চলা আর থামবেনা! কারণ এই ছুটে চলা একটা মোহ- অন্ধ মোহ!!তার মন সবসময় চায়! যতো পায়, মন ততো বেশি চায়। আর সবকিছু পাওয়ার পর কী অবস্থা হয় জানেন? আগামীকাল আর আসেনা!
হলিউডের বিখ্যাত কৌতুক অভিনেতা জিম ক্যারি বলেছিলেন, “ আমি চাই সবাই অনেক বেশি ধনী ও বিখ্যাত হোক। যা কিছুর স্বপ্ন দেখে সব পেয়ে যাক। তাহলে তারা বুঝতে পারতো এটা কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়।” আসলেই তাই। মানুষের প্রাপ্তির শেষ নাই- কারণ প্রাপ্তির প্রত্যাশাটি হচ্ছে- ভবিষ্যৎ বা আগামিকাল। জীবনে কাঙ্খিত আগামীকাল আর আসেনা! কারণ- মানুষের আশা ফুরায় না!
তবুও মানুষ চিরকাল ‘আগামীকাল’ নামের এক অলৌকিক প্রতিশ্রুতির পেছনে ছুটে বেড়ায়। এই যেমন ক্লান্তি, অনিশ্চয়তা বা ভয় থেকে বাঁচতে আমরা বারবার নিজেদের সান্ত্বনা দিই—‘আগামী কাল সব ঠিক হবে।’ কিন্তু সত্যি বলতে, সেই আগামীকাল কখনো আসে না।
প্রতিটি আগামীকাল এসে আজ হয়ে যায়। আজ আবার গতকাল হয়ে যায়। আর আমরা আবারও নতুন এক আগামীকালের অপেক্ষায় থাকি। সময়ের এই নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ যেন আমাদের বোঝাতে চায়—ভবিষ্যৎ কোনো আলাদা সময় নয় বরং আজকেরই রূপান্তর, আজকেরই পরিণতি।
এক লোকের বিষয়ে জানা গেল। তিনি নিজ শহরে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা ব্যয় করে একটি বিশাল বাড়ি বানিয়েছেন। তার বাড়িতে তিনজন বাবুর্চি আছে। তারাই বিভিন্ন দেশি-বিদেশি রান্না করে। কিন্ত তিনি দুইটা আইটেমের বেশি খেতে পারেন না। বললেন, ‘তার ডায়বেটিকস এবং প্রেশারের সমস্যা রয়েছে। তাই খাওয়া যায় না।’
তবে এই যে এতো আয়োজন, তিনজন বাবুর্চি দেশি বিদেশি রান্না করছে। কিন্তু তিনি কিছুই খেতে পারছেন না। তাহলে এসবের পিছনে ছুটে লাভ কী?
সেই ভদ্রলোক যে দেড়শ কোটি টাকা ব্যায়ে এতো বিশাল বাড়ি বানিয়েছে, রাতে ঘুমানোর সময় কি সে পুরো বাড়িটিতে ঘুমাতে পারেন? নাকি তাকেও কোনো একটি রুমের কয়েক একটা খাটে ঘুমাতে হয়! সেই খাটের আয়তন না হয় ধরলাম স্বাভাবিকের চেয়ে খানিকটা বেশি। তার রুমটাই না হয় ধরলাম ১০০০ হাজার স্কয়ার ফুটের! কিন্তু পুরো বাড়িটা?
তাহলে বাকি বাড়িটা তো খালিই পড়ে থাকে! মানুষের থাকার জন্য তো বেশি জায়গা লাগে না! একটা জীবন যাপনের জন্য তো বেশি কিছু লাগে না!
তাহলে- দুনিয়াতে এই যে আমরা এতোকিছুর পিছনে ছুটছি, এত্তো কিছু করার চেষ্টা করছি, এর কারণ কী? কারণ- আগামীকাল! এর কারণ, যেনো আগামীর দিনটা আমাদের জন্য সুখী ও আরামদায়ক হয়! কিংবা আরও একটি কারণ হতে পারে, আমার বংশধররা যেন আমার চেয়ে তুলনামূলক সুখী ও বিলাসি জীবন যাপন করতে পারে। আর ঠিক এ কারণেই সব কিছু ভুলে গিয়ে আমরা টাকার পিছনে ছুটছি।
দার্শনিক হাইডেগার বলেছিলেন, মানুষ আসলে ‘অস্তিত্বের অপেক্ষায় থাকা প্রাণী’—সে চিরকাল কিছু একটা ঘটার অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু জীবন কোনো অপেক্ষা নয়; জীবন নিজেই এক অবিরাম ‘এখন’-এর বহমান ধারা।
হাদীসের ভাষায় বলা হয়েছে, ‘আজকের জন্য বাঁচুন; কেননা ‘আগামীকাল’ এখনো জন্মই নেয়নি।’
আল্লাহর রাসূল সা. বলেছেন, ‘“সকালে জেগে উঠলে বিকেল পর্যন্ত বেঁচে থাকার আশা রেখো না। এবং বিকেলে বেঁচে থাকলে সকালে জেগে উঠার আশা রেখো না।” (সহীহ আল-বুখারী)
অন্যদিকে সম্পদ জমাকারী ব্যক্তি সম্পর্কে রাসূল সা. বলেছেন, ‘বোকা সেই ব্যক্তি, যে অন্যের জন্য (বংশধর) সম্পদ জমা করে রাখে।’ (বুখারী)
হায়! আমি এবং আমরা কতই না বোকা!
*** সংগৃহীত