গলায় মাছের কাঁটা আটকে যাওয়া: কারণ, করণীয় ও সতর্কতা
কাঁটা কোথায় আটকায়?
ছোট বা বড় মাছের কাঁটা সাধারণত গলার ভেতর, জিভের গোড়ায় বা গলবিল (ফ্যারিংস)-এ আটকে যেতে পারে। সাধারণত ০.৫ থেকে ৩ সেন্টিমিটার পর্যন্ত কাঁটা আটকে যাওয়ার ঘটনা বেশি দেখা যায়। এর মধ্যে ছোট কাঁটা আটকে যাওয়ার হার সবচেয়ে বেশি। রুই, পোনা, ভেটকি, ইলিশ, তেলাপিয়া, পুঁটি, টাকি, গুলশা ইত্যাদি মাছের কাঁটা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
.png)
কতদিন আটকে থাকতে পারে?
চিকিৎসা ইতিহাসে দেখা গেছে, একজন রোগীর গলায় ৯ মাস পর্যন্ত কাঁটা আটকে ছিল। ঘাড়ে ব্যথা শুরু হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে কাঁটার অস্তিত্ব ধরা পড়ে। তাই দীর্ঘ সময় অবহেলা করা বিপজ্জনক। তবে এটা খুব বিরল ঘটনা। সাধারনত কাটা লম্বা সময় গলার মধ্যে আটকে থাকেন থাকেনা, তার আগেই বিভিন্ন উপসর্গ তৈরি করে যা রোগীকে ডাক্তারের কাছে নিতে বাধ্য করে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
গলায় কাঁটা আটকে যাওয়া যেকোনো বয়সের মানুষের হতে পারে। তবে ২১-৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়, কারণ তারা দ্রুত খাওয়া বা কাজে ব্যস্ততার সময় অসতর্ক থাকে।
বিশেষ ঝুঁকির তালিকায় রয়েছেন:
- শিশু
- বয়স্ক ব্যক্তি
- যাঁরা নকল দাঁত ব্যবহার করেন
- সেরেব্রাল পালসি রোগী
- মাসকুলার ডিস্ট্রফি রোগী
- যারা খুব দ্রুত বা অতিরিক্ত খাবার খান

ঘরোয়া করণীয়
গলায় কাঁটা আটকে গেলে নিচের কিছু ঘরোয়া পদ্ধতি কাজে আসতে পারে:
- হাইড্রোজেন পারক্সাইড মাউস ওয়াস।
- সাদা ভাত গেলা
২-৩ বার ভাত গিলে দেখুন। এতে কাঁটা নেমে যেতে পারে।
- পাকা কলা খাওয়া
পিচ্ছিল কলা কাঁটাকে গলা দিয়ে নামাতে সাহায্য করে। বড় কামড় দিয়ে কিছুক্ষণ মুখে রেখে গিলে ফেলুন।
- জোরে কাশি দেওয়া
জিভের পেছনে কাঁটা থাকলে জোরে কাশলে বের হয়ে যেতে পারে।
- অলিভ অয়েল খাওয়া
গলার ভিতর পিচ্ছিলতা তৈরি করে, কাঁটা সহজে নিচে চলে যেতে পারে।
- ভিনেগার বা লেবুর রস
অ্যাসিডিক উপাদান কাঁটাকে নরম করে নামিয়ে দিতে সাহায্য করে। সরাসরি না খেয়ে পানিতে মিশিয়ে গ্রহণ করুন।
- লবণপানির গার্গল
কুসুম গরম লবণপানি দিয়ে গড়গড়া করলে গলার পেশি রিল্যাক্স হয়ে কাঁটা আলগা হতে পারে।
কী করবেন না
❎গলার ভেতরে আঙুল বা অন্য কিছু ঢোকানো যাবে না।
❎বারবার গলার নড়াচড়া বা গিলতে যাওয়া এড়িয়ে চলুন।
❎কুসংস্কার (যেমন বিড়ালের পা ধরা) থেকে দূরে থাকুন।
❎ঝাড়ফুঁক বা অপেশাদার চিকিৎসায় ঝুঁকি নেবেন না।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
যদি ঘরোয়া পদ্ধতিতে কাজ না হয় বা নিচের লক্ষণগুলো দেখা দেয়, তাহলে বিলম্ব না করে নিকটস্থ হাসপাতাল বা নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যান:
- তীব্র ব্যথা
- রক্তপাত
- গলার ভেতর ফুলে যাওয়া
- অতিরিক্ত লালা ঝরা
- শ্বাসকষ্ট
- বুকে ব্যথা
- খাবার/পানি গিলতে অসুবিধা
অতিরিক্ত সতর্কতা
অনেক সময় মনে হয় গলায় কাঁটা আটকে আছে, কিন্তু সেটি নামার পরও অস্বস্তি থেকে যায়। এ ধরনের ক্ষেত্রে বারবার ঢোক গেলার চেষ্টা করুন ও ব্যথার উৎস নির্ধারণ করুন।
যদি সন্দেহ থাকে, তবে দেরি না করে পরীক্ষা করান। কারণ বেশি সময় কাঁটা গলায় থাকলে ইনফেকশন বা বড় জটিলতা তৈরি হতে পারে।

২) গলায় কাঁটা বিঁধলে ভাত খেয়ে নামাতে চান? তাহলে এক কাজ করুন, ভাতকে ছোট ছোট বল বানিয়ে নিন। তারপর পানি দিয়ে গিলে ফেলুন। ভাতের গোলা চিবিয়ে খেলে কিন্তু কাঁটা নামবে না। পানি দিয়ে গিলে ফেলাই সেরা উপায়।
৩) ভাত খাবার চাইতেও সহজ একটি উপায় আছে। গলায় কাঁটা বিঁধলে খেলে ফেলুন একটি কলা। কলা খেতে খেতে দেখবেন কাঁটা নেমে গেছে আর আপনি টেরও পাননি।
৪) এক টুকরো লেবু নিন, তাতে একটু লবণ মাখিয়ে চুষে চুষে লেবুর রস খেয়ে ফেলুন। কাঁটা নরম হয়ে নেমে যাবে।
৫) পানির সাথে সামান্য ভিনেগার মিশিয়ে পান করলেও ঠিক লেবুর মতই কাজ হবে।
৬) গলায় বিঁধেছে কাঁটা? একটু অলিভ অয়েলও পান করতে পারেন। কাঁটা পিছলে নেমে যাবে।
৭) গলায় কাঁটা নামানোর আধুনিকতম পদ্ধতি হচ্ছে কোকাকোলা। এক গ্লাস কোক পান করে ফেলুন, কাঁটা নরম হয়ে নেমে যাবে।
ডা. মাহমুদ উল্লাহ ফারুকী, এমবিবিএস(ঢাকা মেডিকেল কলেজ), বিসিএস(স্বাস্থ্য), এমএস(ইএনটি), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ ও হেড-নেক সার্জন। নাক-কান-গলা বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
কনসালট্যান্ট(ইএনটি), পার্কভিউ হাসপাতাল, পাঁচলাইশ, চট্টগ্রাম।