অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় বিজ্ঞান সংস্থা সিএসআইআরও-এর পরিচালিত অস্ট্রেলিয়ান স্কয়ার কিলোমিটার অ্যারে পাথফাইন্ডার রেডিও টেলিস্কোপে প্রথম এই রহস্যময় উৎসটি ধরা পড়ে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ASKAP J1935+2148। ২০২২ সালের অক্টোবরে পর্যবেক্ষণের সময় কয়েকটি উজ্জ্বল রেডিও পালস শনাক্ত করা হয়। পরে আরও পর্যবেক্ষণে নিশ্চিত হওয়া যায়, প্রায় ৫৪ মিনিট পরপর একই ধরনের সংকেত ফিরে আসছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, সংকেতটি সবসময় একইভাবে আসে না। গবেষণায় এর তিনটি ভিন্ন নির্গমন অবস্থা পাওয়া গেছে। কখনো ১০ থেকে ৫০ সেকেন্ড স্থায়ী অত্যন্ত উজ্জ্বল পালস দেখা যায়। কখনো প্রায় ৩৭০ মিলিসেকেন্ড স্থায়ী অনেক দুর্বল পালস আসে। আবার দীর্ঘ সময় কোনো সংকেতই পাওয়া যায় না। এই আচরণকে গবেষকেরা নিউট্রন তারার কিছু বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
.png)

পৃথিবীর কোনো প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট বা রেডিও যোগাযোগের হস্তক্ষেপ থেকে এই সংকেত আসছে কি না, তা যাচাই করতেও গবেষকরা অনুসরণমূলক পর্যবেক্ষণ চালান। দক্ষিণ আফ্রিকার মীরক্যাট রেডিও টেলিস্কোপেও সংকেতটি শনাক্ত হয় এবং পূর্বানুমান করা সময়ের খুব কাছাকাছি পালস পাওয়া যায়। এতে এর মহাজাগতিক উৎস হওয়ার পক্ষে শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়।
নিউট্রন তারা, নাকি অন্য কিছু?
নিউট্রন তারা হলো বিশাল কোনো নক্ষত্রের মৃত্যুর পর অবশিষ্ট অত্যন্ত ঘন বস্তু। সাধারণ রেডিও-নিঃসরণকারী নিউট্রন তারাগুলো অত্যন্ত দ্রুত ঘোরে—অনেক ক্ষেত্রে এক সেকেন্ডের মধ্যে একাধিকবার ঘূর্ণন সম্পন্ন করে। কিন্তু ASKAP J1935+2148-এর ক্ষেত্রে প্রায় ৫৪ মিনিটের ঘূর্ণনকাল বিজ্ঞানীদের প্রচলিত ধারণাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
গবেষকেরা প্রথমে চৌম্বকীয় সাদা বামন নক্ষত্রের সম্ভাবনাও বিবেচনা করেছিলেন। তবে গবেষণায় উৎসটির আকার ও পর্যায়কাল বিশ্লেষণ করে বিচ্ছিন্ন চৌম্বকীয় সাদা বামনকে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে বাদ দেওয়া হয়েছে। নিউট্রন তারা বা অত্যন্ত চৌম্বকীয় কোনো নিউট্রন-তারার সম্ভাবনাই এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি বিজ্ঞানীরা।
আরও বিস্ময়ের বিষয় এই আবিষ্কারটি একেবারে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগে ১৮ ও ২১ মিনিটের দীর্ঘ পর্যায়যুক্ত আরও কয়েকটি রহস্যময় রেডিও উৎস শনাক্ত হয়েছে। ফলে জ্যোতির্বিজ্ঞানে ‘long-period radio transient’ নামে নতুন এক শ্রেণির অদ্ভুত মহাজাগতিক বস্তুর ধারণা তৈরি হয়েছে।
তবে ৫৪ মিনিটের এই রেকর্ডও এখন আর চূড়ান্ত নয়। ২০২৫ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ৬ দশমিক ৪৫ ঘণ্টা পর্যায়যুক্ত আরও ধীরগতির একটি রেডিও ট্রান্সিয়েন্ট শনাক্ত করেছেন। অর্থাৎ মহাবিশ্বের এই রহস্যময় ‘কসমিক হার্টবিট’ যত গবেষণা হচ্ছে, ততই প্রচলিত ধারণার সীমা বড় হচ্ছে।