ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ লাইফস্টাইল ]

হাত ধোয়ার অভ্যাস এবং পেছনের গল্প

আল মামুন রিটন
প্রকাশিত: ১৭:২৬, ২৪ আগস্ট ২০২৬
হাত ধোয়ার অভ্যাস এবং পেছনের গল্প
সেমেলভাইস এই গল্পটার থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এটাই যে, কোনো ধারণা অদ্ভুত বলে সেটি মিথ্যা নয়। আর কোনো ধারণা প্রচলিত বলে সেটি সত্যও নয়। সত্যের শেষ বিচারক হলো প্রমাণ। সে প্রকৃতির রেখে যাওয়া চিহ্ন হোক, আর বাস্তব পর্যবেক্ষণ হোক।

ঊনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপ। হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডে সন্তান জন্ম দিতে আসা নারীদের জন্য হাসপাতাল কখনও কখনও বাড়ির চেয়েও ভয়ংকর জায়গা ছিল।  একই হাসপাতালে প্রতিদিন অসংখ্য নারী সন্তান জন্ম দিতেন। কিন্তু তাদের অনেকেই কয়েক দিনের মধ্যেই মারা যেতেন এক রহস্যময় রোগে, যেমন শিশুজ্বর বা puerperal fever। জ্বর, তীব্র ব্যথা, দুর্বলতা, তারপর মৃত্যু। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার ছিল ডাক্তাররা এর কারণ জানতেন না।

১৮৪০-এর দশকে ভিয়েনা জেনারেল হাসপাতালে কাজ করতেন এক তরুণ হাঙ্গেরীয় চিকিৎসক, ইগনাজ সেমেলভাইস। তিনি লক্ষ্য করলেন অদ্ভুত একটি বিষয়। হাসপাতালের দুটি প্রসূতি ওয়ার্ডে মৃত্যুর হার এক ছিল না। একটি ওয়ার্ডে চিকিৎসক ও মেডিকেল ছাত্ররা রোগী দেখতেন। অন্যটিতে মূলত ধাত্রীদের মাধ্যমে প্রসব করানো হতো।
প্রথম ওয়ার্ডে নারীরা আশঙ্কাজনক হারে মারা যাচ্ছিলেন।

ইগনাজ সেমেলউইস

Advertisement

ইগনাজ সেমেলউইস ছবি: উইকিপিডিয়া

সেমেলভাইস ভাবতে শুরু করলেন— কেন? তারপরেই ঘটল একটি ঘটনা। তার এক সহকর্মী, প্যাথলজিস্ট ইয়াকব কোলেটশকা, ময়নাতদন্তের সময় দুর্ঘটনাবশত একটি যন্ত্রে আহত হন। কিছুদিন পর তিনি এমন এক রোগে মারা গেলেন যার লক্ষণ ছিল মৃত প্রসূতিদের রোগের সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিল।

সেমেলভাইসের মাথায় যেন বিদ্যুৎ চমকে উঠল। হয়তো মৃতদেহ পরীক্ষা করার পর চিকিৎসক ও ছাত্রদের হাতেই কোনো অদৃশ্য পদার্থ লেগে থাকছে।

আর সেই হাত দিয়েই তারা জীবিত নারীদের পরীক্ষা করছেন। আজ আমরা জানি এটি মূলত সংক্রমণ ছড়ানোর ব্যাপার ছিল। কিন্তু তখন জীবাণু তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
সেমেলভাইস সিদ্ধান্ত নিলেন একটি পরীক্ষা করবেন।

তিনি চিকিৎসক ও ছাত্রদের নির্দেশ দিলেন: রোগী পরীক্ষা করার আগে ক্লোরিনযুক্ত দ্রবণ দিয়ে হাত ধুতে হবে।
ফলাফল ছিল অবিশ্বাস্য। মৃত্যুর হার নাটকীয়ভাবে কমে গেল।

কিন্তু এখানেই গল্পের সবচেয়ে অদ্ভুত অংশ। সেমেলভাইস যে ফলাফল পেয়েছিলেন, তা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য বিপ্লবী হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অনেক চিকিৎসক তা মেনে নিতে পারলেন না। কারণ সেমেলভাইসের বক্তব্যের অর্থ দাঁড়াচ্ছিল: “সমস্যাটি রোগীদের মধ্যে নয়। সমস্যা আমাদের হাতেও থাকতে পারে।”

একজন চিকিৎসক নিজেই রোগীর মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতে পারেন—এই ধারণা সেই সময়ের চিকিৎসকদের কাছে অপমানজনক ছিল।

সেমেলভাইস ক্রমশ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন। তিনি চিঠি লিখলেন, সতর্ক করলেন, সহকর্মীদের সমালোচনা করলেন। কিন্তু তার কথাকে সবাই গ্রহণ করল না। তার চাকরিও শেষ পর্যন্ত চলে গেল। তিনি নিজের দেশে ফিরে গেলেন।

এরপর তার মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটে। জীবনের শেষদিকে তাকে একটি মানসিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৮৬৫ সালে, মাত্র ৪৭ বছর বয়সে, সেমেলভাইস মারা যান। তার মৃত্যুর সময়ও তার ধারণা পুরোপুরি স্বীকৃত হয়নি। কিন্তু ইতিহাস অপেক্ষা করছিল।

সেমেলউইসের মৃত্যুর পরে তাঁর অবদান ধীরে ধীরে বিজ্ঞানীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পেতে শুরু করে। তাঁর মৃত্যুর কয়েক বছর পরই লুই পাস্তুর তাঁর বিখ্যাত জীবাণু তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে সেমেলউইসকে ‘আধুনিক ইনফেকশন কন্ট্রোলের জনক’ বলা হয়। তাঁর আবিষ্কার ও তত্ত্বের কারণে আমরা আজ হাত ধোয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন। তবে দুর্ভাগ্যবশত, সেমেলউইস জীবিত থাকাকালে তাঁকে প্রাপ্য সম্মান দেওয়া হয়নি।

বর্তমানে প্রতিবছর ১৫ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী ‘গ্লোবাল হ্যান্ড ওয়াশিং ডে’ পালন করা হয়। বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা তৈরি এবং জনগণকে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করে রোগ প্রতিরোধ করার উদ্দেশে এ দিবসটি প্রতিবছর পালিত হয়। সবাইকে হাত ধোয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করা ও হাত ধোয়ায় উদ্বুদ্ধ করাই এ দিবস পালনের লক্ষ্য। ২০০৮ সাল থেকে এই দিবস পালন করা হয়।

কয়েক দশক পর লুই পাস্তুর জীবাণু সম্পর্কে শক্তিশালী প্রমাণ দিলেন। জোসেফ লিস্টার অস্ত্রোপচারে জীবাণুনাশক ব্যবহারের ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। তখনই মানুষ বুঝতে শুরু করল আসলে সেমেলভাইস ভুল বলেননি।।তিনি এমন একটি সত্য দেখেছিলেন যার ব্যাখ্যা করার মতো বিজ্ঞান তখনও মানুষের হাতে ছিল না। 

আজ হাসপাতালের দরজায় ঢোকার আগে চিকিৎসক হাত ধুয়ে নেন। অস্ত্রোপচারের আগে জীবাণুমুক্ত করা হয় যন্ত্রপাতি। রোগীর নিরাপত্তার জন্য হাত পরিষ্কার রাখা চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে সাধারণ নিয়মগুলোর একটি।কিন্তু এই সাধারণ নিয়মের পেছনে লুকিয়ে আছে এক অসাধারণ ট্র্যাজেডি।

একজন মানুষ প্রমাণ করেছিলেন যে সামান্য একটি অভ্যাস এই হাত ধোয়াই হাজার হাজার জীবন বাঁচাতে পারে। তবুও তার সময়ের মানুষ তাকে সহজে বিশ্বাস করেনি। ইতিহাসের শিক্ষা এখানেই।  সত্য সবসময় মিথ্যার কাছে হেরে যায় না, কখনও কখনও সত্য শুধু তার সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকে। আর বিজ্ঞানীর সবচেয়ে বড়ো শত্রু অজ্ঞতা নয়, কখনও কখনও সেটি হতে পারে নিজের ভুল স্বীকার করতে না চাওয়া।

সেমেলভাইস এই গল্পটার থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এটাই যে, কোনো ধারণা অদ্ভুত বলে সেটি মিথ্যা নয়। আর কোনো ধারণা প্রচলিত বলে সেটি সত্যও নয়। সত্যের শেষ বিচারক হলো প্রমাণ। সে প্রকৃতির রেখে যাওয়া চিহ্ন হোক, আর বাস্তব পর্যবেক্ষণ হোক।

লেখক : আল মামুন রিটন, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান বিষয়ক অনুসন্ধানী লেখক

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস এম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!