ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ লাইফস্টাইল ]

সন্তান পরিপালনে করণীয়

ওয়ারিশা মেহেবুবা
প্রকাশিত: ১১:২৭, ২৫ আগস্ট ২০২৬
সন্তান পরিপালনে করণীয়
সমাজে কোনো আদর্শিক মডেল খুঁজে পাচ্ছে সন্তানেরা। না আদর্শবান হতে পারছি বাবা-মায়েরা। না পারছে আমাদের শিক্ষক সমাজ অথবা রাজনীতিবিদগণ। সন্তানের কাছে সবার আগে আদর্শের মডেল হবেন বাবা-মা। তারপর প্রিয় শিক্ষক। কিন্তু সেই অর্থে সব বাবা-মায়েরা তো পারছেইনা। 

আমাদের সন্তানদের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে দূরন্ত শৈশবের গল্প। আমাদের শহুরে সন্তানেরা মাছের নাম জানলেও,  সেই মাছটি চেনেনা। ফল খায় ঠিকই কিন্তু কোন ফলের কোন গাছ- তা চেনেনা। গ্রামের সাথে সম্পর্ক না থাকার কারণে এরা গাছে চড়তে জানেনা। গাছের ডালে বসে আম খাওয়ার তৃপ্তির এরা কি বুঝবে? তারা সাঁতার জানেনা।

কালবৈশাখির ঝড় কি জিনিস তা সে গ্রামে না গেলে কিকরে বুঝবে। ‘ঝড়ের দিনে আম কুড়াতে সুখ’- শুধু বইতে পড়লে হবেনা। নদীর জলে ওদের ডুবাতে হবে। কৃষকের কৃষি কাজের নৈপুণতা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ দিতে হবে। আর এসবের জন্য- ‘ধানের ক্ষেতে বাতাস নেচে যায়, দামাল ছেলের মতো’ কাব্যকথার সেই গ্রামের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। 

এক্ষেত্রে চীনের উদ্যোগটি অনুসরণীয় হতে পারে। গ্রামীণ জীবন সম্পর্কে ধারণা নিতে এবং জীবনযাত্রার পার্থক্য অনুধাবনের জন্য চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় চংকিং শহর কতৃপক্ষ শহরের শিক্ষার্থীদের গ্রামে পাঠানোর সিদ্ধান্ত  নেয়। তাদের মতে, এরফলে প্রজন্মগত ও ভৌগলিক দূরত্ব কমানো সম্ভব হবে।

Advertisement

তরুণ বয়সেই তারা ব্যয়বহুল-অভিজাত জীবন-যাপনের পাশাপাশি গ্রামীণ জীবন সংগ্রাম এবং তাদের পিতা-মাতা-স্বজন-সহোদর ও পূর্বপুরুষদের জীবনযুদ্ধ সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা পাবে। চকিং পৌর প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গ্রামে অবস্থানের সময় চকিং অঞ্চলের প্রায় সাড়ে ৭ লাখ শিক্ষার্থীর প্রত্যেককেই ১০০টি করে চারা গাছ রোপন করতে হয়। এক মাসের সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে হয়। 

Tips to Keep Your AC Off Longer and Stay Comfortable | Snell

কারখানায় কাজ করতে হয়। চীনে এই প্রক্রিয়ায় স্নাতক পড়া প্রায় ২ লাখ শিক্ষার্থীকে গ্রাম কর্মকর্তা হিসেবে ভাড়া করা হয়েছে। তাদের ধারণা - এসব শিক্ষার্থীদের জীবনবোধ হবে মানবীয়। তারা জীবনের কঠিন সংগ্রামকে শক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে পরিশ্রম করে জয় করতে সমর্থ হবে। বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনকি সরকার ও এনজিওদেও পৃষ্ঠপোষকতায় স্কুল, কলেজ পর্যায়েও চীনের মতো এমন ইটার্নশীপ প্রশিক্ষণ কোর্স সিলেবাসের আওতায় নিয়ে আসা দরকার। তাহলেই পরিবর্তন আসবে। জীবন বোধ, পারিবারিক সম্পর্ক ও দেশীয় সংস্কৃতিতে উজ্জীবিত হয়ে উঠবে আমাদের আদরের সন্তান।

আমাদের পারিবারিক বিনোদনের জায়গাগুলো ছোট হয়ে আসছে। বাবা-মা, ভাই-বোন মিলে একসাথে টিভির অনুষ্ঠান দেখা হয়না। যাওয়া হয়না সিনেমা হলে। সেখানে নেই পরিবেশ। নেই ভালো সামাজিক ছবি। তারপরও কিন্তু কিছু কিছু ছবি ভালো হচ্ছে। কিন্তু সন্তানদের নিয়ে দেশীয় সংস্কৃতির এসব বিনোদন শেয়ার করা হচ্ছেনা। যাওয়া হয়না নাট্যমঞ্চে।

পারিবারিক ভ্রমণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা তো আছেই। আত্মীয়দের বাসায় দাওয়াত খেতে যাওয়া এবং তাদেরকে দাওয়াত খাওনোর রেওয়াজটাও আধুনিকতার নামে চাইনিজ রেস্টুরেন্টে আটকে গেছে। একারণে আত্মীয়তার সামাজিক বন্ধনগুলো কাছে টানছেনা সন্তানদের জীবনকে। 

অভিভাবকরা সন্তানদের ভাষা বুঝতে পারছেন না। তারা অনেক সময় সন্তানের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করছেন না, আলাপ-আলোচনায় সহনশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন না। সন্তানের সঙ্গে অভিভাবকের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। আবার সন্তানেরাও অভিভাকদের প্রত্যাশার কথা আমলে নিতে চাচ্ছেনা। খোলা মাঠে শিশুদের সামাজিকীকরণ ঘটছে না। শিশুরা বাড়ি থেকে স্কুল, স্কুল থেকে কোচিং সেন্টারে যাচ্ছে। তারা কাদের সঙ্গে মিশছে, অভিভাবকরা জানতে পারছেন না। তাহলে কেমন হবে ভবিষ্যৎ?

Keep Your Kids Active All Winter Long

আমাদের পারিবারিক, সমাজ এবং শিক্ষা জীবনে মানবিকতার বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ খুবই জরুরি। আমাদের সন্তানদের দান করতে শেখানো, সহমর্মী এবং সহযোগী হতে শেখানোর বুনিয়াদি শিক্ষা পরিবার থেকেই পেতে হবে। তবে তা শিক্ষা কারিকুলামেও থাকা আবশ্যক। এই আধুনিক ফ্ল্যাট কালচারের অদ্ভুত এ সভ্যতা বিরাজ করছে। কেউ কারো খবর রাখেনা। যাওয়া আসা হয়না। 

ফ্ল্যাটের বাসিন্দা ছোট্টমণিরা একসাথে খেলতে পারেনা। গল্প ও আড্ডায় মেতে উঠতে পারেনা। কেমন যেন একটা রিজার্ভ সংস্কৃতির কবলে একক পরিবারের একাকীত্বতা পেয়ে বসেছে আমাদের সন্তানদের জীবনে। এ শেকল ভাঙ্গতেই হবে। এই অসভ্য রেওয়াজ বদলাতে হবে। 

অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। বাসায় বাসায়, ঘরে ঘরে সহপাঠি ও খেলার সাথী বন্ধুদের জম্পেস আড্ডার সুযোগ না থাকলে ওদের বোধের পরিব্যাপ্তি বাড়বেনা। অভিজ্ঞতা বিনিময় না হলে ওদের মনন ও জ্ঞানের জগৎ বড় হবেনা। মানবিক সম্পর্ক তৈারি হবেনা। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে তাদের সৃজনশীলতা দৃষ্টান্ত উপহার হিসেবে দিতে পারবেনা। 

সমাজে কোনো আদর্শিক মডেল খুঁজে পাচ্ছে সন্তানেরা। না আদর্শবান হতে পারছি বাবা-মায়েরা। না পারছে আমাদের শিক্ষক সমাজ অথবা রাজনীতিবিদগণ। সন্তানের কাছে সবার আগে আদর্শের মডেল হবেন বাবা-মা। তারপর প্রিয় শিক্ষক। কিন্তু সেই অর্থে সব বাবা-মায়েরা তো পারছেইনা। 

শিক্ষকরা নানান অপকর্মে জড়িয়ে নিজেরাই হয়ে পড়েছে আদর্শহীন। কোথায় যাবে ওরা? ভালো কোনো খবর নেই সন্তানদের সামনে। পত্রিকার পাতা উল্টালে, টিভি চ্যানেলের খবর দেখলে খুন-খারাপি, ধর্ষণ আর লুটতরাজের খবরগুলো যেভাবে ফোকাস করা হয় ভালো উদ্যোগ ও সফলতার খবরগুলোকে সেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়না।

তাহলে তারা ভালো কাজে উৎসাহ পাবে কিভাবে? স্বপ্ন দেখবে কিভাবে? প্রচারিত বিজ্ঞাপনে শিক্ষণীয় কিছু নেই। আকাশ সংস্কৃতির অপছায়া গ্রাস করছে কোমলমতি হৃদয়গুলোকে। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস এম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!