ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ধর্ম ]

রহমতের আবির্ভাব ও স্মরণীয় দিন রবিউল আউয়াল

মো. শাহজাহান
প্রকাশিত: ১৬:২০, ২৬ আগস্ট ২০২৬
রহমতের আবির্ভাব ও স্মরণীয় দিন রবিউল আউয়াল
ছবি: সংগৃহীত

আজ রবিউল আউয়ালের দ্বাদশ তারিখ। মুসলিম উম্মাহর কাছে দিনটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও স্মরণীয়। ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগত বর্ণনা অনুযায়ী, হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম ও ওফাত—দুই ঘটনাই এই তারিখের সঙ্গে যুক্ত। কুরআন-হাদিসের আলোকে এ দিনের গুরুত্ব, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং এ উপলক্ষে মুমিনের করণীয় গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন।

কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা তার প্রিয় রাসূলকে বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করার কথা ঘোষণা করেছেন। সূরা আল-আম্বিয়ার একাত্তর নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর আমি তোমাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।’ এই রহমতের আবির্ভাব ঘটেছিল আরবের মক্কা নগরীতে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম কেবল একটি শিশুর জন্ম ছিল না; এটি ছিল মানবজাতির ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা। অজ্ঞতা, অন্যায়, কুসংস্কার ও শোষণের অন্ধকার দূর করে যে যুগে নূর ও হেদায়াতের আলো ছড়িয়ে পড়েছিল।

হাদিস গ্রন্থসমূহে তার জন্ম সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-সহ সাহাবিদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। তবে রবিউল আউয়ালের ঠিক কোন তারিখে তার জন্ম হয়েছিল, তা নিয়ে ঐতিহাসিক ও আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অনেক ঐতিহাসিক সূত্রে ১২ রবিউল আউয়ালকে তার জন্মতারিখ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও এ বিষয়ে সর্বসম্মত প্রমাণ নেই। তবে উম্মাহর একটি বড় অংশের কাছে এ তারিখটি ঐতিহ্যগতভাবে বিশেষভাবে স্মরণীয়।

Advertisement

এই দিনটির আরেকটি গভীর তাৎপর্য হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাত। হিজরি ১১ সনের রবিউল আউয়াল মাসে তিনি ইন্তেকাল করেন। তার ওফাতের সঠিক তারিখ নিয়েও ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে; তবে ১২ রবিউল আউয়াল একটি বহুল প্রচলিত মত। হজরত আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার শেষ অসুস্থতায় আয়েশা (রা.)-এর ঘরে ইন্তেকাল করেন।

প্রিয় নবীর ওফাতের সংবাদ মদিনার আকাশে-বাতাসে শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছিল। সাহাবায়ে কেরামের অশ্রু ও বেদনা আজও আমাদের হৃদয়ে অনুভূত হয়, যখন আমরা তার সুন্নাহ ও জীবনাদর্শ স্মরণ করি। জন্ম ও ওফাতের স্মৃতি একই তারিখের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় দিনটি একদিকে নূরের আবির্ভাবের আনন্দ, অন্যদিকে প্রিয় নবীর বিয়োগের বেদনা—দুই ধরনের অনুভূতি বহন করে। এ দ্বৈত অনুভূতি মুমিনের হৃদয়ে আত্মসমালোচনা ও দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে পারে।

এ দিনের গুরুত্ব কেবল ঐতিহাসিক স্মৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কুরআন ও হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসা ও তার অনুসরণকে ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সূরা আল-আহযাবের ২১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ—তার জন্য, যে আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।’

এই আয়াত স্পষ্ট করে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনই মুমিনের জন্য উত্তম আদর্শ। তাই তাঁর জন্মের স্মরণ কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁর আদর্শকে নতুন করে অনুধাবন করা এবং সুন্নাহকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা জরুরি। হাদিসে আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।’ এই ভালোবাসার প্রকৃত প্রকাশ ঘটে তার সুন্নাহ অনুসরণে, তাঁর ওপর দরুদ পাঠে এবং তাঁর আদর্শকে জীবনে ধারণের মাধ্যমে।

এই দিবসের সূচনা কীভাবে হয়েছিল, সে সম্পর্কেও ঐতিহাসিক পর্যালোচনা প্রয়োজন। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন ও তাবে-তাবেয়িনের যুগে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মদিনকে পৃথক কোনো উৎসব হিসেবে পালনের প্রচলন ছিল না। তারা প্রতিদিনই তার স্মৃতি ও সুন্নাহকে নিজেদের জীবনে ধারণ করতেন। পরবর্তীকালে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মাওলিদ বা মিলাদুন্নবী পালনের প্রথা চালু হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, ফাতেমীয় শাসনামলে মিসরে এ ধরনের আয়োজনের প্রচলন দেখা যায় এবং পরবর্তী সময়ে সিরিয়া ও অন্যান্য মুসলিম অঞ্চলেও তা বিস্তৃত হয়। দ্বাদশ শতাব্দীর দিকে এ প্রথা আরও ব্যাপকতা লাভ করে। তবে কুরআন ও সহিহ হাদিসে কোনো নির্দিষ্ট তারিখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মদিনকে উৎসব হিসেবে পালনের সরাসরি নির্দেশনা নেই। রাসূলুল্লাহ (সা.) সোমবার রোজা রাখতেন। সোমবার রোজা রাখার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘এ দিনেই আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনেই আমার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে।’

এ কারণে আলেমদের একটি অংশ মনে করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের স্মরণে ইবাদত, শোকর, দরুদ ও তার সুন্নাহ অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অন্যদিকে মাওলিদ পালনের বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে মুসলিম আলেমদের মধ্যে মতভেদও রয়েছে। তাই এ বিষয়ে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং কুরআন-সুন্নাহর মৌলিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

রবিউল আউয়ালের এই দিনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো তাঁর ওপর অধিক পরিমাণে দরুদ ও সালাম পাঠ করা। সূরা আল-আহযাবের ছিয়ানব্বই নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরুদ পাঠান। হে মুমিনগণ! তোমরাও তার প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ করো।’ হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত নাজিল করেন। এ ছাড়া এ দিনে সীরাত অধ্যয়ন ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শ নিয়ে চিন্তা করা যেতে পারে। তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায়—শৈশবের নিষ্কলুষতা, যৌবনের সততা, নবুওয়াতের দাওয়াত, হিজরতের ত্যাগ, বদর-উহুদ ও খন্দকের সংগ্রাম, মক্কা বিজয়ের সময় ক্ষমাশীলতা এবং শেষ জীবনের উপদেশ—মুমিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।

সীরাত অধ্যয়ন করলে দেখা যায়, তিনি দারিদ্র্যের মধ্যেও ধৈর্য ধারণ করেছেন, শত্রুতার মুখেও ক্ষমা করেছেন এবং ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও বিনয়ী জীবনযাপন করেছেন। তার জীবন ছিল ন্যায়বিচার, সততা, সহমর্মিতা, ক্ষমা ও আল্লাহভীতির অনন্য দৃষ্টান্ত। এই দিনে নিজের আমলের হিসাব নেওয়া এবং সুন্নাহর অনুসরণে জীবন গঠনের সংকল্প করাও গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন তিলাওয়াত, নামাজে মনোযোগ বৃদ্ধি, পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার, প্রতিবেশীর অধিকার আদায়, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সত্যের পথে দাওয়াত দেওয়ার মতো আমলে মনোযোগী হওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের স্মরণ আমাদের নিজেদের মৃত্যুর কথাও মনে করিয়ে দেয়। দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী—এ উপলব্ধি মুমিনকে আখিরাতের প্রস্তুতির দিকে মনোযোগী করে। তাই এ দিন আত্মশুদ্ধি, তওবা ও নেক আমলের সংকল্পেরও উপলক্ষ হতে পারে।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিম সম্প্রদায় রবিউল আউয়ালের এ দিনটি নানা কর্মসূচির মাধ্যমে স্মরণ করে থাকে। বাংলাদেশে এটি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। বিভিন্ন স্থানে আলোচনা সভা, সীরাত মাহফিল, কিরাত ও নাত প্রতিযোগিতা, ইসলামি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। মসজিদ ও মাদ্রাসায় সীরাত আলোচনা, দরুদ পাঠ ও দোয়ার আয়োজন করা হয়। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরে জশনে জুলুস বা শোভাযাত্রারও আয়োজন দেখা যায়। এসব কর্মসূচিতে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন। ঘরে ঘরে মিষ্টি বিতরণ, অসহায়দের খাবার খাওয়ানো এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সীরাত পাঠের চর্চাও রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশেও মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বিভিন্ন ধরনের আয়োজন হয়ে থাকে। মিসর, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কোসহ বিভিন্ন দেশে সীরাত আলোচনা, ধর্মীয় সমাবেশ, দরুদ ও নাতের আয়োজন করা হয়। কোথাও কোথাও স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ আয়োজনের ধরনেও বৈচিত্র্য দেখা যায়।

তবে আয়োজনের ধরন ভিন্ন হলেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসা, তার জীবন ও আদর্শ স্মরণ এবং তার সুন্নাহ অনুসরণের চেতনা—এগুলোই হওয়া উচিত মূল বিষয়।

রবিউল আউয়ালের এই দিনের প্রকৃত তাৎপর্য তখনই প্রকাশ পাবে, যখন আমরা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষাকে জীবনের প্রতিটি স্তরে বাস্তবায়ন করব। আজকের পৃথিবী যখন নানা সংকট, সংঘাত, অবিচার ও মানবিক বিপর্যয়ে জর্জরিত, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ন্যায়বিচার, সহিষ্ণুতা, সততা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও আল্লাহভীতির আদর্শ আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার জীবন ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ—সব ক্ষেত্রেই শান্তি ও কল্যাণের পথ দেখায়।

কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সুসংবাদদাতা, সতর্ককারী ও আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার রেখে যাওয়া শিক্ষা ও আদর্শ অনুসরণ করাই তাঁর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার প্রমাণ। রবিউল আউয়ালের এই দ্বাদশ তারিখ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবল অতীতের একজন মহান ব্যক্তিত্ব নন; তিনি মুসলিম উম্মাহর জন্য সর্বকালের আদর্শ। তার জীবন আমাদের পথ দেখিয়েছে, তার শিক্ষা আমাদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং তার ওফাত আমাদের দুনিয়ার জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব উপলব্ধি করতে শেখায়।

তাই এ দিনে আমাদের কর্তব্য হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ করা, তার সীরাত অধ্যয়ন করা, তার সুন্নাহ অনুসরণের অঙ্গীকার করা এবং নিজেদের জীবনকে তার আদর্শে গড়ে তোলার চেষ্টা করা। আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি আত্মশুদ্ধি ও মানবকল্যাণে মনোযোগী হওয়াই হতে পারে এ দিনের সবচেয়ে অর্থবহ শিক্ষা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তার প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ অনুসরণ করার এবং তার সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ডেইলি-বাংলাদেশ/কে কে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!