এমন একটি খবর প্রচার হয়েছিল গত বইমেলার সময়েও। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল সে সময়ই। উদ্যান ঘিরে সাংস্কৃতিক বলয় তৈরির অংশ হিসেবে মার্চ মাস থেকে কিছু প্রকল্পের কাজ শুরুর পরিকল্পনা করেছিল গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। তবে গত বছরও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তখন ভবিষ্যতে বইমেলা এখানে আর হবে না বলে শোনা গিয়েছিল। তার পেছনে অনেক কারণও ছিল। ফলে সব জেনেশুনেই ভেতরে একটি আশঙ্কা তৈরি হয়- তাহলে কোথায় হবে বইমেলা? সেখানে কি বইমেলা জমে উঠবে? আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিও এ নিয়ে কথা বলেছে তখন।
একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক মুহম্মদ নূরুল হুদা বলেছিলেন, ‘বইমেলা সরবে না। বাংলা একাডেমির সঙ্গে সংযোগ রেখেই মেলা হবে।’ তার এমন কথায় আশ্বস্ত হয়েছিলেন সবাই। সঙ্গে সঙ্গে দাবিও তুলছিলেন অনেকেই, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তুললেও তার মধ্যে বইমেলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। বইমেলা তো আর সংস্কৃতির বাইরের কিছু নয়। বিশাল এ উদ্যানের একটি অংশকে বইমেলার জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হোক। বইমেলার জন্য স্থান স্থায়ীকরণ এখন খুবই জরুরি।
.png)
আমরা জানি, বইয়ের প্রচারের এবং বিক্রির বড় একটি উপলক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই বইমেলা। তাই এর ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দুটি দিকই বিদ্যমান। সারাবছর যে বই প্রকাশ হয় না, এমনটা নয়। তবে বেশিরভাগ বই প্রকাশ হয় বইমেলাকে ঘিরে। একুশে বইমেলা যেহেতু একটি উৎসব। সেই উৎসবে ভালো-মন্দ বিচার করা খুবই কঠিন। এখানে সবাই অংশগ্রহণের সুযোগ পান। সবাই ঘুরতে আসেন। ইচ্ছে হলে বই কেনেন। না হলে কিনবেন না। তবে এই একমাস বইয়ের সঙ্গে পাঠকের যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। লেখক-পাঠক-প্রকাশকদের সম্পর্ক তৈরি হয়। সম্পর্ক মজবুত হয়। যা সাহিত্যচর্চায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। নবীন লেখকদের অনুপ্রাণিত করে। প্রবীণ লেখকের সম্মানিত করে।
মঙ্গলবার থেকে যে খবরটি চাউর হয়েছে, তা হলো- অমর একুশে বইমেলা ২০২৫-এর জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পাচ্ছে না বাংলা একাডেমি। এ বিষয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষকে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়, বিগত ২১ নভেম্বর ২০২৩ তারিখে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পরিবর্তে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণেই অমর একুশে বইমেলা ২০২৫ আয়োজন করতে হবে। ৬ নভেম্বর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অধিশাখা-৩ থেকে এ চিঠি পাঠানো হয়। সে ক্ষেত্রে আগামী বইমেলার আয়োজন কোথায় হবে, তা কিছুটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অমর একুশে বইমেলার আয়োজন হবে কি না, তা নিয়ে কয়েক বছর ধরেই আলোচনা চলছে। বইমেলা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ থেকে পূর্বাচলে নিয়ে যাওয়ার কথাও শোনা যাচ্ছিল কয়েক বছর ধরে।
এ বিষয়ে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অমর একুশে বইমেলা করা যাবে না, এমন সিদ্ধান্ত জানিয়েছে গণপূর্ত ও গৃহায়ণ মন্ত্রণালয়। তারা বলেছে, একাডেমির চত্বরের ভেতরে মেলার আয়োজন করার কথা। তবে বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে আপিল করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আমরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলা করতে চাই।’তবে আশার কথা হচ্ছে- অমর একুশে বইমেলা-২০২৫ রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই হবে বলে জানিয়েছেন সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তিনি আজ (১৩ নভেম্বর) গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘আমরা গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করেছি, আমাদের সচিব আলোচনা করেছেন। বইমেলা আগের স্থানেই হবে।’
আমরা জানি, ১৯৭২ সালে ভাষার মাসে বাংলা একাডেমির চত্বরে চাটাই বিছিয়ে বই বিক্রি শুরু করেছিলেন মুক্তধারা প্রকাশনার প্রতিষ্ঠাতা চিত্তরঞ্জন সাহা। ১৯৮৪ সাল থেকে বাংলা একাডেমি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে অমর একুশে গ্রন্থমেলা নাম দিয়ে ধারাবাহিকভাবে মেলা পরিচালনা করছে। ২০২১ সাল থেকে মেলার প্রাতিষ্ঠানিক নামকরণ করা হয় অমর একুশে বইমেলা। গত বছর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলার শুরু থেকেই আশার আলো দেখায় পদ্মাসেতু ও মেট্রোরেল। এ দুটি চালু হওয়ায় পাঠকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। দূর-দূরান্ত থেকে বইমেলার শুরু থেকেই নতুন নতুন বইয়ের ঘ্রাণে মেতে ওঠেন তারা।
তাই তো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলা না হওয়ার খবরে আশাহত হন লেখক-প্রকাশকরা। তারা অমর একুশে বইমেলা আয়োজনের জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকেই বরাদ্দ চান এবং দিতে হবে বলে জোর দাবি জানান। কেননা কবি-লেখকরা সব সময় চেয়েছেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই অমর একুশে বইমেলা হোক। শুধু তা-ই নয়, তারা আগের চেয়ে বড় পরিসরে আয়োজন দেখতে চান। আর যদি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলা না হয়, তাহলে উপযুক্ত স্থান কোথায়? সেই বিষয়টিও স্পষ্ট করা উচিত। আমরা আশা করি এই বৃহৎ উৎসব এবারও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। লেখকে-পাঠকে পারস্পরিক ভাব বিনিময় হবে। প্রাণের এই উৎসব মানুষের মাঝে বইপড়ার আগ্রহ জাগিয়ে তুলবে। সব রকমের আশঙ্কা নস্যাৎ করে দিয়ে সফল ও সার্থক হয়ে উঠবে। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ধারক ও বাহক এই বইমেলা অতীত গৌরব অক্ষুণ্ন রেখেই ইতি টানবে।
লেখক-পাঠক-প্রকাশকদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে বিশাল ভূমিকা রাখবে। মানসম্মত বই উপহার দিয়ে পাঠক সমাজকে উপকৃত করবে। সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে গিয়ে আয়োজকরা সার্বজনীন মেলা উপহার দিতে পারবে। প্রকাশক-লেখক-পাঠকে মুখর হয়ে উঠুক বইমেলা প্রাঙ্গণ। বই আসুক নতুন ঘ্রাণ আর আবেগ নিয়ে। পাঠকের উপস্থিতিতে লেখক-প্রকাশক-আয়োজকদের মুখে হাসি ফুটুক। তৃপ্তির ঢেঁকুড় তুলতে তুলতে তারা মেলা প্রাঙ্গণ ত্যাগ করুক। পরবর্তী বছরগুলোতেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই সার্থক বইমেলার জন্য অপেক্ষা নিয়ে কাটুক আগামী দিনগুলো। জয়তু বইমেলা। জয়তু বাংলা একাডেমি।
লেখক: কথাশিল্পী ও সাংবাদিক।