আল্লাহ বলেন: ‘বল, এটিই আমার পথ। স্পষ্ট জ্ঞানের ভিত্তিতে আল্লাহর দিকে আহবান করি আমি এবং আমার যারা অনুসারী।’ (সূরা ইউসুফ ১০৮ আয়াত) এ স্পষ্ট জ্ঞান হলো ওহি নির্ভর জ্ঞান বা কোরআন ও হাদিসের স্পষ্ট নির্দেশনা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘বল আমি তো শুধু ওহীর ভিত্তিতেই তোমাদেরকে ভয় প্রদর্শন করছি।’ (সূরা আম্বিয়া: ৪৫)
.png)
এরশাদ করা হয়েছে: ‘তোমাদের জিহবা দ্বারা মিথ্যা আরোপ করে (মনগড়াভাবে) বলবে না যে, এটি হালাল ও এটি হারাম। এভাবে আল্লাহর নামে মিথ্যা উদ্ভাবন করা হবে। যারা আল্লাহর নামে মিথ্যা উদ্ভাবন করে তারা সফল হয় না।’ (সূরা নাহল: ১১৬)
১. দ্বীনী কাজে একনিষ্ঠ বা ইখলাস থাকা:
প্রত্যেক দ্বীনি কাজে ইখলাস অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত থাকা অপরিহার্য্য। বিশেষকরে অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াতের ক্ষেত্রে আরো বেশি প্রয়োজন। কারণ তাদের হেদায়েত সম্পূর্ণ নির্ভর করে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছার উপর। এজন্য দুনিয়াবি সকল প্রকার মোহ ত্যাগ করে শুধু আল্লাহর জন্যই কাওকে দাওয়াত দিতে হবে।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি তোমাদের থেকে এ কাজের জন্য কোন প্রতিদান চাই না, আমার প্রতিদান তো বিশ্ব-পালনকর্তাই দিবেন’। সুরা শু’য়ারা ২৬:১০৯
২. পরিকল্পনা করা:
ইংরেজিতে প্রবাদ আছে, Fail to plan is plan to fail পরিকল্পনায় ব্যর্থ হওয়ার অর্থ হল ব্যর্থ হওয়ার পরিকল্পনা করা। It is better to have a bad plan than to have no plan at all. কোন পরিকল্পনা না রাখার চেয়ে খারাপ পরিকল্পনা করাও ভালো।
৩. তড়প তথা উম্মতের প্রতি দরদ:
আম্বিয়া কেরামের মতো আমাদেরও অন্তরে তাদের তড়প পয়দা করতে হবে। যেমনিভাবে আমাদের নবী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতের প্রতি দরদ ও তড়প দেখে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা সান্তনা নিয়েছেন।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তারা (কাফের ও মুশরিকরা) ঈমান আনয়ন করেনা বলে আপনি হয়তো মর্মব্যথায় আত্নঘাতী হবেন (নিজেকে ধংসের দিকে ঢেলে দিবেন’! (সূরা আশ-শুআ'রা: ৩)
“যদি তারা এই বিষয়বস্তুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করে, তবে তাদের পশ্চাতে সম্ভবতঃ আপনি পরিতাপ করতে করতে নিজের প্রাণ নিপাত করবেন’। সুরা কা’হফ ১৮:৬
৪. মুশতারাক তথা যৌথ বিষয়ের মাধ্যমে দাওয়াত শুরু করা:
প্রত্যেক ধর্মে কিছু সর্বজনীন ও সাধারণ আকিদা বা বিষয় থাকে। সুতরাং তাদেরকে দাওয়াত দেওয়ার জন্য সেই বিষয়কে সামনে রেখেই দাওয়াত শুরু করা যেতে পারে।
আল্লাহ তাআলা তাঁর হাবিবকে সম্ভোধন করে ইরশাদ করেন, ‘তুমি বল: হে আহলে কিতাব! আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে যে বাক্যে সুসাদৃশ্য রয়েছে তার দিকে এসো, যেন আমরা আল্লাহ ব্যতীত কারও ইবাদাত না করি এবং তার সাথে কোন অংশী স্থির না করি এবং আল্লাহকে পরিত্যাগ করে আমরা পরস্পর কেহকে রব রূপে গ্রহণ না করি। অতঃপর যদি তারা ফিরে যায় তাহলে বল: সাক্ষী থেকো যে, আমরা মুসলিম (আল্লাহর নিকট আত্মসমপর্নকারী)’। সুরা ইমরান ৩:৬৪
৫. স্থানীয় ভাষায় দাওয়াত দেওয়া:
আম্বিয়া কেরাম আ. এই পদ্ধতিকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে অবলম্বন করতেন। কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে: ‘আমি সব পয়গম্বরকেই তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি, যাতে তাদেরকে পরিষ্কার বোঝাতে পারে। অতঃপর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা, পথঃভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথ প্রদর্শন করেন। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ সুরা ইবরাহীম ১৪:৪
৬. স্পষ্ট ভাষী ও কোমল স্বভাবের অধিকারী হওয়া:
প্রত্যেক নবী (আলাইহিমুস সালাম) স্পষ্ট এবং শুদ্ধ ভাষী ছিলেন। তাদের কথার মধ্যেও অনেক মাধুর্জতা এবং কোমলতা ছিল। তা সত্যেও আল্লাহ তাআলা তাদেরকে দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে কোমল এবং নরম ভাষা ব্যবহার করতে হুকুম করেছেন। সুতরাং আমাদেরকেও তা অবলম্বন করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা (আ.) এর ফিরআউনকে দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরশাদ করেন, ‘অতঃপর তোমরা তাকে নম্র কথা বল, হয়তো সে চিন্তা-ভাবনা করবে অথবা ভীত হবে।’ সুরা ত্বা-হা ২০:৪৪
‘তোমরা উভয়ে ফেরাউনের নিকটে যাও, নিশ্চয়ই সে সীমালংঘন করেছে। অতঃপর তার সাথে নম্র ভাষায় কথা বল। সম্ভবতঃ সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভীতি অবলম্বন করবে’ (ত্ব-হা ৩৯/৪৩-৪৪)।
রাসূল (ছাঃ)-কে আল্লাহ বলেন, ‘আর আল্লাহর রহমতে তুমি তাদের প্রতি (অর্থাৎ স্বীয় উম্মতের প্রতি) কোমল হৃদয় হয়েছ। যদি তুমি কর্কশভাষী ও কঠোর হৃদয়ের অধিকারী হতে তাহলে তারা তোমার পাশ থেকে সরে যেত। (আলে ইমরান ৩/১৫৯)।
৭. একাধিক মাদউ থাকলে সবার দিকে সমান ভাবে দৃষ্টি দেয়া:
একাধিক শ্রেণি বা একই শ্রেণির কয়েকজন মাদউ থাকলে সবাইকে এক সঙ্গে দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু একজনের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া ঠিক না বরং সবার প্রতি সমান ভাবে দৃষ্টি দেওয়া উচিৎ।
‘তিনি ভ্রূকুঞ্চিত করলেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন।’ সুরা আ’বাসা ৮০:১-৬
৮. দায়ীর মধ্যে মাজহাবের ক্ষেত্রে খোলা মনের হওয়া:
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: ‘তিনিই তোমাদের নাম মুসলমান রেখেছেন পূর্বেও এবং এই কোরআনেও’। সুরা হাজ্জ্ব ২২:৭৮
সুতরাং মুসলমান হিসেবে সবাইকে সম্মান করতে হবে। বিশেষ করে প্রত্যেকের দ্বীনি খেদমাতকে মুল্যায়ন করতে হবে।
৯. মাদউর সঙ্গে মুনাযারা না করা:
দাওয়াতি কাজের ক্ষেত্রে যদি কোন মাদউ তর্কে অথবা ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হতে চায় তাহলে তাকে এই সুযোগ না দেওয়া। বরং উত্তম পন্থায় তাকে বুঝানোর চেষ্টা করা। তাও সম্ভব না হলে তাকেই জয়ী করে সামনে আবার মুলাকাতের সময় নিয়ে তার থেকে বিদায় নেওয়া।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: ‘তোমরা কিতাবধারীদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক করবে না, কিন্তু উত্তম পন্থায়; তবে তাদের সাথে নয়, যারা তাদের মধ্যে বে-ইনসাফ করে। এবং বল, আমাদের প্রতি ও তোমাদের প্রতি যা নাজিল করা হয়েছে, তাতে আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। আমাদের উপাস্য ও তোমাদের উপাস্য একই এবং আমরা তাঁরই আজ্ঞাবহ।’ সুরা আনকাবুত ২৯:৪৬
১০. দায়ীর সত্যবাদী হওয়া: আল্লাহর পথের দাঈকে অবশ্যই সত্যবাদী হতে হবে:
‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাক’। (তওবা ৯/১১৯)
১১. দায়ীর ধৈর্যশীল হওয়া: ধৈর্য মহৎ গুণ। আল্লাহর পথের দাঈদের এই মহৎ গুণে গুণান্বিত হ’তে হবে।
আল্লাহ বলেন, ‘সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের। যাদের ওপরে কোনো বিপদ আসলে তারা বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং তার দিকেই আমরা ফিরে যাব’। (বাক্বারাহ ২/১৫৫-১৫৬)।
১২. দায়ীর কথায় ও কাজে মিল থাকা: আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘হে মুমিনগণ! তোমরা এমন কথা কেন বল যা নিজেরা কর না? তোমরা যা কর না তা বলা আল্লাহর দৃষ্টিতে অতিশয় অসন্তোষজনক’। (ছফ ৬১/২-৩)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সাধ্যমত দ্বীনের দাওয়াতে সময় ও শ্রম কোরবানি করার তওফিক দান করুন-আমিন!