ঢাকা,  সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ বিজ্ঞান বিস্ময় ]

মানবদেহ পুনরুজ্জীবিত করা কি সম্ভব

আল মামুন রিটন
প্রকাশিত: ১৪:৩৯, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
মানবদেহ পুনরুজ্জীবিত করা কি সম্ভব
গবেষণা চলছে কোষ ও অঙ্গ সংরক্ষণে। সেই অগ্রগতি একদিন মানবদেহেও প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু আজকের দিনে কোনো সংরক্ষিত মানুষকে জীবিত করা যায়নি এবং কাছাকাছি প্রযুক্তিও নেই

ক্রায়োনিকস হলো মৃত ঘোষণা হওয়া মানুষের দেহ বা মস্তিষ্ককে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করার একটি পদ্ধতি। এর লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতের চিকিৎসা প্রযুক্তি দিয়ে সেই দেহকে আবার কার্যকর অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।

 বর্তমানে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয় কেবল আইনগতভাবে মৃত ঘোষণার পর। আইনগত মৃত্যু মানে হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়া। কিন্তু মস্তিষ্কের সব কোষীয় কার্যক্রম তখনই থেমে যায় না। ক্রায়োনিকস সমর্থকরা এই পার্থক্যকে গুরুত্ব দেন। 

তাঁদের মতে সম্পূর্ণ মৃত্যু তখনই ঘটে যখন মস্তিষ্কের তথ্য সংরক্ষণের কাঠামোও নষ্ট হয়ে যায়। সেই কাঠামো যতক্ষণ অক্ষত থাকে ততক্ষণ ভবিষ্যতে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা থাকে বলে তাঁরা দাবি করেন।

প্রক্রিয়াটি শুরু হয় মৃত্যুর ঘোষণার পরপরই। প্রথমে দেহকে দ্রুত ঠান্ডা করা হয় এবং কৃত্রিমভাবে রক্ত সঞ্চালন চালু রাখা হয় যাতে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাব কম হয়। 

এরপর রক্ত ও পানিজাতীয় অংশ বের করে মেডিকেল গ্রেড ক্রায়োপ্রোটেক্ট্যান্ট দ্রবণ ঢোকানো হয়। এই দ্রবণ বরফ কণা তৈরি হতে বাধা দেয়। বরফ কণা কোষের ঝিল্লি ছিঁড়ে ফেলে। দ্রবণ ভর্তি হওয়ার পর দেহকে ধাপে ধাপে ঠান্ডা করা হয়। 

প্রথমে শুষ্ক বরফ দিয়ে তাপমাত্রা কমানো হয়। তারপর তরল নাইট্রোজেন ব্যবহার করে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা মাইনাস একশো ছিয়ানব্বই ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনা হয়। এই তাপমাত্রায় সব জৈবিক কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। দেহকে বিশেষ সিলিন্ডারে রেখে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা হয়।

এই পদ্ধতির ইতিহাস পঞ্চাশের দশকে শুরু। ১৯৫৪ সালে মানব শুক্রাণু হিমায়িত করে সংরক্ষণের সাফল্য আসে। ১৯৬২ সালে রবার্ট এটিঙ্গার প্রসপেক্ট অব ইমর্টালিটি বইয়ে মানবদেহ সংরক্ষণের ধারণা তুলে ধরেন। 

১৯৬৭ সালে জেমস বেডফোর্ড প্রথম মানুষ হিসেবে এই পদ্ধতিতে সংরক্ষিত হন। তাঁর দেহ এখনও সংরক্ষিত আছে। ১৯৭২ সালে অ্যালকর লাইফ এক্সটেনশন ফাউন্ডেশন এবং ১৯৭৬ সালে ক্রায়োনিকস ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়। 

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কয়েকশ মানুষ এইভাবে সংরক্ষিত আছেন। মূল কেন্দ্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রে। অস্ট্রেলিয়া ও রাশিয়াতেও কিছু সুবিধা আছে। খরচ সংস্থাভেদে আটাশ হাজার ডলার থেকে দুই লাখ ডলারের বেশি হতে পারে। অনেকে জীবনবীমা দিয়ে এই খরচ মেটান।

ক্ষুদ্র কোষ ও টিস্যু সংরক্ষণে সাফল্য আছে। শুক্রাণু ডিম্বাণু ভ্রূণ স্টেম সেল ও কিছু অঙ্গের টিস্যু হিমায়িত করে পরে সফলভাবে ব্যবহার করা যায়। নেমাটোড কৃমি ও কিছু ছোট জীবকে হিমায়িত করে ফিরিয়ে আনা গেছে। 

সাম্প্রতিক গবেষণায় ইঁদুরের কিডনি ও মস্তিষ্কের ছোট অংশ হিমায়িত করে পরে বৈদ্যুতিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনার উদাহরণ আছে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ স্তন্যপায়ী প্রাণী বা মানুষকে এই অবস্থা থেকে ফিরিয়ে আনা এখনো সম্ভব হয়নি।

পুনর্জীবনের পথে বড় বাধা আছে। মৃত্যুর পরপরই মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাবে ক্ষতি শুরু হয়। ক্রায়োপ্রোটেক্ট্যান্ট নিজেই বিষাক্ত হতে পারে। বড় দেহে সমানভাবে ঠান্ডা করা কঠিন। ফাটল তৈরি হতে পারে। আবার গরম করার সময়ও ক্ষতি হয়। মস্তিষ্কের কোটি কোটি স্নায়ু সংযোগ ঠিকমতো সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার করা বর্তমান প্রযুক্তির বাইরে। পরিচয় ও স্মৃতি এই সংযোগে থাকে। 

সেগুলো নষ্ট হলে মানুষ আর আগের মতো থাকে না। বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞান মৃত্যুর কারণ যে রোগ তাও সবসময় সারাতে পারে না। সংরক্ষণের পর সেই রোগ সারিয়ে পুরো দেহ সচল করা আরও জটিল।

অনেক বিজ্ঞানী এই পদ্ধতিকে পরীক্ষামূলক ও অপ্রমাণিত বলে মনে করেন। তাঁরা বলেন পদার্থবিজ্ঞান রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের পরিচিত নিয়মের মধ্যে থেকে পূর্ণাঙ্গ মানবদেহ পুনরুজ্জীবিত করা এখন সম্ভব নয়। 

সমর্থকরা বলেন ভবিষ্যতে ন্যানোপ্রযুক্তি বা উন্নত মেরামত প্রযুক্তি এলে সম্ভব হতে পারে। তাঁরা বলেন আজকের অসম্ভব কালকের সম্ভব হয়ে উঠতে পারে। 

কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা প্রমাণ নেই। সংরক্ষণ কেন্দ্র দীর্ঘদিন টিকে থাকাও চ্যালেঞ্জ। অতীতে কিছু কেন্দ্র বন্ধ হয়ে দেহ নষ্ট হয়ে গেছে।

বর্তমানে ক্রায়োনিকস সংরক্ষণ করা যায় কিন্তু পুনর্জীবন সম্ভব নয়। এটি একটি অনিশ্চিত বাজি। যারা এতে টাকা খরচ করেন তাঁরা ভবিষ্যতের প্রযুক্তির উপর আস্থা রাখেন। বিজ্ঞান সম্প্রদায়ের বড় অংশ এখনও একে প্রমাণিত চিকিৎসা পদ্ধতি বলে মানেন না। 

গবেষণা চলছে কোষ ও অঙ্গ সংরক্ষণে। সেই অগ্রগতি একদিন মানবদেহেও প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু আজকের দিনে কোনো সংরক্ষিত মানুষকে জীবিত করা যায়নি এবং কাছাকাছি প্রযুক্তিও নেই।

এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাস্তব তথ্য জানা জরুরি। আশা ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য বোঝা দরকার। বিজ্ঞান ধাপে ধাপে এগোয়। ছোট সাফল্য বড় সাফল্যের পথ খুলে দিতে পারে। কিন্তু সেই পথ কতদূর কতদিনে মিলবে তা এখনো অজানা।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!