বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাড়তি দাম নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ভূমিকা রাখতে পারছে না, যার খেসারত দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের।
বাসা-বাড়িতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি মূল্য ১ হাজার ৩৪১ টাকা নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কিন্তু খুচরা বাজারে সেই সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকায়। ফলে প্রতি সিলিন্ডারে গ্রাহকদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। এতে বাজার তদারকিতে ঘাটতি ও সরবরাহ ব্যবস্থার অসংগতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
.png)
এদিকে, দামের এই অমিল নতুন নয় বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এজাজ হোসাইন। তিনি বলেন, সরকারি দামের তুলনায় বাজারে সবসময়ই ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেশি নেয়ার প্রবণতা ছিল। কার্যকর মনিটরিংয়ের অভাবেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। শুধু তদন্ত নয়, ধারাবাহিক নজরদারি এবং অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) সরাসরি আমদানি ও বাজার ব্যবস্থায় যুক্ত করলে সরবরাহ স্থিতিশীল হবে এবং দাম নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।
সরকার ১৬ ফেব্রুয়ারি দুটি পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এলপিজির স্থানীয় উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক এবং আমদানি পর্যায়ের ২ শতাংশ আগাম কর ৩০ জুন পর্যন্ত প্রত্যাহার করে। এলপিজি অপারেটরদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রত্যাশা ছিল শুল্ক কমলে বাজারে দাম কমবে। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই।
শুল্ক কমায় গত মঙ্গলবার বিইআরসি ১২ কেজি এলপিজির দাম ১৫ টাকা কমিয়ে এক হাজার ৩৪১ টাকা নির্ধারণ করে। খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজির দাম ধরা হয়েছে ১১১ টাকা ৭৯ পয়সা। এর আগে ২ ফেব্রুয়ারি মূল্য সমন্বয়ের সময় ৫০ টাকা বাড়িয়ে দাম করা হয়েছিল এক হাজার ৩৫৬ টাকা।
রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী ও বাড্ডা এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১২ কেজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৮৫০ টাকায়। অনেক খুচরা বিক্রেতা বলছেন, ডিলার পর্যায় থেকেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ফলে সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
মগবাজারের বাসিন্দা ইন্দ্রনীল সরকার জানান, তিনি সম্প্রতি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার কিনেছেন এক হাজার ৮০০ টাকায়।
মোহাম্মদপুরের খুচরা বিক্রেতা শহিদুল জানান, সরকার নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রি করা সম্ভব হয় না। কারণ ডিলারদের কাছ থেকে বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে।
এদিকে, চট্টগ্রামের চকবাজার, বহদ্দারহাট ও আগ্রাবাদ এলাকায় ১২ কেজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৬৫০ টাকায়। বিক্রেতারা বলছেন, আগের বাড়তি দামের প্রভাব এখনও কাটেনি। ৩৫ কেজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে পাঁচ হাজার থেকে পাঁচ হাজার ২০০ টাকায়।
নগরীর বহদ্দারহাট এলাকায় দিব্ব এন্টারইপ্রাইজে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১২ কেজির এলপিজি বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৬৫০ টাকায়।
নগরীর বাদুরতলা আরকান হাউজিং সোসাইটির বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন বলেন, শুনেছি ১২ কেজির সিলিন্ডারে কমানো হয়েছে ১৫ টাকা। সরকার এই দাম না কমালেও চলত। কারণ এ ধরনের মূল্য সমন্বয় বাজারে প্রভাব ফেলে না।
রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগীয় শহরগুলোতেও একই চিত্র দেখা গেছে। রাজশাহীতে ১২ কেজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৬০০ টাকায়। খুলনায় দাম প্রায় একই। বরিশাল ও সিলেটে পরিবহন খরচের অজুহাতে দাম বেশি রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মফস্বল ও উপজেলা পর্যায়ে পরিস্থিতি আরও জটিল। অনেক এলাকায় নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার বেশি নেয়া হচ্ছে। ভোক্তারা বলছেন, বাজার তদারকির অভাবে বিক্রেতারা ইচ্ছেমতো দাম নিচ্ছেন।
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখ পর্যন্ত দুই বন্দর দিয়ে এলপিজি আমদানি হয়েছে ৯১ হাজার টন, যা আগের মাসের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ বেশি। সীতাকুণ্ডের বেসরকারি জেটিগুলো দিয়ে প্রতি মাসে আরও প্রায় ২২ হাজার টন আমদানি হয়।
দেশে ২৮টি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসা করলেও ২৩টির আমদানির অনুমোদন রয়েছে। চলতি অর্থবছরে সক্রিয় রয়েছে ১৬টি কোম্পানি। এর মধ্যে ৯টি কোম্পানি মোট আমদানির ৯২ শতাংশ সরবরাহ করেছে। এর বাইরে বেক্সিমকোসহ অন্তত চারটি কোম্পানির এলপি গ্যাস আমদানি বন্ধ রয়েছে।
গত নভেম্বরে এলপি গ্যাসের আমদানি ৪৪ শতাংশ কমে যায়। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতেও তা বাড়েনি। আমদানি বাড়াতে সরকারের অনুমতি চেয়েও পায়নি মেঘনা গ্রুপ, ডেলটা এলপিজিসহ কয়েকটি কোম্পানি। এতে জানুয়ারিতে এলপি গ্যাসের সংকট তীব্র হয়। তিতাসের গ্যাস সংকটের কারণে এলপি গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যায়। সংকটে পড়ে ব্যবসায়ীদের আমদানি বাড়ানোর অনুমতি দেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
শীর্ষ আমদানিকারক মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের একাধিক জাহাজে প্রায় ৫৭ হাজার টন এলপিজি চট্টগ্রামের পথে রয়েছে। এ ছাড়া ইউনাইটেড আইগ্যাস, যমুনা স্পেকটেক, ওমেরা পেট্রোলিয়ামসহ অন্য কোম্পানিগুলোও আমদানি বাড়িয়েছে।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের নেতারা বলছেন, আমদানি অব্যাহত থাকলে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। তবে খুচরা পর্যায়ে কঠোর নজরদারি না থাকলে ভোক্তাদের স্বস্তি মিলবে না।
ভোক্তা সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, শুধু কাগুজে মূল্য সমন্বয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। উৎপাদন, আমদানি, ডিলার ও খুচরা– সব পর্যায়ে সমন্বিত তদারকি প্রয়োজন। না হলে শুল্ক কমানোর সুফল ভোক্তার কাছে পৌঁছাবে না।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার টন এলপিজি দেশে এসেছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ সন্তোষজনক রয়েছে। তাই খুচরা পর্যায়ে দাম এত বেশি হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। নভেম্বর ও বিশেষ করে ডিসেম্বর এবং জানুয়ারিতে আমদানি কম হওয়ায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। সারাদেশের মাঠ পর্যায়ে বাজার নিয়ন্ত্রণের মতো জনবল কমিশনের নেই। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভোক্তা অধিকার প্রায় অভিযান পরিচালনা করছে। বাড়তি দামের প্রমাণ পেলে জরিমানা করা হচ্ছে।