চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল না পাওয়ায় অনেক এলাকায় জেনারেটরও চালানো যাচ্ছে না। এতে করে হুমকির মুখে পরেছে দেশের টেলিকম সেবা। পরিস্থিতিকে ‘গুরুতর’ ও ‘ক্রমবর্ধমান’ সংকট বলে অভিহিত করেছে দেশের মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (অ্যামটব)। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগসেবা বজায় রাখা সম্ভব হবে না বলে মনে করছে সংগঠনটি।
পরিস্থিতি তুলে ধরে গত শনিবার বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান বরাবর চিঠি দিয়েছে সংগঠনটি। অ্যামটবের দেয়া চিঠি প্রাপ্তির বিষয়য়ে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী।
.png)
অ্যামটব মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার স্বাক্ষরিত এ চিঠিতে বলা হয়, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সরকারের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ ছাড়া টেলিযোগাযোগসেবা চালু রাখা আর সম্ভব নয়। চিঠিতে দেশব্যাপী মোবাইল নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়া ঠেকাতে বিটিআরসি চেয়ারম্যানের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগ, জ্বালানি বিভাগ, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সব মোবাইল অপারেটরদের অংশগ্রহণে জরুরি ভিত্তিতে উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় সভা আয়োজনের অনুরোধ জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিদ্যুতের সঞ্চালন সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, রোববার দিনের সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল বেলা ৩টায়। ওই সময় সারা দেশে ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের উৎপাদন ঘাটতি ছিল। আর গত বৃহস্পতিবার দেশে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯২৩ মেগাওয়াট।
অ্যামটবের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোবাইল বেজ ট্রান্সসিভার স্টেশন (বিটিএস) চালু রাখতে দেশের প্রধান তিন অপারেটর কোম্পানির দৈনিক ৫২ হাজার ৪২৫ লিটার ডিজেল এবং ১৯ হাজার ৮৫৯ লিটার অকটেন প্রয়োজন হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম অপারেটর গ্রামীণফোনের দরকার হয় ২৮ হাজার ৭৯ লিটার ডিজেল ও ৯ হাজার ২৫৪ লিটার অকটেন। রবি আজিয়াটার ১৩ হাজার ১৪০ লিটার ডিজেল ও ৫ হাজার ৬১০ লিটার অকটেন এবং বাংলালিংকের প্রয়োজন হয় ১১ হাজার ২০৬ লিটার ডিজেল ও ৪ হাজার ৯৯৫ লিটার অকটেন।
এ বিষয়ে রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম গণমাধ্যমকে বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে মোবাইল নেটওয়ার্ক পরিচালনা বর্তমানে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং মোকাবেলায় আমাদের বেস স্টেশনগুলো সচল রাখতে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এজন্য প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন। কিন্তু এ সমাধান দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ও পরিচালনাগতভাবে টেকসই নয়। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহে অনিয়ম ও মাঠপর্যায়ে পরিবহন জটিলতা নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ফিডারগুলোতে টেলিকম অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে না, যা সেবা সচল রাখাকে আরো কঠিন করে তুলছে। ফলে নেটওয়ার্কের স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়ছে এবং সেবার মানে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
তিনি আরো বলেন, এ অবস্থার উন্নতি না হলে নেটওয়ার্কের মান কমে যাওয়া বা সাময়িক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি রয়েছে। আমরা নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রচেষ্টায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাই।
অ্যামটব জানিয়েছে, জেনারেটর চালিয়ে একটি ডেটা সেন্টার চালু রাখতে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৫০০-৬০০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। এভাবে লোডশেডিংয়ের কারণে বর্তমানে প্রতিদিন একটি ডেটা সেন্টার সক্রিয় রাখতে প্রায় ৪ হাজার লিটার ডিজেল দরকার হচ্ছে। অন্যদিকে স্থানীয় জ্বালানি স্টেশনগুলো এ পরিমাণ ডিজেল সরবরাহ করতে পারছে না।
ডেটা সেন্টার/সুইচিং সেন্টার সচল রাখতে প্রতিদিন দেশের মোবাইল অপারেটরদের প্রয়োজন হচ্ছে ২৭ হাজার ১৯৬ লিটার ডিজেল। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের প্রয়োজন হচ্ছে ১১ হাজার ১৮৪ লিটার, রবির ৯ হাজার ৭৩২ লিটার এবং বাংলালিংকের ৮ হাজার ২০০ লিটার ডিজেল।
গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ গণমাধ্যমকে বলেন, চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটররা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন। বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দেশব্যাপী নিরবচ্ছিন্ন টেলিকমসেবা বজায় রাখতে সময়োপযোগী এবং সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, টেলিকম অবকাঠামোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমরা সরকারের সহযোগিতা কামনা করছি। এর মধ্যে রয়েছে ডেটা সেন্টার, সুইচিং ফ্যাসিলিটিজ এবং বেস স্টেশনগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও জ্বালানি সরবরাহের প্রক্রিয়া সহজতর করা। এছাড়া জরুরি কার্যক্রমের জন্য জ্বালানি পরিবহনে সহায়তা প্রদান—যাতে কোটি কোটি মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় এ সেবায় কোনো ধরনের ব্যাঘাত না ঘটে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে (ফেব্রুয়ারি) ১৮ কোটি ৫৮ লাখ ৪০ হাজার মানুষ মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপে বলা হয়েছে, দেশের ৮৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। নিজস্ব মোবাইল রয়েছে ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষের। আর মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করে প্রায় ১১ কোটি মানুষ।
বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তৈমুর রহমান বলেন, চলমান জ্বালানি সংকট নেটওয়ার্ক পরিচালনার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে। বাস্তবে টেলিযোগাযোগকে একটি অগ্রাধিকারমূলক পরিষেবা হিসেবে গণ্য করতে হবে, যেখানে জরুরি অবকাঠামোর জন্য নিশ্চিত বিদ্যুৎ এবং সহজলভ্য জ্বালানি সরবরাহ থাকবে। নেটওয়ার্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং অর্থনীতির ডিজিটাল মেরুদণ্ডকে সুরক্ষিত রাখার জন্য এটি অপরিহার্য। বর্তমানে পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে দেশজুড়ে লাখ লাখ মানুষের নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করতে সময়োপযোগী, লক্ষ্যভিত্তিক এবং সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
বিটিআরসিকে দেয়া অ্যামটবের চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে পরিস্থিতি মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরদের পরিচালনগত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যাওয়ার আসন্ন ঝুঁকি রয়েছে। এ ধরনের অচলাবস্থা জরুরি পরিষেবা, দুর্যোগ মোকাবেলা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বয়, আর্থিক লেনদেন, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে।
অ্যামটব আরো জানিয়েছে, দীর্ঘ সময় বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ না পাওয়া এবং ব্যাকআপ সিস্টেমের জন্য নিশ্চিত জ্বালানি সরবরাহের অভাবে অপারেটররা মারাত্মক পরিচালনগত সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। এর সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝড় পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করেছে। ঝড়ের কারণে বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দীর্ঘ হচ্ছে।
অ্যামটবের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, কয়েকদিন ধরে বাণিজ্যিক গ্রিডের ডাউনটাইম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে ডিজেল জেনারেটরের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়েছে।
এ অবস্থায় অ্যামটব বিটিআরসি চেয়ারম্যান বরাবর চিঠিতে কিছু বিষয়ে দ্রুত হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানিয়েছে। এর মধ্যে আছে প্রধান এমএনও ডেটা সেন্টার এবং জরুরি স্থাপনাগুলোয় পরিষেবা প্রদানকারী সংযুক্ত ফিডারগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, সংকটের সময়ে দেশব্যাপী সব মোবাইল বেস স্টেশনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা, প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য ডিপো থেকে এমএনওদের নির্ধারিত পয়েন্টে সরাসরি ও জরুরি জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা এবং জরুরি টেলিকম অপারেটরদের জন্য বাধাহীন জ্বালানি পরিবহন নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দেয়া।
অ্যামটব মহাসচিব লে কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার গণমাধ্যমকে বলেন, বিদ্যুৎ বা জ্বালানির অভাবে মোবাইল অপারেটরদের ডেটা সেন্টার বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত হলে এর প্রভাব খুব দ্রুত এবং ব্যাপকভাবে পুরো নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়তে পারে। নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ বা আংশিক বন্ধ হলে কল, ইন্টারনেট, এসএমএসসহ সব ধরনের সেবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে বা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে। ইন্টারনেট ডাউন বা খুব স্লো হয়ে যেতে পারে। কারণ ডেটা সেন্টার থেকেই ট্রাফিক রাউটিং ও কন্ট্রোল হয়। ওটিপি, ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স সেবা ইত্যাদি অর্থাৎ যেসব সেবা মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয় সেসব ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তিনি বলেন, অপারেটরদের ব্যাকআপ থাকে কিন্তু যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাতে কতটুকু ব্যাকআপ দেয়া সম্ভব হবে তা নিয়েও সন্দেহ আছে। আমাদের মনে রাখতে হবে ডেটা সেন্টারই নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর মস্তিষ্ক—এটা বন্ধ মানে সমগ্র নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যাওয়া।
এ বিষয়ে বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী গণমাধ্যমকে বলেন, টেলিকমিউনিকেশন একটি জরুরি সেবার অংশ হওয়ায় বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি মন্ত্রণালয়কেও বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং সেখান থেকেও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, এখন মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মাঠ পর্যায়ে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা। কীভাবে এ সমন্বয় জোরদার করে দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়ে কাজ চলছে। সব মিলিয়ে মোবাইল নেটওয়ার্ক যেন কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।