প্রিয়জনের শেষ ঠিকানা—এক টুকরো কবর। সেখানে শুয়ে থাকেন বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান কিংবা আপনজন। জীবনের ব্যস্ততায় পাশে থাকা না হলেও মৃত্যুর পর সেই মানুষটির শেষ চিহ্নটুকু ধরে রাখতে চান স্বজনেরা। তাই কবরের ওপর হাত রেখে শেষবারের মতো প্রিয়জনকে স্মরণ করা, নিয়মিত জিয়ারত করা কিংবা কবরটি একটু যত্নে রাখার আকাঙ্ক্ষা নিছক আবেগ নয়—এ যেন ভালোবাসার শেষ আশ্রয়।
কিন্তু রাজধানী ঢাকায় সেই শেষ আশ্রয়টুকুও এখন হয়ে উঠছে দুষ্প্রাপ্য ও ব্যয়বহুল। কারও কারও সামর্থ্য থাকলেও কবরের জন্য সাড়ে তিন হাত জায়গা স্থায়ীভাবে কেনার সুযোগ নেই। নির্দিষ্ট মেয়াদে কবর সংরক্ষণের সুযোগ থাকলেও সেখানে দিতে হচ্ছে লাখ থেকে কোটি টাকা। কোথাও ২৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণে গুনতে হচ্ছে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত। আবার জায়গার সংকটে কোথাও নতুন করে সংরক্ষণের সুযোগই নেই। ফলে প্রিয়জনের কবরটি একটু দীর্ঘদিন ধরে রাখার ইচ্ছা থাকলেও অধিকাংশ নগরবাসীর সাধ্য যেন সেখানে থমকে দাঁড়ায়।
.png)
একদিকে দ্রুত বাড়ছে ঢাকার জনসংখ্যা, অন্যদিকে কমছে কবরস্থানের জায়গা। মৃত্যুর পরও যেন জায়গার সংকট থেকে মুক্তি নেই। যে শহরে জীবিত মানুষের জন্য একটু জায়গা পাওয়া কঠিন, সেখানে মৃতের জন্য কয়েক হাত মাটি সংরক্ষণও হয়ে উঠেছে বড় বাস্তবতা। আর সেই বাস্তবতার সঙ্গে মিশে আছে শোক, আবেগ, সামর্থ্য ও বৈষম্যের এক নির্মম গল্প।
তাহলে কবর সংরক্ষণের এই আকাশছোঁয়া ফি কতটা যৌক্তিক? জায়গা সংকটের দায় কি শুধু মৃতের স্বজনদের ওপর বর্তাবে, নাকি নগর পরিকল্পনায় কবরস্থানের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নিশ্চিত করার দায়িত্বও রয়েছে রাষ্ট্র ও সিটি করপোরেশনের? প্রিয়জনের শেষ ঠিকানাটুকু কি শুধু সামর্থ্যবানদের জন্যই সংরক্ষিত থাকবে?
রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের কবরস্থান, সংরক্ষণ ফি, আয়-ব্যয়, জায়গার সংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি কবর সংরক্ষণ নিয়ে ডেইলি বাংলাদেশের অনুসন্ধান তুলে ধরছে—মৃত্যুর পরের ঠিকানাটুকুও কীভাবে হয়ে উঠেছে নগরবাসীর জন্য এক কঠিন হিসাব।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কবর সংরক্ষণের সুযোগ সীমিত হওয়ার মূল কারণ রাজধানীতে জায়গার তীব্র সংকট। বিদ্যমান কবরস্থানগুলোর আয়তন বাড়ানোর সুযোগ না থাকায় চাইলেই সবাইকে কবর সংরক্ষণের সুযোগ দিতে পারছে না সিটি করপোরেশন। ফলে প্রিয়জনের কবরটি দীর্ঘদিনের জন্য সংরক্ষণ করতে চাইলেও অনেকের সেই সুযোগ মিলছে না। তবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কিংবা সরকারের সর্বোচ্চ মহলের সুপারিশ থাকলে বিশেষ বিবেচনায় কবর সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা সম্ভব। এর বাইরে মুক্তিযোদ্ধাদের কবর মৃত্যুর পর ১০ বছরের জন্য বিনা মূল্যে সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের তথ্যানুযায়ী, রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের অধীনে মোট ৯টি কবরস্থান রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অধীনে তিনটি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অধীনে ছয়টি কবরস্থান রয়েছে। ডিএসসিসির কবরস্থানগুলো হলো আজিমপুর, জুরাইন (মুরাদপুর ও ধলপুরসহ) এবং খিলগাঁও। অন্যদিকে ডিএনসিসির অধীনে রয়েছে রায়েরবাজার বধ্যভূমিসংলগ্ন কবরস্থান, বনানী, উত্তরা ৪, ১২ ও ১৪ নম্বর সেক্টর এবং মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান। এছাড়া দক্ষিণখানের চামুড়খান কবরস্থানটিও ডিএনসিসির আওতায় যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। তবে এখনো কবরস্থানটি আনুষ্ঠানিকভাবে সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।
জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) কবরস্থানের সংকট বেশ তীব্র। ৩৭ দশমিক ৫০ একর আয়তনের আজিমপুর কবরস্থানে রয়েছে প্রায় ২৫ হাজার সাধারণ কবরের জায়গা এবং ২ হাজার ৮৫০টি সংরক্ষিত কবর। পাঁচ একর আয়তনের খিলগাঁও কবরস্থানে প্রায় ৪ হাজার কবরের জায়গা থাকলেও সেখানে কবর সংরক্ষণের কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে ১৭ দশমিক ২৬ একর আয়তনের জুরাইন কবরস্থানে রয়েছে প্রায় ১২ হাজার কবরের জায়গা। এর মধ্যে ২ হাজার ৭০০টি কবর সংরক্ষিত, যার প্রায় ২০০টি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। এছাড়া মুরাদপুর ও ধলপুর এলাকায় ৯৭ শতাংশ জমিতে রয়েছে আরও ৯০০টি সাধারণ কবরের জায়গা।
ডিএসসিসিতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৭ হাজার লাশ দাফন করা হয়। প্রতিটি লাশ দাফনের জন্য করপোরেশন নির্ধারিত রেজিস্ট্রেশন ফি ১ হাজার টাকা। এছাড়া কবর খনন, বাঁশ ও চাটাই বাবদ করপোরেশন অনুমোদিত ইজারাদারের মাধ্যমে বড় কবরের জন্য ৭০৮ টাকা, মধ্যম কবরের জন্য ২০৭ থেকে ৭০৮ টাকা, ছোট কবরের জন্য ২০৮ টাকা এবং মৃতজন্ম শিশুর জন্য ২০ টাকা ফি নেওয়া হয়।
তিনটি কবরস্থানেই কবর সংরক্ষণের ফি একই। ১০ বছরের জন্য ৫ লাখ, ১৫ বছরের জন্য ১০ লাখ, ২০ বছরের জন্য ১৫ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য ২০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বর্তমানে তিনটি কবরস্থানেই নতুন করে কবর সংরক্ষণের কোনো জায়গা নেই। সংরক্ষিত কবরের ক্ষেত্রে স্বজনেরা চাইলে নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে সেখানে পুনরায় দাফন করতে পারেন। তবে পিতা, মাতা, ভাই, বোন, পুত্র ও কন্যা ছাড়া অন্য কাউকে সংরক্ষিত কবরের ওপর পুনরায় দাফনের সুযোগ নেই।
ডিএসসিসির তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত কবরস্থান ও শ্মশান খাত থেকে সিটি করপোরেশনের আয় হয়েছে ১ কোটি ২২ লাখ ১৪ হাজার ৫০০ টাকা। এর আগে ২০২৫ সালে আয় হয়েছে ২ কোটি ৬৮ লাখ ৫০ হাজার ৫০০ টাকা, ২০২৪ সালে ৩ কোটি ৩৭ লাখ ২৬ হাজার টাকা, ২০২৩ সালে ৮ কোটি ৬১ লাখ ৫০ হাজার ৪৭২ টাকা, ২০২২ সালে ৩ কোটি ৮৭ লাখ ৮৯ হাজার টাকা এবং ২০২১ সালে ১ কোটি ৩৫ লাখ ২৩ হাজার টাকা। তবে কবরস্থান ও শ্মশান খাত থেকে অর্জিত এই অর্থ আলাদাভাবে ব্যয় করা হয় না। সিটি করপোরেশনের অন্যান্য রাজস্বের সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন খাতে তা ব্যয় করা হয়।
ডিএসসিসির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের কবরস্থানের সংকট রয়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় আরও জায়গা প্রয়োজন। নতুন কবরস্থান স্থাপনের জন্য সম্প্রতি ঢাকার জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে আশ্বস্ত করা হয়েছে। নতুন কবরস্থানের জন্য জায়গা পাওয়া গেলে বিদ্যমান কবরস্থানগুলোর ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।’
এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাধীন ছয়টি কবরস্থানে বছরে গড়ে প্রায় ৬ হাজার লাশ দাফন করা হয়। সাধারণ কবরের জন্য রেজিস্ট্রেশন ফি ৫০০ টাকা। এর সঙ্গে বাঁশ ও চাটাই বাবদ ইজারা মূল্য হিসেবে কবরের ধরন অনুযায়ী ২৩৫ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ৪৮৭ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। তবে দুস্থ ও অসহায়দের জন্য ১০০ টাকায় নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে।
ডিএনসিসির তথ্যানুযায়ী, কবরস্থান খাত থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আয় হয়েছে ৫ কোটি ২০ লাখ ৯৬ হাজার ১০০ টাকা। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৪ কোটি ৫৭ লাখ ২০ হাজার ৪ টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭ কোটি ২৯ লাখ ৩৭ হাজার ৩৮১ টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭ কোটি ১২ লাখ ৬৭ হাজার ৮০০ টাকা এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ১০ কোটি ৩৬ লাখ ৯ হাজার ৯০০ টাকা রাজস্ব খাতে জমা পড়েছে।
উত্তর সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিটি কবরস্থানেই কবর সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও স্থান প্রাপ্যতা সাপেক্ষে ১৫ ও ২৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণ করা যায়। এ জন্য গুনতে হয় মোটা অঙ্কের ফি। পাশাপাশি বিশেষ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তি বা সরকারের উচ্চপর্যায়ের সুপারিশের ভিত্তিতেও কবর সংরক্ষণের সুযোগ মিলছে বলে জানা গেছে।
ডিএনসিসির তথ্যানুযায়ী, কবর সংরক্ষণে কবরস্থানভেদে নির্ধারিত রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ফি। বনানী কবরস্থানে ১৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণে দিতে হয় ১ কোটি টাকা, আর ২৫ বছরের জন্য ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে ১৫ বছরের জন্য ৭৫ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য ১ কোটি টাকা, উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে যথাক্রমে ৫০ লাখ ও ৭৫ লাখ টাকা এবং উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরে ৩০ লাখ ও ৫০ লাখ টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে ১৫ বছরের জন্য ২০ লাখ ও ২৫ বছরের জন্য ৩০ লাখ টাকা এবং রায়েরবাজার বধ্যভূমিসংলগ্ন কবরস্থানে ১৫ বছরের জন্য ১০ লাখ ও ২৫ বছরের জন্য ১৫ লাখ টাকা দিতে হয়। তবে কেউ সাধারণ কবর সংরক্ষণ করতে চাইলে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে নির্ধারিত সংরক্ষণ ফির তিন গুণ অর্থ পরিশোধ করতে হয়। অন্যদিকে, মুক্তিযোদ্ধাদের কবর মৃত্যুর পর ১০ বছরের জন্য কোনো ফি ছাড়াই সংরক্ষণের সুবিধা রয়েছে।
ডিএনসিসির এক কর্মকর্তা জানান, গুলশান, বারিধারা ও বনানী এলাকায় তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছল মানুষের বসবাস বেশি। এসব এলাকার বাসিন্দাদের পরিবারের কেউ মারা গেলে অনেকেই কবর দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করতে চান। মূলত কবর সংরক্ষণে নিরুৎসাহিত করতেই ফি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফি বাড়ানোর পর কবর সংরক্ষণের চাহিদা আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে বলেও জানান তিনি।
সূত্র জানায়, ডিএনসিসির আওতাধীন কবরস্থানগুলোর মোট আয়তন ১৯২ একর। এর মধ্যে বনানী কবরস্থানে রয়েছে ৯ হাজার ৯৬৫টি কবর, উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে ১ হাজার ৭৪টি, উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে ১ হাজার ৯৯৮টি, উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরে ১ হাজার ২৬৩টি, রায়েরবাজার কবরস্থানে ৭০ হাজার ৫৮৩টি এবং মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে ২৪ হাজার ২০৪টি কবর। এসব কবরস্থানে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৬ হাজার লাশ দাফন করা হয়। এছাড়া দক্ষিণখানের চামুড়খান এলাকায় আরও ৪৮৪টি কবর তৈরির প্রক্রিয়া চলছে। তবে এসব কবর এখনো সিটি করপোরেশনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়নি।
সূত্র আরো জানায়, কবর সংরক্ষণের জন্য প্রতি তিন মাসে গড়ে ৩৫ থেকে ৪০টি আবেদন জমা পড়ে। কবরস্থানে জায়গা খালি থাকা সাপেক্ষে সাধারণত এসব আবেদন অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে বনানী কবরস্থানের ক্ষেত্রে নিয়ম কিছুটা ভিন্ন। সেখানে জায়গার সংকট থাকায় চাইলেই সবাইকে কবর সংরক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয় না। কবর মেয়াদে সংরক্ষণ ও পাকাকরণসংক্রান্ত নয় সদস্যের একটি কমিটি আবেদন যাচাই-বাছাই করে বিশেষ বিবেচনায় অনুমোদন দিয়ে থাকে।
সংরক্ষণের ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃত বা বরেণ্য ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সাবেক মেয়র, স্বাধীনতা ও একুশে পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তি, খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা, জাতীয় অধ্যাপক এবং বিদেশ থেকে রাষ্ট্রীয় বা সম্মানসূচক খেতাবপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা। এ ছাড়া সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বা অবদান রাখা ব্যক্তি, পদস্থ কর্মকর্তা এবং বিশেষ বিবেচনায় অন্য ব্যক্তির কবরও সংরক্ষণের অনুমোদন দেওয়া হতে পারে। তবে এ ধরনের অনুমোদন সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত নীতিমালা ও বিবেচনার ভিত্তিতে দেওয়া হয়।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ঢাকায় জমির তীব্র সংকটের কারণেই কবর সংরক্ষণের ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। নগরের অন্যান্য নাগরিক সেবার মতো কবরস্থান ব্যবস্থাপনাতেও দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। ফলে শোক ও আবেগের মুহূর্তে প্রিয়জনের শেষ ঠিকানাটি সংরক্ষণ করতে গিয়ে অধিকাংশ নগরবাসীকে আর্থিকভাবে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাদের মতে, ঢাকার কবরস্থানগুলোর অবস্থান ও ব্যবস্থাপনাও যথেষ্ট পরিকল্পিত নয়।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘ঢাকা শহরে কবরের জায়গা খুবই দুষ্প্রাপ্য হয়ে গেছে। ফলে কবর সংরক্ষণ করতে অনেক বেশি ফি দিতে হচ্ছে। এর মূল কারণ, নগর পরিকল্পনায় এলাকাভিত্তিক কবরস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা রাখা হচ্ছে না।’
তিনি বলেন, কয়েকটি বড় কবরস্থানের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে পাড়া বা ওয়ার্ডভিত্তিক কবরস্থান গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে মানুষ সহজে স্বজনদের কবর জিয়ারত করতে পারবে এবং কবর সংরক্ষণের খরচও তুলনামূলকভাবে কমে আসবে। কবর মানুষের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিটি ওয়ার্ডে কবরস্থানের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি নতুন আবাসিক প্রকল্পে কবরস্থানের জন্য নির্ধারিত জায়গা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে কবরস্থানের সরবরাহ বাড়বে এবং স্বাভাবিকভাবেই সংরক্ষণ ফিও কমে আসবে।
কবর সংরক্ষণের জন্য এত বেশি ফি কতটা যৌক্তিক—এ প্রশ্নের জবাবে আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, জায়গার সংকটের কারণেই কবর সংরক্ষণের ফি এত বেশি। তবে শুধু ফি কমিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না। বরং ফি কমালে সংরক্ষণের চাহিদা আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই আগে কবরস্থানের সংখ্যা ও জায়গা বাড়াতে হবে। সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের আবাসন ও নগর উন্নয়ন প্রকল্পে কবরস্থানের জন্য নির্ধারিত জায়গা রাখার ব্যবস্থা করা হলে ধীরে ধীরে কবর সংরক্ষণের উচ্চ ফিও কমে আসবে।
ইসলামে কবর সংরক্ষণ কতটা জরুরি
দীর্ঘমেয়াদি কবর সংরক্ষণ নিয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এবং ব্যয়বহুল কবর সংরক্ষণ ইসলামের শিক্ষা ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—এ বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গবেষণা বিভাগের মুফতি মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, ইসলামে কবর সংরক্ষণ জায়েজ হলেও তা শরিয়তে জরুরি নয়। বিশেষ কোনো ব্যক্তি, যেমন বড় কোনো আলেম, অলি, ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব বা জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কবর সংরক্ষণের বৈধতা রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে কবর সংরক্ষণ না করাই শরিয়তের দৃষ্টিতে উত্তম।
তিনি বলেন, ব্যক্তিগত বা পারিবারিকভাবে কবর সংরক্ষণের সুযোগ থাকলে তা রাখা যেতে পারে। তবে মানুষের বসবাস, কৃষিকাজসহ জরুরি প্রয়োজনে জায়গার সংকট তৈরি করে ব্যাপকভাবে কবর সংরক্ষণ করা সমীচীন নয়। কারণ সবাই যদি দীর্ঘদিনের জন্য কবর সংরক্ষণ করতে থাকে, তাহলে একসময় বিপুল পরিমাণ জায়গা কবরস্থানে পরিণত হবে। ঐতিহাসিক প্রয়োজন বা বিশেষ ব্যক্তির ক্ষেত্রে কবর সংরক্ষণ করা যেতে পারে, তবে সেটিও অপরিহার্য নয়।