ডিএনসিসির একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, ডিএনসিসির অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি হিসেবে তার পুরনো প্রভাব কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন তিনি। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান শুরু হওয়ায় এবং বর্তমান প্রশাসকের কঠোর অবস্থানের কারণে তার স্বপদে ফেরার পথ অনেকটাই কঠিন হয়ে উঠেছে।
চলতি বছরের ৮ মার্চ ডিএনসিসি সচিব মুহাম্মদ আসাদুজ্জামানের স্বাক্ষরে জারি করা অফিস আদেশে মোহাম্মদ আরিফুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ ২০২৫, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫ লঙ্ঘন করে তিনি ক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। এর ফলে ডিএনসিসি কর্মচারী চাকরি বিধিমালা ২০১৯-এর বিধি ৪৯-এর (ক), (খ), (ঘ), (ঙ) ও (চ) উপবিধি অনুযায়ী দায়িত্ব পালনে অবহেলা, অসদাচরণ, অদক্ষতা, দুর্নীতিপরায়ণতা এবং তহবিল তসরুপ বা প্রতারণার দায়ে একই বিধিমালার ৫৫(১) উপবিধি মোতাবেক তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আদেশে আরও বলা হয়, তিনি বিধিমোতাবেক খোরাকি ভাতা পাবেন এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে এ আদেশ জারি করা হয়েছে।
.png)
এর মাত্র কয়েকদিন আগে, ২৬ ফেব্রুয়ারি অঞ্চল-৫-এর ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমানকেও সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারকাজে ভয়াবহ অনিয়ম, জালিয়াতি ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে বিভাগীয় মামলা দায়ের হয়েছে। আর আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। দুই প্রকৌশলীর বরখাস্তের ঘটনা ডিএনসিসির প্রকৌশল বিভাগে এক ধরনের আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের ক্ষমতাধর কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ আরিফুর রহমান ছিলেন এ সংগঠনের সভাপতি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গত এক বছরে তৎকালীন প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের আমলে প্রকৌশলী আরিফুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমানের সিন্ডিকেট ই-জিপি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ব্যাপক জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা লোপাটের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। নগরীতে রাস্তা, ড্রেন, ফুটপাত উন্নয়ন ও সংস্কারের নামে অর্ধশতাধিক নথি নিজেরাই অনুমোদন করেন। আইন ও বিধিমোতাবেক সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়নি এসব ক্ষেত্রে। অঞ্চল-৫-এ মিজানুর রহমান একাই ৫৯টি কাজের টেন্ডার আহ্বান করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এসব টেন্ডারের মধ্যে অনেকগুলোতে প্রয়োজনীয় আর্থিক, প্রশাসনিক ও কারিগরি অনুমোদন ছিল না। পরে অনেক টেন্ডার বাতিলও করা হয়। আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ছাদেকুর রহমান যিনি এজাজের অলিখিত উপদেষ্টা ও মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি এখনো ধরাছোয়ার বাইরে রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমান প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান গত ২৫ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পরই ডিএনসিসি তীব্র আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হয়। সাধারণ তহবিলে ক্যাশ স্থিতি মাত্র ২৫ কোটি টাকায় নেমে আসে, যা ডিএনসিসির ইতিহাসে সর্বনিম্ন বলে জানা যায়। বিভিন্ন তহবিলের ফিক্সড ডিপোজিট ৮২৫ কোটি টাকা থাকলেও তা আপৎকালীন দায় মেটানোর জন্য সংরক্ষিত ছিল। সাবেক প্রশাসক এজাজের আমলে উচ্চাভিলাসী প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের নামে সাধারণ তহবিল থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়ার চিত্র সামনে আসে।
জানা গেছে, বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান এ বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অবহিত করেন। নগর ভবনে এখন ‘এজাজ-আরিফ-মিজান সিন্ডিকেট’-এর বিরুদ্ধে নতুন প্রশাসকের সরাসরি ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে। অনেকে বলছেন, নতুন প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই টপ টু বটম অনিয়ম খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছেন।
সাময়িক বরখাস্তের পর আরিফুর রহমান নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খানের কাছে লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মঈন উদ্দিন দেশের বাইরে থাকায় গত ১৩ থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি প্রধান প্রকৌশলীর অতিরিক্ত দায়িত্বে ছিলেন। ওই সময় বিভিন্ন অঞ্চল ও বিভাগের দরপত্র মূল্যায়নের কাজ করতে হয়েছে তাকে। এ কাজে তিনি বিভিন্ন অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলীর ল্যাপটপে প্রধান প্রকৌশলীর আইডিতে ঢুকে কাজ করেছিলেন বলে দাবি করেন। যে ১৫টি দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়মের কারণে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর সুপারিশ তার দায়িত্বের সময় শেষ হওয়ার পর অর্থাৎ ২৮ জানুয়ারি বিকেল ৫টার পর থেকে পরদিন ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে খুব দ্রুততার সঙ্গে করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ওই সময় পর্যন্ত ই-জিপির সিস্টেমে তার নাম কীভাবে থেকে গেছে তা তিনি জানেন না বলে দাবি করেন।
একটি দরপত্রের সুপারিশও তিনি করেননি দাবি করে আরিফুর রহমানের অভিযোগ, অঞ্চল-৫-এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বিভিন্ন দরপত্রের প্রক্রিয়ায় নিজেই দরপত্র আহ্বানকারী ও নিজেই অনুমোদনকারী হিসেবে ‘ওয়ার্ক ফ্লো’ তৈরি করেছেন। মাঝে মূল্যায়নের ধাপটিতে মিজানুর তার আইডি ও পাসওয়ার্ড হ্যাক করে মূল্যায়নের সুপারিশগুলো করেছেন। আরিফুর রহমান আরও দাবি করেন, মিজানের এমন প্রতারণা শুধু তার দায়িত্বে থাকার সময়েই হয়নি। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মঈন উদ্দিনের দায়িত্বের সময়ও ৩৩টি দরপত্র প্রক্রিয়ায় একই ধরনের জালিয়াতি ও প্রতারণা করেছেন মিজানুর রহমান। তাই এই ঘটনা পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি প্রশাসকের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে। সাময়িক বরখাস্তের পর প্রাপ্ত অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ তথ্য-প্রমাণ এবং সিন্ডিকেটের কার্যক্রম সম্পর্কিত বিভিন্ন নথিপত্রের ভিত্তিতে দুদক প্রাথমিক অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে। অনুসন্ধানে তার ব্যক্তিগত সম্পদ, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা, সিন্ডিকেটের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সম্ভাব্য অর্থ পাচারের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দুদকের নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নেওয়ার পর এ ধরনের মামলা ও অভিযোগগুলোতে নতুন গতি এসেছে। কমিশন ইতোমধ্যে অনেক পুরনো অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করেছে এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতির বিষয়ে বিশেষ নজর দিচ্ছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। জনগণের টাকা লোপাটের সঙ্গে জড়িত যে কেউই হোক, আইনের আওতায় আনা হবে। কেউ পেছনের দরজা দিয়ে ফিরে আসার চেষ্টা করলেও তা সফল হবে না। আমরা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে নগর উন্নয়ন এগিয়ে নেব। ‘কথা কম, কাজ বেশি’—এই নীতিতেই ডিএনসিসি চলবে।
ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তদন্ত চলমান। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। বিভাগীয় মামলা ও দুদকের অনুসন্ধানের ফলের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ বিষয়ে বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি ও জালিয়াতির এ ধরনের ঘটনা জনগণের আস্থা নষ্ট করে। ডিএনসিসির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ উদ্বেগজনক। দুদকের অনুসন্ধান দ্রুত, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গভাবে সম্পন্ন করে দায়ীদের বিচার এবং লোপাট হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সাময়িক বরখাস্ত নয়, কাঠামোগত সংস্কার, স্বচ্ছ টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে এ ধরনের সিন্ডিকেট বারবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও পেশাদারিত্বপূর্ণ করে গড়ে তুলতে হবে।