দেশব্যাপী তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে জনমনে ক্ষোভের সঞ্চার হচ্ছে। দিনের সিংহভাগ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন। নীতি-নির্ধারকেরাও স্বীকার করছেন যে, এই সংকটের কোনো জাদুকরী সমাধান নেই। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে এবং নতুন জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তুলতে অন্তত দুই বছর সময়ের প্রয়োজন হতে পারে।
জ্বালানি খাতের এই বিপর্যয়ের মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। বিগত এক দশকে নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে বড় কোনো বিনিয়োগ বা কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ২০১৬-১৭ সালেও দেশীয় উৎস থেকে যেখানে দৈনিক প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত, তা বর্তমানে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৫০ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি।
.png)
অন্যদিকে দেশে দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে বর্তমানে সরবরাহ ২২০ থেকে ২৩০ কোটি ঘনফুট। এই বিশাল ঘাটতি মেটানোর প্রধান ভরসা ছিল আমদানিকৃত এলএনজি। কিন্তু সমুদ্রের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ইউনিট প্রতি এলএনজির দাম ১০ ডলার থেকে লাফিয়ে ২২ ডলারে উন্নীত হওয়ায় সরকারের পক্ষে নিয়মিত কার্গো কেনা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। স্পট মার্কেট বা খোলাবাজার থেকে জরুরি ভিত্তিতে যে গ্যাস কেনার পরিকল্পনা ছিল, ডলার সংকটের কারণে তাও সময়মতো করা যাচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় ১৪৩টি ইউনিটের মধ্যে অর্ধেকের কাছাকাছি ইউনিট বন্ধ বা আংশিক সচল রাখতে হচ্ছে।
তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ একে অপরের বিকল্প হিসেবে কাজ করে। গ্যাসের এই বিকল্প হিসেবে শিল্পকারখানাগুলো এখন অতিমাত্রায় ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের ওপর নির্ভর করছে। জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখতে গিয়ে কারখানাগুলোর উৎপাদন খরচ আগের চেয়ে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে। ফলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা মার খাচ্ছে। এই বাড়তি চাহিদার কারণে সরকারি তেল কোম্পানিগুলোর জ্বালানি তেল বিক্রির পরিমাণও হঠাৎ করে ২৫ শতাংশ বেড়ে গেছে, যা দেশের সামগ্রিক আমদানি ব্যয়ের ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার জরুরি সেবা ছাড়া সব ধরনের বিপণিবিতান ও শপিংমল রাত আটটার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ জারি করলেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটের টেকসই সমাধান করতে হলে আমদানিনির্ভর ভুল নীতি থেকে অবিলম্বে সরে আসতে হবে। স্থলভাগ ও বঙ্গোপসাগরের গভীর তলদেশে দ্রুত নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে বড় ধরনের বিনিয়োগ নিশ্চিত করাই একমাত্র দীর্ঘমেয়াদি পথ। পাশাপাশি সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি দ্রুত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর জ্বালানি খাত ও বড় অঙ্কের বকেয়া পাওনার কারণে সংকট গভীর হয়েছে। পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে নিয়ন্ত্রণে আসবে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, চলমান গ্যাস বিদ্যুৎ সংকট শিল্প ও অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যা, বিকল্প এলএনজি কার্গো সংগ্রহে জটিলতা এবং সরবরাহ পরিকল্পনার দুর্বলতায় গ্যাসনির্ভর শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, কৌশলগত জ্বালানি মজুত, উৎস বহুমুখীকরণ এবং বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পর্যালোচনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের কথা বলেন তিনি।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, বছরের পর বছর ধরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে চরম অবহেলা করে শুধু আমদানিনির্ভর ব্যবসা খোঁজার কারণেই আজ পুরো জাতিকে এই খেসারত দিতে হচ্ছে। এলএনজি আমদানি একটি সাময়িক উপশম মাত্র, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। দেশের অভ্যন্তরে ও সাগরে নতুন কূপ খনন করতে হবে এবং জ্বালানি খাতের অস্বচ্ছ ক্যাপাসিটি চার্জের নীতি পুরোপুরি বাতিল করতে হবে।
তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ-এর সাবেক সভাপতি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, গ্যাসের চাপ না থাকায় আমাদের কারখানাগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা অনেকটাই কমে গেছে। এই মুহূর্তে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই খাত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।