প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উদ্ভিদপ্রেমী, সংগ্রাহক ও শিক্ষার্থীরা ছুটে আসছেন বিচিত্র আকৃতি ও রঙের ক্যাকটাসের টানে। এমনকি বিভিন্ন নামিদামি নার্সারির লোকজনও এখান থেকে ক্যাকটাস সংগ্রহের জন্য যোগাযোগ করছেন। অনেকগুলো ভ্যারাইটি মিলিয়ে প্যাকেজ আকারেও কিনে নিচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
মাদারীপুর সদর উপজেলার মোস্তফাপুর এলাকায় অবস্থিত হর্টিকালচার সেন্টার ঘুরে দেখা গেছে, হর্টিকালচারের মধ্যে নির্দিষ্ট একটি স্থানে ক্যাকটাসের বিচিত্র সমাহার। যেখানে সারি সারি সাজানো রয়েছে ছোট-বড়, গোলাকার, লম্বাটে, লাল, সবুজ হলুদ, বেগুনিসহ নানা বর্ণের বিশেষ ক্যাকটাস। এর মধ্যে কোনোটায় কাঁটাভর্তি, কোনোটায় কাঁটা নেই। যা দেখে যে কারোরই মন জুড়িয়ে যাবে।
.png)
হর্টিকালচার সেন্টার সূত্র জানায়, দুই বছর ধরে এখানে ক্যাকটাস সংগ্রহের কাজ চলছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়াগা থেকে এ পর্যন্ত ২১০ প্রজাতির ক্যাকটাস সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। এ ক্যাকটাস অধিকাংশই ছিল আমদানি নির্ভর। অনেক উচ্চমূল্যে চাষিদের কিনতে হতো। পরে হর্টিকালচারে চারা উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এরপর বিভিন্ন ধরনের উচ্চমূল্যে জার্ম সংগ্রহ করে উৎপাদন শুরু করে উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা। প্রথমে বীজ উৎপাদন করা হয় এবং বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে ক্রসিং করে নতুন নতুন ভেরিয়েশন তৈরি করা হয়।
এছাড়া দেশ-বিদেশের বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করা মাতৃগাছ থেকে গ্রাফটিং, স্টেম কাটিং পদ্ধতিতে নতুন জাত উৎপাদন করা হচ্ছে। বর্তমানে এ সেন্টারে সংরক্ষিত ক্যাকটাসের সংখ্যা প্রায় ২ হাজারের মতো। ইতিমধ্যে বিক্রয়যোগ্য ৬০ প্রজাতির ক্যাকটাস কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এটা শুধু মাদারিপুরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, সারা দেশ থেকে উদ্যোক্তরা সংগ্রহ করছেন। বিশেষ করে ছাত্র বা কমবয়সী লোক যারা ক্যাকটাস পছন্দ করে তারা সংগ্রহ করছে। এমনকি বিভিন্ন নামিদামি নার্সারির লোকজনও এখান থেকে ক্যাকটাস সংগ্রহের জন্য যোগাযোগ করছেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্যাকেজ আকারে ৫০ ভ্যারাইটি নিয়ে নেন। গত বছর ক্যাকটাস বিক্রি করে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা আয় হয়েছে।
সূত্র জানায়, বর্তমানে সংগ্রহে থাকা উল্লেখযোগ্য প্রজাতির মধ্যে রয়েছে চকলেট ক্যাকটাস, পদ্মসেজী, ওপানশিয়া, ইউফরবিয়া টুলিয়রেনসিস, ডিভাইন ক্যাকটাস, বিশপ’স ক্যাপ ক্যাকটাস, র্যাটস টেইল ক্যাকটাস, ফেইরি ক্যাসেল, অ্যাস্ট্রোফাইটাম, রেইনবো ক্যাকটাস, ওল্ড লেডি, ওল্ড ম্যান, হেমাটো ক্যাকটাস, ব্রেইন ক্যাকটাস, পিনাট ক্যাকটাস, ব্যানানা ক্যাকটাস, বান্নি ক্যাকটাস, ইচিনোপসিস, ক্যাটস টেইল ক্যাকটাস, স্টেপেলিয়া, জিমনোক্যাকটাস, ফেরো ক্যাকটাস, গোল্ডেন ব্যারেল, লাভাভিয়া, নটো ক্যাকটাস, ম্যামিলারিয়া, অ্যাস্ট্রোফাইটাম, ফেইরি ক্যাসেল, প্যারোডিয়া, কোরাল ক্যাকটাস, ওপানশিয়া, ইউফোরবিয়া, লেডি ফিঙ্গারসহ আরও অনেক বিরল ও আকর্ষণীয় প্রজাতি।
হর্টিকালচারে ঘুরতে আসা বেলাল হোসেন বলেন, মাদারীপুরে এমন একটি বৈচিত্র্যময় ক্যাকটাস সংগ্রহশালা গড়ে ওঠায় জেলার পরিচিতি নতুন মাত্রা পেয়েছে। পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা অনেকেই ক্যাকটাস কিনে বাড়ি ফিরছেন। শিশু-কিশোরদের কাছেও এটি প্রকৃতি ও উদ্ভিদ সম্পর্কে জানার একটি আকর্ষণীয় শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। একই সাথে বাড়ছে ক্যাকটাসের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও।
মাদারীপুরের মাদ্রা এলাকার গাছপ্রেমী সোহাগ হাওলাদার বলেন, আগে বিরল প্রজাতির ক্যাকটাস সংগ্রহ করতে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে যেতে হতো। এখন মাদারীপুরেই একসঙ্গে দুই শতাধিক প্রজাতির ক্যাকটাস পাওয়া যাচ্ছে। এতে সময় ও খরচ দুই-ই সাশ্রয় হচ্ছে। নিজের পছন্দ অনুযায়ী হরেক প্রজাতির ক্যাকটাস সংগ্রহ করা যাচ্ছে।

মাদারীপুর হটিকালচারের উপ-পরিচালক আশুতোষ কুমার বিশ্বাস বলেন, হর্টিকালচারের উদ্যোগে আমরা দুই বছর ধরে ক্যাকটাস সংগ্রহ করছি। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়াগা থেকে এ পর্যন্ত ২১০ প্রজাতির ক্যাকটাস সংগ্রহ করেছি। এ ক্যাকটাস অধিকাংশই ছিল আমদানি নির্ভর। অনেক উচ্চমূল্যে চাষিদের কিনতে হতো। পরে আমরা নিজেরাই উৎপাদন করার সিদ্ধান্ত নেই। আমরা প্রথমে বীজ উৎপাদন করছি এবং বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে ক্রসিং করে আমরা নতুন ভেরিয়েশন তৈরি করেছি। এছাড়া গ্রাফটিংয়ের মধ্যেমেও কিছু কিছু নতুন জাত উৎপাদন করছি।
তিনি আরো বলেন, বতমানে সংরক্ষিত ক্যাকটাসের সংখ্যা প্রায় ২ হাজারের মতো। বিক্রয়যোগ্য ৬০ প্রজাতির ক্যাকটাস কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করেছি। গত বছর ক্যাকটাস বিক্রি করে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা আয় হয়েছে। প্রথমে ধারণা ছিল গ্রাম এলাকায় ক্যাকটাস চলবে কি না। পরে দেখলাম শুধু গ্রাম এলাকায় সীমাবদ্ধ না, সারা বাংলাদেশের মানুষ আসছে। আমরাও বীজ থেকে প্রচুর চারা উৎপাদন করছি। আর ক্যাকটাস চাষ আন্যান্য ফসলের চেয়ে তুলনামূলক সহজ। ক্যাকটাসের গ্রথ খুব ধীর। আর এই ধীরগতির জন্যই আমরা হোমস্টেটে হাউজপ্লান্ট হিসেবে কালচার করতে পারি। আর কালচার মিডিয়া সম্পূর্ণ মাটি বিহীন। মোটাদানা বালি, ইটের চিপস, জৈবসার, কিছু পরিমাণ থামি কম্পোষ্ট, পাতাপচা সার, ডিমের খৈল, হাড়ের গুড়া দিয়ে করতে পারে। আর শীতকালে সপ্তাহে একদিন এবং গরমে সপ্তাহে দুই দিন সেচ দিলেই চলবে। মাসে একদিন কিটনাশক স্প্রে করতে হবে। আর এই যে যত নতুন নতুন জাত উৎপাদন হচ্ছে ততো আমরা ভেরিয়েশন তৈরি করতে পারবো মূল্যবান ও অধিক জনপ্রিয় হবে।
তিনি বলেন, এটা মূলত সৌখিন জিনিস। বেষ্ট হাউজপ্লান্ট হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। এছাড়া ক্যাকটাসে পুরো রোদ লাগে না, বৃষ্টির পানি সহ্য করতে পারে না। এজন্য শহরে যারা থাকে তারা এটা ব্যালকনিতে কম আলোতে রাখতে পারে। সরকারি রেট মাল্টিফিকেশন করে বিভিন্ন চারা উৎপাদন করে টবসহ ১০০ টাকায় বিক্রি করি। এই ক্যাকটাসগুলোই নার্সারি থেকে কিনতে গেলে ন্যূনতম ৩০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা খরচ করতে হয়। বাণিজ্যিকভাবে হিসেবে করলেও এর সম্ভবনা বেশ ভালো।