রাজধানীর সড়কে এখন আর শুধু যানজট নয়, চলছে এক বিষাক্ত ঝড়। পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন বাস, ট্রাক, লঞ্চ ও কারখানার কালো ধোঁয়া যেন ঝড়ের মতো ছুটে বেড়াচ্ছে রাজপথে। এই ধোঁয়া শুধু চোখ জ্বালায় না, ফুসফুসের গভীরে ঢুকে শ্বাসকষ্ট, কাশি ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিদিন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নগরবাসীকে বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও আইকিউএয়ারের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, গত জুলাইয়ের শেষেও ঢাকা বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকায় পঞ্চম স্থানে ছিল। বর্ষাকালেও বায়ুমানের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। এই বিষাক্ত ঝড়ের মূল উৎস শুধু বাস নয়—কারখানা, লঞ্চ, ইটভাটা ও নির্মাণস্থলের ধুলাও সমানভাবে দায়ী।
.png)
পরিবেশ অধিদপ্তরের সূত্র জানায়, ঢাকার বায়ুদূষণের বড় অংশ আসে পুরোনো ডিজেল ইঞ্জিনচালিত যানবাহন থেকে। ৪১৮টি বাস রুটের মধ্যে মাত্র ৯৮টি সচল থাকলেও এসব রুটে চলাচল করছে বিপুলসংখ্যক ফিটনেসবিহীন বাস। এসব বাস থেকে নির্গত সূক্ষ্ম কণা (পিএম ২.৫) মানুষের ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে।
একই সঙ্গে নদীপথে চলাচলকারী পুরোনো লঞ্চ ও জাহাজ, রাজধানীর আশপাশের স্টিল মিল, সিমেন্ট কারখানা এবং ইটভাটা থেকেও কালো ধোঁয়া ছড়াচ্ছে। নির্মাণস্থলের উন্মুক্ত ধুলা ও খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো এই দূষণকে আরও তীব্র করে তুলছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (বায়ুমান) জিয়াউল হক বলেন, দেশের বায়ুদূষণের ৭০ শতাংশ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসে। এর মধ্যে যানবাহন, ইটভাটা, নির্মাণধুলা ও শিল্পকারখানা অন্যতম। প্রতি বছর শহরাঞ্চলে দূষণ ১ থেকে ২ শতাংশ হারে বাড়ছে।
গত কয়েক বছরে এই বিষাক্ত ঝড়ের প্রভাব সরাসরি দেখা যাচ্ছে হাসপাতালগুলোতে। জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানান, শীত ও দূষণের তীব্র সময়ে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস ও সিওপিডি রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
একজন সিনিয়র বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ বলেন, কালো ধোঁয়ায় থাকা সূক্ষ্ম কণা ফুসফুসের অ্যালভিওলায় জমা হয়। এতে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ তৈরি হয়, যা হাঁপানি ও সিওপিডিতে রূপ নেয়। শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে নিউমোনিয়া ও অ্যালার্জির প্রবণতা বেড়েছে। গর্ভবতী নারী ও নবজাতকের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
হাসপাতালের কেস স্টাডিতে দেখা গেছে, নিয়মিত সড়কে চলাচলকারী পথচারী, রিকশাচালক ও ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের মধ্যে চোখ জ্বালা, কাশি ও শ্বাসকষ্টের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন বিষাক্ত বাতাসে শ্বাস নিলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিও বাড়ে।
বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন থাকলেও এর প্রয়োগ দুর্বল। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ৬ ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে—স্বাস্থ্যহানিকর বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ধোঁয়া বা গ্যাস নিঃসরণকারী যানবাহন চালানো যাবে না। বিধি দ্বারা নির্ধারিত মানমাত্রা অতিক্রমকারী ধোঁয়াকে স্বাস্থ্যহানিকর হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। মহাপরিচালক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি যেকোনো যানবাহন থামিয়ে পরীক্ষা করতে, আটকাতে বা জব্দ করতে পারবেন।
মোটরযান অধ্যাদেশ, ১৯৮৩-এর ১৫০ ধারায়ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টিকারী ধোঁয়া নির্গমনকারী মোটরযান চালানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এবং বায়ুদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২২-এ নির্গমন মানমাত্রা নির্ধারণ করে কঠোর ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। উচ্চ আদালতও বারবার কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহন জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে এসব আইন ও নির্দেশনার প্রয়োগ খুবই সীমিত।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার (ট্রাফিক-উত্তর) আ স ম শামসুর রহমান ভূঁঞা জানান, পরিবেশদূষণ রোধ ও কালো ধোঁয়া নির্গমন বন্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। শব্দদূষণ রোধে অবৈধ হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করা হচ্ছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিসুর রহমান বলেন, গত জুলাইয়ে রাজধানীতে কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে ৯১৫টি মামলা হয়েছে। বিআরটিএ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে যৌথ চেকপোস্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে শুধু মামলা দিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু সম্প্রতি বলেছেন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। পুরোনো যানবাহন অপসারণ, নির্মাণস্থলে ধুলা নিয়ন্ত্রণ এবং শিল্পকারখানার নির্গমন মানমাত্রা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলামও জানিয়েছেন, জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বয় বাড়ানো হয়েছে। বিআরটিএ জানিয়েছে, ফিটনেস অনুপযোগী ও পরিবেশদূষণকারী মোটরযান সড়কে চলতে পারবে না। এক হাজারের বেশি পুরোনো বাস অপসারণের সিদ্ধান্তও হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান নয়।
পরিবেশবাদী সংগঠন বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান যথেষ্ট নয়। উৎস নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি মান উন্নয়ন, পুরোনো যানবাহন স্ক্র্যাপিং এবং জনসচেতনতা—এই সাতটি ধাপ একসঙ্গে অনুসরণ করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, দূষণকারী কারখানা ও যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
আইনজীবীরাও একই সুরে বলছেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ৬ ধারা ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগ না হলে আদালতের নির্দেশও কাগজে-কলমেই থেকে যাবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, রাজপথ থেকে পুরোনো যানবাহন ধাপে ধাপে সরিয়ে দেওয়া, বাধ্যতামূলক নির্গমন পরীক্ষা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং নির্মাণস্থলে ধুলা নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এই বিষাক্ত ঝড় থামানো সম্ভব নয়। শুধু জরিমানা বা মোবাইল কোর্ট দিয়ে স্থায়ী সমাধান হবে না।
অর্থনৈতিক ও কারিগরি দিক থেকে চলাচলের অনুপযোগী যানবাহনকে স্ক্র্যাপিংয়ের আওতায় আনতে হবে। ফিটনেসবিহীন ও অতিরিক্ত দূষণকারী যানবাহনের তালিকা প্রকাশ করে ধাপে ধাপে সড়ক থেকে প্রত্যাহার, বিআরটিএ ও ট্রাফিক পুলিশের সমন্বিত নজরদারি এবং নিয়মিত তথ্য প্রকাশই হতে পারে কার্যকর পথ।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এখনই সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ না নিলে রাজধানীর বায়ু আরও বিষাক্ত হয়ে উঠবে। পথচারী, শ্রমিক, শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে থাকবে। সড়কের এই বিষাক্ত ঝড় শুধু পরিবেশ নয়, নগরজীবনের মৌলিক অধিকারকেও হুমকির মুখে ফেলছে। সময় এখনই ব্যবস্থা নেওয়ার।