সর্বপ্রথম কক্সবাজারের সুগন্ধা পয়েন্ট সমুদ্র সৈকতে ‘ইয়েলো বেলিড’ সাপের দেখা মেলে গত জুনে। এরপর গত ১১ আগস্ট রাতে শহরের সমিতিপাড়া সৈকত পয়েন্টে দেখা যায় এ বিষধর সাপ।
সম্প্রতি পর্যটন মৌসুম শুরু হয়েছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকরাও ভিড় করছেন কক্সবাজারে। আর এই সময়েই সৈকতে ‘ইয়েলো বেলিড’ সাপের বিচরণ বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
.png)
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের বিচ কর্মীদের সুপারভাইজার মাহবুব জানান, গত ১১ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টার দিকে সমিতিপাড়া সৈকত পয়েন্টে দায়িত্ব পালনকালে তিনি একটি ‘ইয়েলো বেলিড’ সাপ দেখতে পান। কিছুক্ষণ পর সাপটি সাগরের পানির দিকে চলে যায়। তবে এর আগেই তিনি সাপটির কিছু ভিডিও ফুটেজ ও ছবি তুলে রাখেন। সেগুলোই পরে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

জানা গেছে, ‘ইয়েলো বেলিড’ বা ‘হলদে পেটি’ সাপ বিশ্বের আটটি ভয়ংকর সামুদ্রিক সাপের মধ্যে অন্যতম। বিষের প্রতিষেধক বা অ্যান্টি-ভেনম না থাকায় এ সাপের দংশনে মৃত্যুর হার ৮০ শতাংশ। ‘ইয়েলো বেলিড’ সাপ নিয়ে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দিঘা সৈকতে আতঙ্ক বিরাজ করছে। দিঘা সৈকতটি বঙ্গোপসাগরের কক্সবাজার উপকূলের ঠিক উল্টোদিকে অবস্থিত।
কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের সংক্রামক ব্যাধি ও ট্রপিক্যাল মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. শাহজাহান নাজির জানান, কক্সবাজারে এ সাপের আক্রমণে কারো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। তবে প্রায় ৬ মাস আগে দুবলার চর সৈকতে এক জেলের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ঐ জেলে সাপটি মৃত ভেবে লাথি মেরেছিলেন। এরপরই সাপটি তাকে আক্রমণ করে।
ডা. শাহজাহান নাজির বলেন, বঙ্গোপসাগরে ও কক্সবাজার সৈকতে‘ইয়েলো বেলিড’ সাপের বিচরণ রয়েছে। এর দংশনে শরীর প্যারালাইজড হয়ে যায়। কিডনি, হার্ট আক্রান্ত হয় এবং ধীরে ধীরে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। প্রস্রাবের রঙও পাল্টে যেতে পারে। তাই এ সাপের বিষয়ে জেলেসহ সংশ্লিষ্টদের সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সায়েদুর আর চৌধুরী বলেন, ‘ইয়েলো বেলিড’ সাপটি খুবই বিষধর। এটি একটি সামুদ্রিক সাপ। কিন্তু তীরে এটি দেখা পাওয়ার ঘটনা বিরল। এ প্রজাতির সাপের বিষের কোনো অ্যান্টি-ভেনম নেই। তাই সৈকতে এ ধরনের সাপ দেখলে সতর্ক হওয়া উচিত।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া জানান, ইয়েলো বেলিড সাপ মাংসাশী এবং এরা শুধু মাছ খায়। এরা পানির নিচে একটানা তিন ঘণ্টা পর্যন্ত কাটাতে পারে। তার সমগ্র জীবনচক্র সমুদ্রেই কাটে। এ প্রজাতির সাপ পানির ওপরে ডাইভিং ও সাঁতার কাটার সময় ত্বকের মাধ্যমে তার চাহিদার ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে। এটি অত্যন্ত বিষাক্ত প্রজাতির সাপ, তাই সতর্কতা আবশ্যক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ইয়েলো বেলিড’ বা ‘হলদে পেটি’ অত্যন্ত বিষাক্ত প্রজাতির সাপ, যা হাইড্রোফিনি (সামুদ্রিক সাপ) সাবফ্যামিলির অন্তর্গত। এর বৈজ্ঞানিক নাম পেলামিস প্লেটোরাস। স্বতন্ত্র দ্বিবর্ণ প্যাটার্নের এ সাপটি আফ্রিকা, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, মেক্সিকো, বাজা ক্যালিফোর্নিয়া এবং মধ্য আমেরিকার উপকূলসহ ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এবং উপক্রান্তীয় জলে পাওয়া যায়।
একটি প্রাপ্তবয়স্ক ‘ইয়েলো বেলিড’ সাপের গড় দৈর্ঘ্য ৩ ফুট। সাপটির একটি মসৃণ আঁশ এবং একটি মসৃণ আকৃতির শরীর রয়েছে। এর নিচের অংশ হলুদ এবং পিঠ নীলচে কালো। লেজ নৌকার দাড়ের মতো চ্যাপ্টা হলুদ পুচ্ছবিশিষ্ট, যাতে সাপটি সাগরে নির্বিঘ্নে সাঁতার কাটতে পারে। আইইউসিএন রেড লিস্টে সাপটির অবস্থান লিস্ট কনসার্ন বা ‘ন্যূনতম উদ্বেগ’ হিসেবে।