ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিল্প ও সাহিত্য ]

দ্য প্লেগ (পর্ব ৫৮) 

অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ
প্রকাশিত: ১৬:১৭, ২ নভেম্বর ২০২২
দ্য প্লেগ (পর্ব ৫৮) 
ছবিঃ অন্তর্জাল, প্রতীকী

কথা বলতে বলতে রিও সার্জারির দিকে যাচ্ছিল। বেডরুমে ফিরে আসার পর ত্যারু লক্ষ্য করল তার হাতে এক বাক্স সিরামের এমপুল।  “আহ, সুতরাং এটাই সেটা,” সে বলল। “নাও হতে পারে, তবে কোনো রিস্ক নেয়া চলবে না।”

কোনোরূপ উত্তর না করে ত্যারু তার বাহু প্রসারিত করল এবং নিজেকে দীর্ঘ ইনজেকশনের কাছে সঁপে দিলো। এই ইনজেকশন প্রায়ই সে অন্যদের ওপরেও প্রয়োগ করেছে।

Advertisement

“আজ বিকেল পর্যন্ত আমরা তোমাকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করব।” রিও ত্যারুর চোখের ভেতরে তাকাল। “কিন্তু আমাকে আলাদা করে রাখার বিষয়ে কী করছ?” 

“আমরা তো এখনো নিশ্চিত নই যে, তোমার প্লেগ হয়েছে।” ত্যারু চেষ্টা করে হাসল। “এই প্রথমবার আমি দেখছি যে, রোগীকে আইসোলেশন ওয়ার্ডে না নিয়ে তুমি ইনজেকশন দিচ্ছ।” রিও অন্যদিকে তাকাল। “এখানেই তুমি ভালো থাকবে। আমি ও মা মিলে তোমার দেখাশুনা করব।”

ত্যারু কিছুই বলল না। ডাক্তার রিও এমপুলগুলো বাক্সের ভেতরে রাখতে রাখতে অপেক্ষা করল তার কথা বলার জন্যে। কিন্তু তারপরেও ত্যারু কথা বলল না। রিও শেষ পর্যন্ত ত্যারুর বিছানার কাছে গেল। অসুস্থ্য মানুষটি স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। এই সময়ে তার মুখ লম্বাটে  দেখালেও তার বাদামী চোখ শান্ত ছিল। রিও তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। “এখন ঘুমাতে চেষ্টা করো। আমি খুব তাড়াতাড়িই ফিরে আসব।”

রুম থেকে বের হয়ে যাবার সময়ে রিও শুনল যে, ত্যারু তাকে ডাকছে। সে ফিরল। ত্যারুর আচরণ একটু অদ্ভুত বলে মনে হলো তার। মনে হলো, সে কিছু একটা বলতে চাচ্ছে না, কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছে। “রিও,’ শেষ পর্যন্ত সে বলল, তুমি আমাকে সত্য বলবে। আমি তোমার কথার ওপরে নির্ভর করি।“ “আমি প্রতিজ্ঞা করলাম।” “ত্যারুর মুখ সহজ হলো এবং সে মৃদু হাসল।”

“ধন্যবাদ। আমি মরতে চাই না। সুতরাং আমি যুদ্ধ করব। কিন্তু আমি যদি কোনোকারণে হেরেই যাই, সেক্ষেত্রে আমি একটি ভালো সমাপ্তি করতে চাই।” সামনের দিকে ঝুঁকে রিও তার কাঁধে চাপ দিলো।

“না। অন্তত সন্ন্যাসী হবার জন্যে তোমাকে বাঁচতে হবে। কাজেই যুদ্ধে তোমাকে জয়ী হতেই হবে।“ সেই দিনে আবহাওয়া খুব শীতল অবস্থা থেকে কিছুটা কম শীতল হলো। কয়েকবার শিলাবৃষ্টি হলো। তারপর বৃষ্টি নামল। বৃষ্টি শেষে সূর্যাস্তের সময়ে আকাশ কিছুটা পরিষ্কার হলো। তারপর আবার প্রচন্ড ঠান্ডা পড়ল। রিও বিকেলের দিকে বাসায় ফিরল। তখনো সে ওভারকোট পরেছিল। তারপর সে বন্ধুর রুমে ঢুকল। ত্যারু নড়ল না। কিন্তু তার ঠোঁট, যা জ্বরের কারণে সাদা হয়ে গিয়েছিল, সেটি বোঝাল যে সে ভালো থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। “ভালো আছ?” রিও জিজ্ঞেস করল।

ত্যারু তার প্রশস্ত কাঁধ বিছানার চাঁদর থেকে একটু তুলল। “ভালো,” সে বলল,“আমি ম্যাচে হেরে যাচ্ছি।”

ডাক্তার তার ওপরে নিচু হলো। তার উত্তপ্ত চামড়ার নীচে গ্যাংলিয়া তৈরি হয়েছে এবং তার বুকের ভেতর থেকে গুড়গুড় শব্দ ভেসে আসছে। লুকিয়ে রাখা কামারের হাপরের মতো। অদ্ভুত ব্যাপার হলো ত্যারুর শরীর একইসাথে দুই ধরণের প্লেগের লক্ষণই দেখাচ্ছিল।

রিও সোজা হলো। বলল যে, তাকে দেওয়া সিরাম এখন পর্যন্ত কাজ শুরু করেনি। ত্যারু কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল। কিন্তু জ্বরের উচ্চ তাপমাত্রা তার গলা দিয়ে উচ্চারিত শব্দগুলোকে ডুবিয়ে দিলো। ফলে কিছুই শোনা গেল না।

রাতের খাবারের পর রিও ও তার মা আবার ত্যারুর বিছানার পাশে এসে অবস্থান নিলো।

রাত শুরু হলো যুদ্ধ দিয়ে। রিও জানত যে, প্লেগের দেবদূতদের সাথে ত্যারুর এই নির্মম কুস্তি সকাল পর্যন্ত চলবে।  এই যুদ্ধে ত্যারুর বলিষ্ঠ কাঁধ ও বুক তার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো না। বরং সম্পদ হলো রিও’র সুঁইয়ের নীচ দিয়ে প্রবাহিত হওয়া যাওয়া রক্ত। এই রক্তে আত্মার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিল, যা কোনো মানবিক দক্ষতাই আলোতে নিয়ে আসতে পারে না।  ডাক্তারের কাজ ছিল শুধুমাত্র তার বন্ধুর যুদ্ধ দেখা। সে শুধু যা করছিল তা হলো উদ্দীপক শরীরে ইনজেক্ট এবং ফোঁড়াগুলোকে উদ্দীপিত করার চেষ্টা করা। অনেক মাসের বারবার ব্যর্থতা এই পদ্ধতির আসল মূল্য বুঝতে শিখিয়েছিল। বাস্তবে একমাত্র যেভাবে সে রোগীকে সাহায্য করতে পারত, তা হলো তার  সৌভাগ্যকে কার্যকরী হবার সুযোগ বাৎলে দেওয়া। অবশ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো কার্যকরী হবার অবস্থায় পৌঁছাত না, সুপ্তই রয়ে যেত। কেবলমাত্র ভাগ্যই এইক্ষেত্রে ছিল একটা মিত্র, যেটাকে সে অস্বীকার করতে পারত না। কারণ, প্লেগের একটা দিক নিয়ে রিও খুবই হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিল। প্লেগ তার সর্বশক্তি দিয়ে তার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত সকল  কৌশলকে বানচাল করে দিতে সমর্থ ছিল; আক্রমণ করত অপ্রত্যাশিত স্থানে। এমনকি নিশ্চিত বিজয় থেকেও অনেক সময়ে সে পশ্চাদপসরণ করত, সমস্ত পরামর্শকে মূল্যহীন করে দিয়ে।

ত্যারু নড়াচড়া ছাড়াই যুদ্ধ করল। সমস্ত রাতের মধ্যে সে একবারও অস্থির উত্তেজনা দিয়ে শত্রুর আক্রমণের বিরুদ্ধে পালটা আক্রমণ করল না। কেবলমাত্র তার স্থির অবিচলিত শরীর ও নীরবতা দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে গেল। সে কথা বলার চেষ্টাও করল না। এমনকি মনোযোগ অন্যদিকে যেতে পারে এমন কোনো কাজও সে করল না। কেবল রিও বুঝতে পারল সেই যুদ্ধের  অস্থিরতা; বন্ধুর চোখের পাতায়, যেগুলো খুলছিল ও বন্ধ হচ্ছিল। সেগুলো তার ফুলে ওঠা  চোখের মণিতে এসে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। সে শুধু তাকাচ্ছিল রুমের দূরের কোনো বস্তুর দিকে। অথবা তার দৃষ্টিকে ফিরিয়ে আনছিল রিও ও তার মায়ের দিকে। এবং প্রতিবারেই যখন তার দৃষ্টি রিও’র ওপরে পড়ছিল, তখন সে প্রবল চেষ্টা করে হাসছিল।

এক সময়ে রাস্তার ওপরে তাড়াহুড়ো করে চলা পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। দূর থেকে গর্জন করতে করতে একটা ঝড় আসছিল। সেটি কাছে আসতেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। আরেকটা প্রবল বর্ষন শহরের ওপর দিয়ে সবেগে  ঝাড় দিয়ে চলে গেল। তারপর শিলাবৃষ্টি শুরু হলো এবং ফুটপাথের ওপর থেকে টুং টুং শব্দ ভেসে আসতে লাগল। প্রবল বাতাসে জানালার পর্দাগুলো বন্যভাবে উড়তে লাগল। শিলাবৃষ্টির শব্দে রিও’র মনোযোগ মুহূর্তের জন্যে ত্যারুর মুখের ছায়ার ওপারে গিয়ে পড়ল। সেখানে একটি ছোট্ট বেডসাইট বাতির আলোতে তার মা সেলাই করছিলেন এবং একটু পরপর চোখ তুলে ত্যারুর দিকে তাকাচ্ছিলেন। 
চলবে... 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআরকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!