শহরকে স্নান করানো ঠাণ্ডা ও পরিষ্কার আলোর মধ্যদিয়ে ঝলসানো মাংস ও মৌরি-স্বাদের মদের গন্ধ ভেসে আসছিল। চারপাশের সুখী মুখগুলো উজ্জ্বল আকাশের দিকে তাকিয়েছিল। পুরুষেরা ও রক্তিম চিবুকের নারীরা পরস্পরকে জড়িয়ে নীচুস্বরে কামনার কথা বলছিল। হ্যাঁ, প্লেগ তার সমস্ত ভীতি নিয়ে শেষ হয়ে গেছে। এবং আবেগাপ্লুতভাবে আলিঙ্গনে আবদ্ধ বাহুগুলো বলছিল প্লেগের আসল অর্থ; নির্বাসন ও বিয়োগবেদনা এই শব্দ দুটোর গভীরতম মিথস্ক্রিয়া।
বিগত কয়েকমাস ধরেই একদল নরনারীকে শহরের রাস্তাঘাটে দেখতে পাচ্ছিল রিও। আজই প্রথম রিও’র মনে হলো যে, এই মানুষদের চোখে-মুখে এবং পোশাকে ভিন্ন এক ধরণের ভোগান্তি ও দুস্থতা দৃশ্যমান, যা এই শহরের অধিবাসীদের মধ্যে নেই। প্লেগ শেষ হওয়ার পর এদের মুখমণ্ডল ও পোশাক থেকে বোঝা যাচ্ছিল যে, তারা মূলত এই শহরের অধিবাসী নয়। দূরদেশ হতে অভিবাসী হিসেবে এই শহরে আসার পর প্লেগের কারণে আটকে গেছে দীর্ঘদিনের এক নির্বাসনে। প্লেগ শুরুর পর শহরের গেটগুলো বন্ধ করে দেওয়ার কারণে তারা চলে যেতে পারেনি। ফলে এই আলাদা থাকার জীবনে স্থায়ী হয়ে পড়েছে শহরের বিভিন্ন অংশে। প্রিয়জনদের সাথে মিলনের ইচ্ছা পোষণ করলেও, তাদের অনুভব অন্যদের মতো নয়। কারণ, তাদের বেশিরভাগই প্রবল আতিশয্য নিয়ে প্রিয়জনদের অনুপস্থিতিতে অপেক্ষা করেছে শরীরের উষ্ণতা, ভালোবাসা অথবা সেই জীবনের জন্যে যা তারা ছেড়ে এসেছিল। নিজের অজান্তেই তারা বন্ধুদের সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হয়েছিল যখন চিঠি, রেলগাড়ি, নৌকা ও অন্য বাহনগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ত্যারু সম্ভবত এই দলেরই একজন, যে নিজেকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে না পারলেও প্রিয়জনের সাথে মিলনই পৃথিবীতে তার একমাত্র কাম্য। এই মিলনকেই সে নাম দিয়েছে শান্তি।
.png)
রিও হাঁটতে থাকল। তার এগিয়ে যাওয়ার সময়ে মানুষের ভিড় ঘন হয়ে এলো। তাদের হট্টগোল বেড়ে গেল। রিও’র মনে হলো যে, সে গন্তব্যের কাছাকাছি এসে পড়েছে। ক্রমশ সে নিজেকে আবিষ্কার করল ফেঁপে ওঠা কোলাহলপূর্ণ মানুষদের ভিড়ে। অনুভব করল যে, এই চিৎকার ও কোলাহলের সেও একটা অংশ। হ্যাঁ, সে নিজেও এদের সবার সাথে যন্ত্রনাভোগ করেছে, শরীর ও আত্মা দুটো দিয়েই। অন্যদের সাথে সেও অনুভব করতে পারল যে, মৃতদেহের স্তূপ, অ্যাম্বুলেন্সের ঘণ্টাধ্বনি, ভাগ্যের নামে দেওয়া সাবধান বানী, ভয় ও যন্ত্রণাদায়ক বিদ্রোহের ঢেউ, আতঙ্ক, সবকিছুই উচ্চকিত হয়ে এইসব অসহায়, আতঙ্কিত মানুষদের কানে বাজছে। এবং একটি অদৃশ্য কণ্ঠস্বর তাদেরকে নিজেদের স্বদেশে ফিরে যাওয়ার জন্যে ডাকছে।
তাদের সেই স্বদেশের অবস্থান দমবন্ধ করা এই শহরের দেয়ালের বাইরে, পাহাড়ের ঝোপঝাড়ের গন্ধ, সাগরের ঢেউ, মুক্ত আকাশ ও ভালোবাসার হেফাজতে। সেটাই তাদের হারিয়ে যাওয়া বাড়ি ও সুখ, যেখানে তারা ফিরে যেতে চেয়েছিল, অন্য সবকিছুকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে।
নির্বাসন ও মিলনের আকাঙ্ক্ষা বলতে কী বোঝায়, সে সম্পর্কে রিও’র কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না। কিন্তু সামনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে, ভিড়ের ধাক্কাধাক্কি সহ্য করতে করতে, যখন সে অপেক্ষাকৃত কম জনাকীর্ণ রাস্তার ওপরে এসে পড়ল, তখন তার মনে হলো যে, এমন জিনিসের অর্থ থাকুক বা না থাকুক, আমাদের প্রত্যেকের উচিত মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করা।
তখন থেকেই সে উত্তরটা জানত, এবং সেটিকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারল, যখন সে শহরের প্রান্তসীমায় প্রায় খালি রাস্তার ওপরে এসে পৌঁছাল।